বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস আজ

মানসিক চাপ ও হতাশায় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার বেড়েছে

মানসিক চাপ ও হতাশায় শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার হার বেড়েছে

দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অতিরিক্ত একাডেমিক চাপ, মানসিক অস্থিরতা, পারিবারিক ও সম্পর্কজনিত জটিলতা, আর্থিক সংকট এবং ক্যারিয়ার নিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের অনেককে চরম সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২২৪ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৯ জন বেশি।

আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশন দেশের ১৬৫টি স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে এ তথ্য জানিয়েছে। তাদের হিসাব অনুযায়ী চলতি বছরের আট মাসে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৩২ জন নারী ও ৯২ জন পুরুষ। ২০২৫ সালের একই সময় এ সংখ্যা ছিল ১৭৫ জন—নারী ১১৩ ও পুরুষ ৬২ জন। চলতি বছরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তত ৫০ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন। মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যেও আত্মহত্যার ঘটনা রয়েছে; তাদের মধ্যে ২৪ জন নারী ও ২০ জন পুরুষ।

বিজ্ঞাপন

আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে ৫১৩ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। তাদের ৬১ শতাংশই ছিলেন নারী। ২০২৪ সালে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩১০ জন, অর্থাৎ ৪৯.৪ শতাংশ ছিলেন স্কুলশিক্ষার্থী। এ পরিসংখ্যানগুলো নির্দেশ করে, বাংলাদেশে আত্মহত্যা প্রতিরোধে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, সামাজিক সচেতনতা ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত জরুরি।

এমন পরিস্থিতিতে আজ ১০ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস পালিত হচ্ছে। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সরকারি-বেসরকারি নানা কর্মসূচি পালনের মধ্য দিয়ে দিবসটি পালন করা হবে। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে Changing the Narrative on Suicide বা ‘আত্মহত্যা নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন’। ২০০৩ সাল থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, আত্মহত্যার পেছনে বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, সামাজিক ও পারিবারিক চাপ, সম্পর্কের টানাপোড়েন, আর্থিক সংকট, একাকিত্ব, শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন, যৌন হয়রানি বা নিপীড়ন, মাদকাসক্তি ও প্রিয়জন হারানোর মতো নানা কারণ কাজ করতে পারে। সামাজিক অবক্ষয়, দাম্পত্য ও পারিবারিক কলহ, বেকারত্ব, প্রেম-ভালোবাসা এবং বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক—এসব আত্মহত্যার কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে তারা। শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে একাডেমিক চাপ ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আত্মহত্যার আগে অনেকের আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। হঠাৎ নিজেকে গুটিয়ে নেওয়া, সামাজিক যোগাযোগ কমিয়ে দেওয়া, দীর্ঘদিন হতাশ থাকা, নিজেকে মূল্যহীন মনে করা কিংবা আত্মহত্যার কথা বলা—এসব সতর্কসংকেত হতে পারে। এসব লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা গেলে আত্মহত্যা প্রতিরোধ সম্ভব।

দেশে আত্মহত্যার সামগ্রিক চিত্রও উদ্বেগজনক। পুলিশি নথি অনুযায়ী ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে দেশে ৭৬ হাজার ৩৬১ জন আত্মহত্যা করেছেন। এ সংখ্যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের অনুমিত হিসাবের তিনগুণেরও বেশি। অর্থাৎ, আত্মহত্যা দেশে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

জাতীয় আত্মহত্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা ২০২৬-৩০-এর খসড়া তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে দেশে আত্মহত্যার ঘটনা ছিল সর্বোচ্চ ১৬ হাজার ৮৮৬টি। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৩ হাজার ৯৭৫-এ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) পরিচালিত জাতীয় জরিপেও পরিস্থিতির ভয়াবহতা উঠে এসেছে। জরিপ অনুযায়ী ২০২৩ সালে দেশে ২০ হাজার ৫০৫ জন আত্মহত্যা করেন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে ৫৬ জন আত্মহত্যা করেছেন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে বিশ্বে প্রতিবছর সাত লাখের বেশি মানুষ আত্মহত্যায় মারা যায়। বিশ্বজুড়ে সংঘটিত আত্মহত্যার প্রায় ৭৭ শতাংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে (এলএমআইসি) ঘটে। ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর অন্যতম কারণ আত্মহত্যা। বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার প্রায় ৭৭ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে ঘটে থাকে। আবার দেশে নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। ১০ থেকে ২৯ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ বাংলাদেশে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের সভাপতি তানসেন রোজ আমার দেশকে বলেন, শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা প্রতিরোধে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও নিয়মিত মেন্টাল হেলথ স্ক্রিনিং চালু করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিক্ষক ও সহপাঠীদের মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা এবং উদ্বেগের লক্ষণ শনাক্ত করার বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে নিয়মিত মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক কর্মসূচিও চালু করা জরুরি।

তিনি বলেন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়। সংকটে থাকা একটি তরুণ জীবনকে ফিরিয়ে আনতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা, সরকার, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংগঠনসহ পুরো সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন