ভারতের রাজধানী নয়া দিল্লির মতো ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার ও টংগী নিয়ে ‘ঢাকা ক্যাপিটাল সিটি সরকার’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে জনপ্রশান সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া ঢাকার ওপর চাপ কমাতে দেশের পুরানো চারটি বিভাগে পৃথক প্রাদেশিক সরকার গঠন করার কথা বলেছে এ কমিশন।
বুধবার প্রধান উপদেষ্টার কাছে হস্তান্তর করা এ প্রতিবেদনে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি বিভিন্ন সুপারিশ করা হয়েছে। ৪৫ পৃষ্ঠার সারসংক্ষেপে জেলা প্রশাসকদের (ডিসি) পদবী পরিবর্তন, জনবান্ধব জনপ্রশাসন গড়ে তোলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিষয়ে নতুন আচরণবিধি প্রনয়ণ, ই-সেবা চালু, তথ্য অধিকার আইন সহজ করা, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি বন্ধে নজরদারির ব্যবস্থাসহ শতাধিক সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সুপিরিয়র এক্সিকিউটিভ সার্ভিস গঠনসহ আন্তঃক্যাডার বৈষম্য দূর করা ও লাইন পদোন্নতির বিষয়ে বিধিমালা করার প্রস্তাব করা হয়েছে এ প্রতিবেদনে।
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের হাতে প্রতিবেদন তুলে দেন জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী। এ সময় উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও কমিশনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
যমুনার সামনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার উপপ্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ মজুমদার প্রতিবেদনের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, রাজধানী ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা ও পরিষেবার ব্যাপ্তির কথা বিবেচনায় রেখে নয়াদিল্লির মতো ফেডারেল সরকার নিয়ন্ত্রিত ক্যাপিটাল সিটি গভর্নমেন্ট বা রাজধানীর মহানগর সরকার গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্যান্য প্রদেশের মতো এখানেও আইনসভা এবং স্থানীয় সরকার থাকবে। রাজধানীকে কেন্দ্র করে ‘মহানগর সরকার’ গঠিত হলে টাঙ্গাইলকে ঢাকা বিভাগের সঙ্গে সংযুক্ত করার সুপারিশ করেছে কমিশন।
দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, সরকারের কার্যপরিধি বেড়ে যাওয়ায় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণে অংশ হিসেবে চারটি প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা চালু হলে দেশে এককেন্দ্রিক সরকারের পক্ষে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার সুযোগ হ্রাস পাবে। পাশাপাশি রাজধানী ঢাকা শহরের ওপর চাপ হ্রাস পাবে।
‘সরকারি চাকরিতে ন্যূনতম ২৫ বছরে অবসরে যাওয়ার একটি বিধান আছে, এটি উঠিয়ে দিয়ে ১৫ বছরের পর অবসরের আবেদন করার বিধান করার জন্য বলা হয়েছে।
তিনি জানান, মন্ত্রণালয় ও অধিদফতরের সংখ্যা কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া জেলা প্রশাসকদের পদবি নিয়ে বলা হয়েছে জেলা ‘প্রশাসক’ এর জায়গায় কমিশনার অথবা ম্যাজিস্ট্রেট করার জন্য বলা হয়েছে। ইমিগ্রেশনের জন্য আলাদা ইউনিট করার সুপারিশ করা হয়েছে।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) বিদ্যমান পদবি পরিবর্তন করে যথাক্রমে ‘জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও জেলা কমিশনার’ এবং ‘উপজেলা কমিশনার’ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) পদবি পরিবর্তন করে ‘অতিরিক্ত জেলা কমিশনার (ভূমি ব্যবস্থাপনা) করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
কমিশনর উপজেলা পর্যায়ে দেওয়ানি ও ফৌজদারি ম্যাজিস্ট্রেট কোর্ট পুনঃস্থাপনের সুপারিশ করেছে। এ বিষয়ে কমিশন বলেছে এটি করা হলে সাধারণ নাগরিকেরা অনেক বেশি উপকৃত হবে। এ বিষয়েও সুপ্রিম কোর্টের পরামর্শ নেওয়ার কথা বলেছে কমিশন। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ‘উপজেলা জননিরাপত্তা কর্মকর্তা’ পদের সুপারিশ করেছে। কমিশন বলেছে থানার ‘অফিসার ইনচার্জ’ এর কাজ ও সার্বিক আইনশৃঙ্খলা রক্ষার তদারকির জন্য উপজেলা পর্যায়ে একজন সহকারী পুলিশ সুপারকে ‘উপজেলা জননিরাপত্তা কর্মকর্তা’ হিসেবে পদায়ন করা যেতে পারে।
স্থানীয় সরকার হিসেবে উপজেলা পরিষদকে আরও শক্তিশালী করার জন্য সুপারিশ করা হলো। তবে উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান পদটি বাতিল করা যেতে পারে। উপজেলা পরিষদকে আরও জনপ্রতিনিধিত্বশীল করার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদের মধ্যে এক-তৃতীয়াংশকে আবর্তন পদ্ধতিতে পরিষদের সদস্য হওয়ার বিধান করা যেতে পারে।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে উপজেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত না রেখে তাকে শুধু স্বল্পমেয়াদি সংরক্ষিত বিষয় ও বিধিবদ্ধ বিষয়াদি যেমন- আইনশৃঙ্খলা, ভূমি ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা ইত্যাদি দেখাশোনার ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করা হলো। এর উদ্দেশ্য তাকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রাখা। একজন সিনিয়র সহকারী সচিব পদমর্যাদার অফিসারকে উপজেলা পরিষদের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া যেতে পারে।
ভূমি ব্যবস্থাপনাকে কার্যকর করার জন্য উপজেলা পর্যায়ে দ্বিতীয় শ্রেণির একজন ভূমি মধ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তার পদ সৃষ্টি করা যেতে পারে। ভূমি মন্ত্রণালয়ের আওতায় কর্মরত মেয়াদি কানুনগোদের মধ্য থেকে পদোন্নতির মাধ্যমে সহকারী কমিশনারের (ভূমি) অধীনে তাদের পদোন্নতি ও পদায়ন করা যেতে পারে। এ রূপ পদোন্নতির পরীক্ষা পিএসসির মাধ্যমে হতে হবে। পরবর্তী সময়ে তারা পদোন্নতি পেয়ে ২৫ শতাংশের মতো সহকারী কমিশনার (ভূমি) হতে পারবে।
পৌরসভার গুরুত্ব বিবেচনায় স্থানীয় সরকার হিসেবে একে অধিকতর শক্তিশালী করার জন্য সুপারিশ করা হলো। পৌরসভা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হবেন ওয়ার্ড মেম্বারদের ভোটে। কারণ, চেয়ারম্যান একবার নির্বাচিত হলে মেম্বারদের আর গুরুত্ব দেয় না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

