গোয়েন্দা সংস্থার নাম ব্যবহার করে সদ্য বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের ফোন করে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্ব পালনকালে উপদেষ্টাদের বিভিন্ন কার্যক্রমের কথা উল্লেখ করে সেসব কাজে অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। এসব কাজের জন্য তাদের ভুগতে হবে বলেও হুমকি দেওয়া হচ্ছে এসব ফোনকলে। যদিও সরকার ও গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে সাবেক উপদেষ্টাদের জানানো হয়েছে, তাদের পক্ষ থেকে এমন কোনো ফোন করা হয়নি। আমার দেশের কাছে সাবেক দুজন উপদেষ্টা এমন রহস্যময় ফোন পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
সূত্র জানায়, ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হয়। ওই দিনই আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় নেন জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা। স্বাভাবিক নিয়মেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেয় নতুন সরকার। বিষয়টি আগে থেকে টের পেয়ে কেউ কেউ নিজে থেকেই পদত্যাগ করেন। এসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে বিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে নতুন সরকারের দূরত্বের বিষয়টি দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এরই মাঝে বিদায়ি উপদেষ্টাদের ফোনে হুমকি দেওয়ার খবরটি সামনে এসেছে।
বিষয়টি নিয়ে সদ্য বিদায়ি দুজন উপদেষ্টার সঙ্গে কথা হয়েছে আমার দেশের। দুজনকেই সরকারের প্রভাবশালী গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইর কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে একাধিকবার ফোন করে হুমকি দেওয়া হয়েছে। রহস্যময় ওই ফোনকলে জুলাই-পরবর্তী সরকারের করা বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে অনৈতিক ও অসাংবিধানিকভাবে করা হয়েছে উল্লেখ করে এর জন্য বিদায়ি উপদেষ্টা ও তাদের সহযোগী সরকারি কর্মকর্তাদের ভুগতে হবে বলেও হুমকি দেওয়া হয়েছে।
সাবেক উপদেষ্টারা জানান, ইফতারের আগে কিংবা গভীর রাতে ইন্টারনেটভিত্তিক বিভিন্ন অ্যাপস ব্যবহার করে তাদের মুঠোফোনে কল দেওয়া হচ্ছে। প্রথমে স্যার বলে সম্বোধন করে সালাম দিয়ে কথা শুরু করলেও তাদের ভাষা থাকে অত্যন্ত রূঢ়। অনেকটা ধমকের সুরে কথা বলেন গোয়েন্দা কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া রহস্যময় ব্যক্তিরা। নানা ধরনের হুমকি-ধমকি শেষে গণমাধ্যম এড়িয়ে চলার নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে এসব ফোনকলে।
আমার দেশের সঙ্গে যে দুজন উপদেষ্টার কথা হয়েছে, তাদের একজন নিজের নাম প্রকাশ করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। অন্যজন হলেন সদ্যবিদায়ি অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম বীরপ্রতীক। তিনি জানান, দায়িত্ব ছাড়ার পর থেকে তার কাছে একাধিক অজ্ঞাত ফোন এসেছে। ফোনদাতারা ডিজিএফআইয়ের বিভিন্ন শাখার কর্মকর্তা পরিচয়ে কথা বলেছেন। এ সময় মোবাইল ফোনে ডিজিএফআইয়ের মনোগ্রামও ভেসে উঠেছে। তারা বলছেন, দায়িত্ব পালনকালে উপদেষ্টারা অনিয়ম করেছেন। এর ফল ভোগ করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে রিপোর্ট করেছেন তিনি। এছাড়া ডিজিএফআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছেন। ডিজিএফআই থেকে জানানো হয়েছে, এ ধরনের কোনো ফোনকল তাদের পক্ষ থেকে করা হয়নি। তার বিশ্বাস, সদ্যবিদায়ি উপদেষ্টাদের মধ্যে ভীতির আবহ তৈরি করতে একটি মহল গোয়েন্দা সংস্থার নাম ব্যবহার করে ভুয়া পরিচয়ে ফোন করে আতঙ্ক ছড়ানোর অপচেষ্টা করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলা অন্য সাবেক উপদেষ্টা জানান, আরো কয়েকজন উপদেষ্টাকেও একই রকম ফোন করা হয়েছে। এ সময় অতীত কর্মকাণ্ডের জন্য বিশেষ করে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ভুগতে হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে। এসব সাবেক উপদেষ্টার জন্য পার্শ্ববর্তী দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের দূরত্ব তৈরি হয়েছে বলেও ফোনে মনে করিয়ে দেওয়া হয়েছে। তবে তিনিও জানান, বর্তমান সরকার ও সংশ্লিষ্ট গোয়েন্দা সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাবেক উপদেষ্টারা যোগাযোগ করেছেন। গোয়েন্দা সংস্থাটির পক্ষ থেকে এ ধরনের কোনো ফোন করা হয়নি বলে তাদের আশ্বস্ত করা হয়েছে। এই উপদেষ্টা আরো জানান, বিদায়ি সরকারের উপদেষ্টারা কেউ সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তারা কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধাভোগীও নন। শুধু গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের দায়িত্ব নেওয়ার কারণে পতিত ও পলাতক শক্তি তাদের ওপর ক্ষুব্ধ। আর এ কারণেই ওই গোষ্ঠীই হয়তো ইন্টারনেট ব্যবহার করে ভুয়া ফোনকলের মাধ্যমে তাদের অস্বস্তির মধ্যে রাখার অপচেষ্টা করছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

