গত ১৭ ফেব্রুয়ারি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে সমাপ্ত হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনকাল। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিদায়ে সবচেয়ে স্বস্তিতে এখন দিল্লি। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা রীতিমতো স্বস্তির নিঃশ্বাস নিচ্ছেন।
দিল্লি ও ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই খুশি দিল্লি। নতুন সরকারের সঙ্গে কাজ করতে অপেক্ষায় মোদি সরকার। তবে ভারতের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও ইতিবাচক খবর হলো ঢাকার মসনদে আর ড. ইউনূসকে দেখা যাবে না। গত ১৮ মাস বিভিন্ন ইস্যুতে দিল্লিকে ঢাকার পক্ষ থেকে যেভাবে চ্যালেঞ্জ জানানো হয়েছে, সেই অধ্যায়ের এখন সমাপ্তি ঘটেছে।
এদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক আমার দেশকে জানিয়েছেন, নতুন সরকারের আগমনে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো যে খুব সহজে সমাধান করা যাবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। দিল্লি তার হারানো প্রভাব আবার ফিরে পেতে চাইবে। চাইবে আওয়ামী লীগকে আবার বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনতে। অন্যদিকে পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা বন্ধ, বাণিজ্যে ভারসাম্য রক্ষাসহ বাংলাদেশের স্বার্থ-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোতে ভারত ঠিক কতটা আন্তরিকতা দেখাবেÑসেটা এক বড় প্রশ্ন হয়ে থাকবে। এছাড়া শেখ হাসিনা ইস্যুটি ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ককে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে থাকবে।
উল্লেখ্য, জুলাই বিপ্লবে শেখ হাসিনার পতনের সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্যবাদেরও এক ধরনের অবসান ঘটে। মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দিয়ে দিল্লি জানিয়ে দিয়েছে তারা জুলাই বিপ্লব এবং বিপ্লব-পরবর্তী ড. ইউনূস সরকারকে মেনে নেয়নি। ১৮ মাসের ড. ইউনূসের শাসনামলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ইস্যুতে অযাচিত হস্তক্ষেপের পাশাপাশি বাংলাদেশে একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য অব্যাহতভাবে অপচেষ্টা চালিয়েছে ভারত। সংখ্যালঘু নির্যাতনের মিথ্যা ও বানোয়াট অভিযোগ তুলে ভারতীয় নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে সে দেশের গণমাধ্যমগুলো অব্যাহতভাবে মিথ্যা প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে। চেষ্টা করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা উসকে দেওয়ার। শেখ হাসিনার উসকানিমূলক বক্তব্যের অডিও রেকর্ড একের পর এক ফাঁস করা হয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। ভারত সরকারের ইন্ধনে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলা চালিয়েছে জঙ্গি হিন্দুরা। জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশের ভিসা সেন্টার। নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে নামানো হয়েছে শেখ হাসিনাকে। শেখ হাসিনা সন্ত্রাসবাদ উসকে দেওয়ার মাধ্যমে ভণ্ডুল করতে চেয়েছিল ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন। কিন্তু কোনো কিছুতেই দমানো যায়নি ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে। বরং কীভাবে চোখে চোখ রেখে দিল্লিকে ডিল করা যায়, সেই উদাহরণ সৃষ্টি করে রেখে গেছেন তিনি।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনের সমাপ্তির পর দিল্লিতে ঠিক কী ধরনের প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যাচ্ছে, এমন প্রশ্নের জবাবে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেনÑএমন একজন সিনিয়র কূটনীতিক আমার দেশকে বলেন, এ মুহূর্তে দিল্লির নীতিনির্ধারকরা একেবারেই রিল্যাক্সড। তাদের মাঝে স্বস্তি ফিরে এসেছে। বাংলাদেশ ইস্যুতে দিল্লি এখন ভারমুক্ত। তিনি বলেন, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে অনুষ্ঠিত হয়েছে। এই নির্বাচনকে স্বীকৃতি দিয়ে সবার আগে অভিনন্দন জানিয়েছে ভারত। কারণ, এই নির্বাচনের মাধ্যমে ড. ইউনূসের শাসনের পরিসমাপ্তি হয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ব্যাপারে দিল্লির এই কঠোর নেতিবাচক মনোভাবের কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওই সিনিয়র কূটনীতিক বলেন, ১৮ মাসের অন্তর্বর্তী শাসনামলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে গেছে। ড. ইউনূস দিল্লিকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতি থেকে বেরিয়ে এসে একটি স্বাধীন ও ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রী মোদির সঙ্গে হওয়া একমাত্র বৈঠকে ড. ইউনূস সাফ জানিয়ে দেন, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক এগিয়ে নিতে হলে শেখ হাসিনার মুখ বন্ধ রাখতে হবে। দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই ভারতকে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে ড. ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ কোনোভাবে অস্থিতিশীল হলে তার প্রভাব ভারতেও পড়বে। ভারতে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে হামলার পর প্রতিক্রিয়া হিসেবে ভারতীয়দের জন্য ভিসা সার্ভিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। আইপিএল থেকে মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ায় কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বর্জনের মতো পদক্ষেপ নেয় ড. ইউনূস সরকার। তলানিতে থাকা পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে স্বাভাবিক করার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে নেওয়া হয় নানামুখী পদক্ষেপ, যা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করে। এছাড়া বাংলাদেশবিরোধী ভারতীয় পদক্ষেপের প্রতিবাদ জানাতে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় দূতকে ১৮ মাসে অন্তত ছয়বার তলব করা হয়। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ ইস্যুতে এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে দিল্লিকে। তাই পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, ভারতের নীতিনির্ধারকরা অপেক্ষায় ছিল কখন ইউনূস সরকার বিদায় নেবে।
তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের ব্যাপারে ভারতের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে ওই সিনিয়র কূটনীতিক বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের অবর্তমানে ভারতের সামনে বিএনপি ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। বিএনপির নিরঙ্কুশ বিজয় দিল্লির নীতিনির্ধারকরা বড় একটি সুযোগ হিসেবে দেখছে। নতুন সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার কথা জানিয়েছে ভারত সরকার। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে ফোনে কথা বলেছেন। শপথ অনুষ্ঠানে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে ঢাকায় পাঠিয়েছেন। ঢাকায় ভিসা সার্ভিস চালুর কথা বলা হয়েছে। সব মিলিয়ে দিল্লির পক্ষ থেকে ঢাকাকে এক ধরনের ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের নতুন সরকারের প্রতি দিল্লির সমর্থন নিঃশর্ত হবে না।
ওই কূটনীতিক আরো বলেন, মোদি সরকারের নীতিনির্ধারক থেকে শুরু করে বিভিন্ন থিংক ট্যাংক এবং ভারতের প্রধান গণমাধ্যমগুলো বাংলাদেশ বিষয়ে একই ধরনের মন্তব্য করছে। সবার একই প্রশ্ন, তারেক রহমান কি তার মা, অর্থাৎ খালেদা জিয়ার নীতি অনুসরণ করবেন, নাকি সেই নীতি থেকে বেরিয়ে আসবেন। দিল্লি মনে করে, খালেদা জিয়ার নীতির কারণে অতীতে বিএনপি সরকারের আমলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। এবারের নির্বাচনে ইসলামপন্থিদের উত্থানকে ভারত তার জন্য নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করছে। দিল্লি চাইবে ইসলামপন্থিদের রাশ টেনে ধরুক তারেক রহমানের সরকার। দিল্লির নীতিনির্ধারকরা চায় না শেখ হাসিনার প্রত্যার্পণের ইস্যুটি বারবার আলোচনায় আসুক। এছাড়া যেকোনো ফর্মেই হোক, বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগকে ফিরিয়ে আনা। শেখ হাসিনার আমলে সই হওয়া চুক্তিগুলো বহাল রাখার পাশাপাশি তা কার্যকর করা, তথাকথিত সংখ্যালঘু নির্যাতন বন্ধ ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, সীমান্ত পরিস্থিতি, সর্বোপরি গঙ্গা পানিচুক্তি নবায়নসহ পানিবণ্টন ইস্যুতে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে দিল্লি চাপে রাখবে বলে মন্তব্য করেন ওই কূটনীতিক।
বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের ভবিষ্যৎ আচরণ নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশিষ্ট আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শহীদুজ্জামান। আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ায় ভারত রীতিমতো হাঁপ ছেড়ে বেঁচেছে। ড. ইউনূস যেভাবে শক্ত হাতে দিল্লিকে ডিল করেছেন, তা অতীতে কেউ করতে পারেনি এবং ভবিষ্যতেও পারবে না। ড. ইউনূস কোনো ধরনের ছাড় দেননি। তিনি বলেন, এ মুহূর্তে ভারতের সামনে কোনো বিকল্প নেই। তাই তারা মিষ্টি মিষ্টি কথা বলছে। অভিনন্দন জানিয়ে তারেক রহমানকে ফোন করেছেন মোদি। পাঠিয়েছেন স্পিকারকে। তাদের উদ্দেশ্য নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ আছে। তারা তাদের তথাকথিত নিরাপত্তা ইস্যুকে সামনে আনবে। চীন-পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে তারা তাদের নিরাপত্তা ইস্যুর সঙ্গে যোগ করবে। এটা আমাদের জন্য এক বিপজ্জনক পরিস্থিতি। নতুন সরকারকে এটা অবশ্যই বিবেচনায় রাখতে হবে। ভারত নিশ্চিতভাবেই চাইবে হাসিনার সময়ে করা চুক্তিগুলো বহাল থাকুক। তারা আওয়ামী লীগ ছাড়া বাংলাদেশে অন্য কারো শাসন মেনে নিতে পারে না। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে এ বিষয়টি স্মরণে রাখতে হবে। এছাড়া জুলাই অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছে, সেই তরুণ প্রজন্ম কখনো দিল্লির আধিপত্যবাদ মেনে নেবে না।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবীর মনে করেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি হবে ইস্যুভিত্তিক। এ ব্যাপারে আমার দেশকে তিনি বলেন, দিল্লি এখন নতুন সরকারের সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। গত ১৮ মাস তারা একটি কঠিন সময় পার করেছে। এখন দুদেশের মধ্যে ইস্যুভিত্তিক আলোচনা শুরু হবে। তবে এই আলোচনাগুলো যে খুব সহজ হবে, তা বলা যাবে না। ভারত প্রথমে তাদের নিরাপত্তা ইস্যুতে জোর দেবে। শেখ হাসিনার আমলে নিরাপত্তা নিয়ে দিল্লির কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না। ভারত চাইবে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় চুক্তিগুলো কার্যকর থাকুক। এগুলো ঠিক থাকলে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে ভারতের কোনো সমস্যা থাকবে না। তিনি বলেন, অন্যদিকে গঙ্গাচুক্তি চলতি বছরই শেষ হচ্ছে। এটা নিয়ে বাংলাদেশকে ভারতের সঙ্গে জটিল নেগোসিয়েশনে বসতে হবে। তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ইস্যু তো আছেই। এছাড়া বাণিজ্যে ভারসাম্য আনা, সীমান্ত হত্যা বন্ধের মতো ইস্যুগুলোতে বাংলাদেশের কথা ভারত শুনবে কী নাÑ সেটা এক বড় প্রশ্ন। সুতরাং আগামী দিনগুলোতে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ থাকবে বলেই আমার ধারণা। সাবেক এই রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার খালেদা জিয়ার ভারতনীতি অনুসরণ করছে কি নাÑএ মুহূর্তে সেদিকেই মূলত নজর রাখছে দিল্লির সাউথ ব্লক।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

