জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে মুলতবি (৬২ বিধির) প্রস্তাবের নোটিশ নিয়ে সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মধ্যে বাহাস হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংসদে মন্ত্রীর ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেয়ার পর নতুন করে আলোচনার গুরুত্ব রাখে কী না সেই প্রশ্ন তোলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তাছাড়া একটি অধিবেশনে দুটি মুলতবি প্রস্তাবের ওপর আলোচনার পর আরো একটি প্রস্তাব আলোচনার অনুমতি দিয়ে ভিন্ন নজির তৈরি হবে। ভবিষ্যত এই রেওয়াজ অনুসরের দাবি উঠবে। তবে, তিনি বিষয়টি নিয়ে আলোচনার বিরোধীতা করেননি। বিরোধিতা করেন কোন বিধিতে আলোচনা হবে তা নিয়ে।
অপরদিকে বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, সংসদে দেখি সব তেল আছে। কিন্তু বাইরে তেল নেই। জ্বালানি ইস্যুটি এই মুহুর্তে দেশের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এই বিষয়টি পাশ কাটিয়ে গেলে আমাদের সংসদে থাকার কোনো সার্থকতা থাকে না। বাহাসের এক পর্যায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ৬৮ বিধিতে আলোচনার প্রস্তাব দিলে বিরোধীদলীয় নেতা তা লুফে দেন। তবে, তিনি আলোচনার সময় বাড়ানো এবং সংসদ নেতার উপস্থিতি আলোচনা অনুষ্ঠানের দাবি তোলেন। পরে ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাবে বিরোধীদলীয় নেতা মঙ্গলবার ৬৮ বিধিতে নোটিশ দেবেন বলে সংসদকে জানান।
সোমবার ৭১ বিধির নোটিশ নিষ্পত্তির পর বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ও বিরোধীদলীয় সদস্য চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের নুরুল ইসলামের ৬২ বিধির দুটি প্রস্তাবের প্রসঙ্গ তোলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল। দুটি প্রস্তাবের বিষয়বস্তু প্রায় একই ধরনের উল্লেখ করে ডেপুটি স্পিকার বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবটি পড়ে শোনান। বিরোধীদলীয় নেতার মুলতবি প্রস্তাবটি ছিলো ‘দেশব্যাপী তীব্র জ্বালানি সংকট এবং এর ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্প কারখানায় সৃষ্ট অচলাবস্থাসহ জনজীবনের বহুমাত্রিক সংকট সম্পর্কে আলোচনা’।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, বর্তমানে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আলোচনা চলমান উল্লেখিত নোটিশটির ক্ষেত্রে অধিবেশন মুলতবি না করেই আলোচনার সুযোগ রয়েছে। মুলতবি করে আলোচনা সমীচীন নয়। তাছাড়া এই নোটিশের বিষয়বস্তু সম্পর্কে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দিয়েছেন। এরপরও আলোচনার যদি অবকাশ থাকে তাহলে যথাযথ বিধিতে নোটিশ প্রদান করলে আলোচনা হতে পারে। ৬৩ বিধিতে নোটিশ দুটি নাকচ করেন।
এ সময় ফ্লোর নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বলেন, এই বিষয়টি জাতীয় জীবনে একটি অতিব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্রপতির ভাষণের উপরে বক্তব্য অব্যাহত আছে। এ এটা থাকবে এবং চলবে। কিন্তু এই বিষয়টাকে নিয়ে আমরা আরো দুই-একবার নোটিশে আনার চেষ্টা করেছি। ৭১ বিধিতে সুযোগ দেওয়া হয়নি। এভাবে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হলে জনগণের জন্য কী এখানে আমরা সবাই মিলে আলোচনা করতে পারব না? আমরা কি একটু সুযোগ সৃষ্টি করব না? আমরা তো কাউকে দোষারোপ করার জন্য এই আলোচনায় যাচ্ছি না। বাস্তব অবস্থাটা জেনে করণীয় বিষয়েই আমরা কথা বলতে চাচ্ছি। এই সুযোগই দেওয়া না হলে আমরা কী ধরে নেবো- আমরা ধরে নেবো যে, জনজীবনে যে প্রবলেমটা- সব চেয়ে বার্নিংসেটা নিয়ে এই সংসদে আলোচনা করতে পারলাম না। এটা কি আমাদের জন্য একটা দুর্ভাগ্য হবে না? দেশের মানুষ তো প্রত্যাশা করছে- আমি নিজে এই বিষয়গুলা বাস্তবে বোঝার চেষ্টা করেছি, পত্রিকায় অনেক কিছু লেখা হয়- সামাজিক মিডিয়ায় কোন কিছু আসে- তার কিছু বাস্তব, কিছু অবাস্তব। বুঝার চেষ্টা করেছি আসলে কতটুকু বাস্তব? কোন জায়গায় কোন সমস্যাটা, কিন্তু সব প্রশ্ন তো ওখানে গিয়ে বুঝতে পারবো না। আরো কিছু বুঝতে হবে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে।
স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, আপনি (ডেপুটি স্পিকার) বিবৃতির (৩০০ বিধিতে মন্ত্রীর বিবৃতি) কথা বলেছেন। মন্ত্রী বিবৃতি বাস্তবের সাথে কোনো মিল খুঁজে পাইনি। একদিকে বলা হচ্ছে- তেলের কোনো সংকট নাই। আরেকদিকে বাস্তবে যেটা ঘটছে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন। এই নিয়ে মানুষের মধ্যে দারুণ অসন্তোষ। আমরা যদি এখানে একটু খোলামেলা আলাপ করতে পারি। সঠিক তথ্যগুলি যদি ফ্লোরে আসে। কিন্তু আমাদের নোটিশগুলোর কোনটাই আলোচনায় না আসে, বিবেচনায় না নেন তাহলে এখানে (সংসদে) থাকব কেন? আমরা কী জন্য এসেছি? জনগণ তো তাদের প্রয়োজনে আমাদের আমাদের পাঠিয়েছেন। সেই প্রয়োজন যদি পূরণ করতে না পারলাম- থাকার তো কোনো সার্থকতা নাই। এই সংসদে আমরা প্রত্যেকটি সেকেণ্ড ব্যয় করছি। এর পিছনে জনগণের রেভিনিউ খরচ হচ্ছে। আমাদের দায় তো জনগণের কাছে। এই মুহূর্তের সবচাইতে বার্নিং সমস্যা যদি আলোচনা করতে না দেন- তাহলে কী আমরা জাস্টিস পেলাম আপনার (ডেপুটি স্পিকার) কাছ থেকে? পেলাম না। অনুরোধ করব এভাবে নিষ্পত্তি না করে আজকে না করেন একদিন পরে হোক দুইদিন পরে হোক, বিষয়টা আলোচনার জন্য নির্ধারণ করেন। তখন মুলতবি করে এটা আলোচনা করেন।
বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের পর ফ্লোর নেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বিরোধীদলীয় নেতার বক্তব্যের জবাবে বলেন, প্রস্তাবটি অবশ্যই আলোচনার যোগ্য। জাতীয় জীবনে জরুরি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও বটে। আপনি (ডেপুটি স্পিকার) তো আলোচনার বিষয়টি নাকচ করেননি। সিদ্ধান্ত দিয়েছেন অন্যভাবে বিকল্প প্রস্তাব দিয়েছেন। সংসদ অধিবেশন মূলতবি না করে অন্য কোনভাবে আলোচনার সুযোগের কথা বলেছেন। বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাব আপনি (স্পিকার) গুরুত্ব দিয়ে প্রস্তাবটা রিড আউট করেছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে খুব বেশি হলে দুই-চার বার এই সমস্ত মূলতবি প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বর্তমান সংসদের দুটি বৈঠকে একই সেশনে দুইটা মূলতবি প্রস্তাব আলোচনা হয়েছে, এটা ইতিহাসে অনন্য নজির। এই সংসদের আরো একটা বৈঠকে আরো একটি মূলতবি এলাও হলে প্রিসিডেন্টটা একটু অন্যরকম হয়ে যাবে। ভবিষ্যৎ অধিবেশনগুলোতে এই রেওয়াজ অনুসরণ করার চেষ্টা হবে। কাজেই আমরা চাই বিষয়টি আলোচনা হোক। এটা ৭১বিধিতে নোটিশ দিয়ে তার ভিত্তিতে মন্ত্রী বকেটি বিবৃতি দেবেন। তখন সম্পূরক প্রশ্নও করা যাবে। আর ৬৮বিধি অনুসারেও সংক্ষিপ্ত আলোচনার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে। সেখানে মন্ত্রীও বিবৃতি দেবেন। আমরাও দু’চার কথা কন্ট্রিবিউট করতে পারবো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, সংসদের বাইরে বিরোধীদলীয় নেতা বিভিন্ন জায়গায় সফর করছেন। উনি ওখানে বক্তব্য বিবৃতি দিচ্ছেন। এবং বলছেন যে, সংসদে তো সব তেল আছে। বাইরে তেল নাই। এটা গণতান্ত্রিক অধিকার তিনি বলেছেন পত্রিকায় আসছে আমরা পড়ি!
জ্বালানী মন্ত্রীর বিবৃতির কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, মন্ত্রীর ৩০০ বিধিতে বিবৃতি দেওয়ার পর মুলতবি প্রস্তাব গ্রহণ করে সংসদের বৈঠক মুলতবি রেখে আলোচনার জন্য এই বিষয়টি গুরুত্ব রাখে কী না? আমাদের দেশে জ্বালানি তেল এবং গ্যাসের কোনো সংকট নেই। সেটা আমরা পরিসংখ্যান দিয়ে আমরা দেখিয়েছি। মন্ত্রী দেখিয়েছেন। এখন কিছু কিছু বিষয়ে আমার না বললেই নয়।
টলারেবল মাত্রা পর্যন্ত মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, একটি শৃঙ্খলায় আনার জন্য বা পাচার হওয়ার সেটা বন্ধ করার জন্য জ্বালানির মুল্য কিঞ্চিত বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়েছে সরকার। এই বিষয়ে কোনো সংকট নেই। সুতরাং মূলতবী রেখে সংসদের অধিবেশন এই আলোচনাটা করার প্রয়োজন নেই। ৬৮ বিধিতে নোটিশ দিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার সুযোগ রয়েছে। আপনি (ডেপুটি স্পিকার) চাইলে এই প্রস্তাবটি বিরোধীদলীয় নেতাকে দিতে পারেন।
জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব সুন্দর করেই বলেছেন- কোনো সংকট নাই। এটা আসলে সংসদের ভিতরে নেই। সংকটটা আমাদের সংসদের বাইরে। সংকট আছে বলে জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে হাইকোর্টের মত খুবই স্পর্শকাতর জায়গায় দুইদিন ভার্চুয়ালি কোর্ট বসছে। সংকট নেই বলে এটা হয়েছে- এটা জাস্ট একটা উদাহরণ।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) অনেক কথা বলেছেন- আমি এগুলার রিপ্লাই দিতে যাব না। সংকটটা এই সরকারের সৃষ্টি নয়। একটা গ্লোবাল ম্যাটার। যুদ্ধ পরিস্থিতি চলছে- এগুলো বুঝি। আমরা চাই সবাই মিলে কন্ট্রিবিউট করতে। চাপটা কমাতে। পরিস্থিতিটা সহজ করতে। সব দায়িত্বই যদি এককভাবে সরকারি দল পালন করে, আমরা কোনো সুযোগ পাব না। জনপ্রতিনিধি বাদ দিলেও দেশের নাগরিক হিসেবেও আমাদের কিছু দায় আছে। আমরা ওই পজিটিভ এটিচিউডের জায়গা থেকে এই আলোচনাটা দরকার বলে মনে করি। ধন্যবাদ জানাই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে উনি ৬৮ বিধিতে নোটিশ দেওয়ার কথা বলেছেন। আমি সেই নোটিশটা দিতে পারি। কিন্তু ওখানে তো আধা ঘণ্টা সময়। এই সময়ের মধ্যে সরকারি দল বলবে কতটুকু? আমি বলব কতটুকু? বা আমরা বলব কতটুকু? আমি আবার অনুরোধ করব এটাকে ডিসপোজ অফ না করে সংসদ নেতার উপস্থিতিতে বিষয়টা আলোচনার জন্য আগামী তিনদিনের মধ্যে সময় নির্ধারণ করতে পারেন।
এ সময় ডেপুটি স্পিকার বলেন, এখানে বিষয়টি হচ্ছে আলোচনা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও আলোচনা করতে চান। কিন্তু বিষয়টি হচ্ছে এই আলোচনা সংসদের বৈঠক মুলতবি করে হবে কী না? বিধিগতভাবে চিন্তা করছি বিকল্প উপায়ে আলোচনার সুযোগ আছে কী না? একটি হারমোনিয়াস পরিবেশে আজকে প্রায় আধা ঘণ্টার মত আলোচনা অলরেডি হয়ে গেছে। এই আলোচনাটাই কন্টিনিউ আমরা করতে পারি আরেকটা বিধিতে। সংসদকে মূলতবি করে আলোচনা না করে আমরা সংসদ চলমান অবস্থায় সাধারণ আলোচনা নিয়ে যেতে পারি। আমরা আধা ঘণ্টার জায়গায় একঘন্টা বা দেড় ঘণ্টায় নিয়ে যেতে পারি। কিন্তু মূলতবি না রেখে।
বিরোধীদলীয় নেতা ডেপুটি স্পিকারের প্রস্তাব লুফে নিয়ে বলেন, আপনার বুলিতে চন্দন ফুটুক। ফুল ফুটুক। আপনি শেষে বলেছেন দেড়ঘন্টা। আমি মেনে নিলাম। আপনারটাই কবুল। ইনশায়াল্লাহকে কালকে (আজ) নোটিশ দেবো। আপনি আমাদেরকে সুযোগ করে দিবেন। তবে সংসদ নেতার উপস্থিতিতে আমরা এই আলোচনাটা করতে চাই।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বিরোধী নেতা নোটিশ দিয়ে সংসদ নেতার উপস্থিতিতে আলোচনা হবে। তবে, আপিনি বিধি ভঙ্ঘ করবেন না। এক ঘন্টার জন্য আলোচনার সুযোগ দিতে পারেন।
আলোচনা এক ঘন্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ করতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রস্তাবের জবাবে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, সুন্দর করে কথা বলার পরেও কি মন গলাইতে পারলাম না? আর কোনো ভাষায় বললে মন গলবে? ঠিক আছে আপনি (স্পিকার) যেটা সর্বোত্তম মনে করেন সেটাই আমরা আশা করব। আপনার উপর ভার ছেড়ে দিলাম। তবে আমরা অর্থবহ আলোচনা করতে চাই।
স্পিকার বলেন, আধা ঘণ্টার মত আলোচনা অলরেডি হয়ে গেছে। আপনি (বিরোধীদলীয় নেতা) নোটিশটা দেন আমরা কার্যকর পদক্ষেপ নেবো।অর্থবহ আলোচনার জন্য যা করণীয় সংসদ তাই করবে।
এমপি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

