আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

এই রমজানে যেভাবে সন্তানকে আল্লাহভীরু বানাবেন

আব্দুস সাত্তার সুমন

এই রমজানে যেভাবে সন্তানকে আল্লাহভীরু বানাবেন

মানুষের আত্মগঠন, চরিত্র নির্মাণ ও আল্লাহমুখী জীবনের প্রশিক্ষণকাল রমজান মাস । এই মাসের প্রতিটি দিনেই রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের অফুরন্ত ধারা প্রবাহিত হয়। তাই শিশুদের রমজানকে আলাদা আলাদা ভাগে নয়; বরং ৩০ দিনের একটি ধারাবাহিক তারবিয়াত হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে, বর্তমান সময়ে মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেট ও গেমের আসক্তি শিশুদের হৃদয় থেকে ইবাদতের স্বাদ দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। অথচ আল্লাহতায়ালা বলেন : ‘হে মুমিনরা! তোমাদের ওপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে… যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পারো।’ (সুরা আল-বাকারা ২ : ১৮৩)

তাকওয়ার এই শিক্ষা ছোটবেলা থেকেই শুরু করতে হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : ‘তোমরা তোমাদের সন্তানদের সাত বছর বয়সে সালাতের নির্দেশ দাও।’ (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯৫)

বিজ্ঞাপন

অতএব রমজানের ৩০ দিন হতে পারে শিশুদের জন্য ঈমান, আমল ও আদব শেখার বাস্তব কর্মসূচি।

পারিবারিক নিয়ত : রমজানের প্রথম পাঠ

রমজানের একেবারে শুরুতেই পরিবারে ছোট্ট বৈঠক হতে পারেÑআমাদের রমজান কেমন হবে?

এখানে তিনটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি : নামাজ, কোরআন ও ভালো কাজ।

কারণ আল্লাহ বলেন : ‘তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করো।’ (সুরা আত-তাহরিম ৬৬:৬)

শিশু বুঝবে সে এই রমজানের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

একটি নূরভরা দৈনিক রুটিন

সাহরি : এটি হলো সুন্নাহর প্রশিক্ষণ। রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘তোমরা সাহরি খাও, এতে বরকত রয়েছে।’ (সহিহ বুখারি : ১৯২৩)

শিশুকে ভালোবাসা দিয়ে জাগানো, এক গ্লাস পানি ও একটি খেজুরের মাধ্যমেই তার মনে সুন্নাহর প্রতি ভালোবাসা জন্মাবে।

ফজরের পর : কোরআনের আলো

আল্লাহ বলেন : ‘এই কোরআন মানুষকে সঠিক পথের দিকে পরিচালিত করে।’ (সুরা আল-ইসরা ১৭ : ৯)

প্রতিদিন একটি আয়াত, একটি দোয়া এটাই হোক শুরু।

দিনের সময় : স্ক্রিন নয়, সৃজনশীলতা

রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও খারাপ কাজ ত্যাগ করল না, তার পানাহার ত্যাগে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (সহিহ বুখারি : ১৯০৩)

এখান থেকেই শেখানো যায়, চোখেরও রোজা আছে।

বিকল্প কার্যক্রম

▪️রমজান ডায়েরি, ইসলামি গল্প, ক্যালিগ্রাফি ও মায়ের কাজে সাহায্য।

ইফতারের মুহূর্ত : দোয়ার স্কুল

রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘রোজাদারের দোয়া ফিরিয়ে দেওয়া হয় না।’ (তিরমিজি : ৩৫৯৮) এই সময় শিশুকে দোয়া শেখানো মানে তার হৃদয়ে আল্লাহর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক তৈরি করা।

রাত : আত্মমূল্যায়নের সময়

দিন শেষে একটি প্রশ্ন-আজ আমি কাকে খুশি করেছি? এটাই হবে তার আত্মশুদ্ধির শুরু।

কোরআনের সঙ্গে শিশুর বন্ধুত্ব

রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে কোরআন শেখে ও শেখায়।’ (সহিহ বুখারি : ৫০২৭)

বাস্তব পদ্ধতি : প্রতিদিন একটি আয়াত, অর্থসহ শিক্ষা, মা-বাবার সঙ্গে তিলাওয়াত।

সামাজিক মানবিকতা : জীবন্ত রমজান

রাসুল (সা.) ছিলেন রমজানে সবচেয়ে বেশি দানশীল। (সহিহ বুখারি : ৬) সুতরাং শিশুকে দিয়ে করাতে পারেন-ইফতার বিতরণ, গরিবদের খাবার দেওয়া ও মসজিদ পরিষ্কার।

রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘সে মুমিন নয়, যে নিজে পেট ভরে খায় অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে।’ (মুসনাদে আহমাদ)

আত্মসংযম : রোজার আসল শিক্ষা

রাসুল (সা.) বলেছেন : ‘রোজা ঢালস্বরূপ।’ (সহিহ বুখারি : ১৮৯৪) সুতরাং শিশু শেখানÑরাগ নিয়ন্ত্রণ, মিথ্যা না বলা, ঝগড়া না করা।

রাতের নীরবতা : লাইলাতুল কদরের অনুভূতি

আল্লাহ বলেন : ‘লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।’ (সুরা আল-কদর ৯৭ : ৩)

দোয়া : আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউন তুহিব্বুল আফওয়া ফা’ফু আন্নি। (তিরমিজি : ৩৫১৩)

শিশুর জন্য কয়েক মিনিট তাহাজ্জুদই হতে পারে সারাজীবনের স্মৃতি।

মাস শেষে যে পরিবর্তন

এই ত্রিশ দিনের প্রশিক্ষণে-নামাজের অভ্যাস, কোরআনের সঙ্গে সম্পর্ক, মোবাইলনির্ভরতা কমে যাওয়া, দানশীলতা, আত্মসংযম ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা।

আল্লাহ বলেন : ‘নিশ্চয়ই সফল হয়েছে সে, যে নিজেকে পরিশুদ্ধ করেছে।’ (সুরা আল-আ‘লা ৮৭ : ১৪)

আজকের শিশুর হাতে যদি আমরা রমজানের এই নূরভরা পরিকল্পনা তুলে দিতে পারি, তবে সে শুধু রোজাদার হবে না; হবে কোরআনের মানুষ, নামাজের মানুষ, মানবতার মানুষ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরা ঈমানে তাদের অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সন্তানদেরও তাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেব।’ (সুরা আত-তুর ৫২ : ২১)

রমজান তখন আর একটি মাস থাকবে না, এটি হয়ে যাবে একটি প্রজন্ম গড়ার বিপ্লব।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন