চট্টগ্রামে ২০১৮ সাল থেকে প্রতিবছর কম-বেশি কোরবানির পশুর চামড়া নষ্ট হচ্ছে। এ বছরও তার ব্যতিক্রম হয়নি। গত কয়েক বছরের মতোই কাঙ্ক্ষিত দাম না পেয়ে বিপুল পরিমাণ চামড়া রাস্তায় ফেলে বাজার ছেড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এ পরিস্থিতির জন্য তারা সিন্ডিকেটের কারসাজিকে দায়ী করেছেন।
কাঁচা চামড়ার এই ব্যবসা সারা বছর চললেও কোরবানির ঈদকে ঘিরে কেন এই নৈরাজ্য? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ‘আমার দেশ’। তাদের দাবি, সিন্ডিকেটের কারসাজির পাশাপাশি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতার কারণে বার বার লোকসানে পড়ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। এতে কাঁচা চামড়ার সাপ্লাই চেন ভেঙে পড়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ নষ্ট হচ্ছে প্রতিবছর, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে জাতীয় অর্থনীতিতেও।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, বেশ কয়েকটি কারণে চামড়াশিল্পের দুর্দিন কাটছে না। এর মধ্যে অন্যতম হলো সাভারে সেন্ট্রাল ইটিপি চালু না হওয়া। এর জেরে পরিবেশগত ইস্যুতে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় অংশই নিতে পারছে না বাংলাদেশের চামড়া। এর বাইরে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়হীনতাকে। প্রতিবছর ঈদের আগে লবণযুক্ত কাঁচা চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয় সরকার। কিন্তু সেখানে বর্তমান বাজারদরকে বিবেচনা করা হয় না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকার একজন ট্যানারি মালিক জানান, কয়েকজন ট্যানারি মালিক বা ব্যবসায়ী নেতার সঙ্গে বৈঠক করেই দাম নির্ধারণ করে দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু সব সরকারের সময়ই যাদের বৈঠকে ডাকা হয় তাদের বেশিরভাগই ট্যানারির সঙ্গে জড়িতই নয়। এক সময় ব্যবসায় ছিলেন; এখন রাজনৈতিক বিবেচনায় মন্ত্রণালয়ের বৈঠকে ডাক পান। এই দাম নির্ধারণ করাটাই বড় ধরনের বিভ্রান্তি ছড়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মাঝে। কারণ বৈঠকে লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে এই ম্যাসেজটা যায় না।
চট্টগ্রামের একমাত্র ট্যানারি রীফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান জানান, কোরবানির ঈদের সময় একদিনে অনেক চামড়া পাওয়া যায়। কিন্তু এই ব্যবসাটা সারা বছরই চলমান থাকে। ঈদের আগের দিন সকালেও সাপ্লাইয়ারদের দেওয়া চামড়া ক্রয় করে ট্যানারিগুলো। সাধারণত চামড়ার গ্রেড অনুযায়ী দাম নির্ধারণ করা হয়। খুব ভালোমানের এ প্লাস গ্রেডের চামড়া ৬২ থেকে ৬৩ টাকা স্কয়ার ফিট দরে কিনেছেন। আর সবচেয়ে নিম্নমানের চামড়া প্রতি বর্গফুট ৩৩ টাকা পর্যন্ত কেনা হয়েছে। গত এক বছরে সব ট্যানারি ও আড়ৎদারদের খাতা পর্যালোচনা করলে এই তথ্যই পাওয়া যাবে। কোরবানির ঈদের দিন সবচেয়ে ভালো মানের চামড়া যেমন থাকে; নিম্নমানের চামড়ার পরিমাণও কম নয়। কিন্তু বাণিজ্য মন্ত্রণালয় দাম বেঁধে দেয় ভালো মানের চামড়া হিসাব করে। তাহলে নিম্নমানের চামড়াটা কী দামে বেচা-কেনা হবে?
তিনি আরো জানান, এ বছর ঢাকার বাইরে ৫৬ থেকে ৬২ টাকা আর ঢাকার ভেতরে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা প্রতি বর্গফুট চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছে সরকার। আমি ঢাকার বাইরের ট্যানারি হিসেবে ঈদের আগে ভালো মানের চামড়া ৬৫ টাকা স্কয়ার ফিটেও কিনেছি আবার নিম্নমানের চামড়া ৩৫ টাকা বর্গফুটেও কিনেছি। যারা নিয়মিত এই ব্যবসা করে তারা এই হিসাবে বোঝে। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা না বুঝেই সরকার নির্ধারিত দাম হিসাব করে চামড়া কিনে লোকসানে পড়ে।
চট্টগ্রাম আতুরার ডিপো কাঁচা চামড়া আড়ৎদার সমিতির সভাপতি মুসলিম উদ্দিন জানান, চামড়ার ব্যবসাটি মূলত সারা বছরের ব্যবসা। আমরা ট্যানারিতে যে চামড়া সরবরাহ করি, তা ওয়েট ব্লু তৈরির পর গ্রেডিং করা হয়। যারা বড় ব্যবসায়ী তারা গ্রেডিং করার পর দাম নির্ধারণ করে বেচাকেনা করে। আর যারা অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসায়ী তারা গড়ে দাম নির্ধারণ করে কাঁচা চামড়া বিক্রি করে দেয়। ঈদের আগে গ্রেডিং করা চামড়া ৩৫ থেকে ৬৫ টাকা বর্গফুট হিসাবে বিক্রি করেছেন। আর যারা গড়ে বিক্রি করেছেন তারা ৪২ থেকে ৪৫ টাকার বেশি পাননি। কিন্তু ঈদের আগে সরকার চামড়ার গড় দাম নির্ধারণ করে দিল ৫৬ থেকে ৬২ টাকা স্কয়ার ফিট হিসাব করে। কিন্তু কোনো ট্যানারিই গড়ে এই দামে চামড়া কিনবে না। কিন্তু দামটি বাইরে প্রচার হয়ে যাওয়ায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অনেকেই বেশি দামে চামড়া কিনেছে; কেউবা বেশি দামে বিক্রি করার আশায় দাম ধরে রেখে সময় পার করেছে। এভাবেই নষ্ট হয়ে গেছে বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ।
কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের জানান, সারাবছর কসাইদের কাছ থেকে ৩৫ থেকে ৫০ টাকা বর্গফুট হিসাবে চামড়া কিনি। কোরবানির সময় সরকার দাম বেঁধে দেয় ৬২ টাকা করে। সারা বছর প্রতিদিন অল্প পরিমাণ যে চামড়া আসে, তা আড়তের নিয়মিত স্টাফ দিয়েই প্রক্রিয়াজাত করা যায়। কিন্তু ঈদের দিন অল্প সময়ে বেশি চামড়া চলে আসায় অতিরিক্ত লেবার ও বেশি দামে লবণ কিনতে হয়। একদিকে খরচ বেশি হয় অন্যদিকে সরকার নির্ধারিত বেশি দামে চামড়া কেনার চাপ থাকে। ফলে অনেকেই এই ব্যবসা ছেড়ে দিয়েছে। ১০ বছর আগেও চট্টগ্রামে ১৩০ জন আড়ৎদার ছিল। এখন ৩০-৩২ জনের বেশি ব্যবসায়ী নেই। সরকার একদিনের জন্য দাম নির্ধারণ করে গণমাধ্যমে প্রকাশ করেই দায় সারে। ট্যানারি মালিকরা ওই দামে আড়ৎদারদের কাছ থেকে চামড়া কিনছে কি না- সে ব্যাপারে কোনো তদারকি করে না। তিনি জানান, এখনো কোরবানির চামড়া আড়ৎ থেকে ট্যানারিতে যাওয়া শুরু হয়নি। সব চামড়া আড়তেই আছে। সরকার চাইলে এখন থেকেই ট্যানারি মালিকরা কী দামে চামড়া নিচ্ছে; তাদের বেঁধে দেওয়া দাম কার্যকর করছে কি না, মনিটরিং করতে পারে।
রীফ লেদারের পরিচালক মোখলেসুর রহমান জানান, ১০ বছর আগে প্রতি বর্গফুট চামড়া ১০০ টাকায় কিনেও লাভ করেছি। কিন্তু এখন ৫০ টাকা বর্গফুট কিনেও লোকসান গুনতে হচ্ছে। তাই দাম বেঁধে দেওয়ার দিকে নজর সীমাবদ্ধ না করে দেশে ও আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চামড়ার বাজার তৈরির দিকে মনোযোগী হতে হবে সরকারকে। নইলে এক সময়ের সম্ভাবনাময় শিল্পের এই বিপর্যয় কাটবে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

