কাদা-পানিতে গরু নিয়ে বিপাকে বেপারিরা

স্টাফ রিপোর্টার

কাদা-পানিতে গরু নিয়ে বিপাকে বেপারিরা

টানা বৃষ্টি, হাঁটু সমান কাদা-পানি আর চরম অব্যবস্থাপনায় নাকাল রাজধানীর পশুর হাটগুলো। প্রতিকূল আবহাওয়ার সুযোগ নিয়ে কম দামে গরু কেনার এক ‘জেতার প্রতিযোগিতায়’ মেতেছেন ক্রেতারা।

ফলে লালন-পালনের খরচ তোলা তো দূরের কথা, কেনা দামের চেয়েও কম মূল্যে পশু বিক্রি করে লোকসান হওয়ার কথা বলছেন দূর-দূরান্ত থেকে আসা কিছু কিছু খামারি ও বেপারিরা।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার রাজধানীর উত্তরার দিয়াবাড়ি হাট সরেজমিনে ঘুরে ক্রেতা-বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে এমন করুণ চিত্র দেখা গেছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, গতকাল সোমবারের মতোই আজ মঙ্গলবারও বৃষ্টির কারণে দিয়াবাড়ি হাটের ভেতরের সড়কগুলো কাদা আর গোবরে একাকার হয়ে গেছে সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থা হাটের ভেতরের মাঠের।

সেখানে কোথাও কোথাও হাঁটু সমান পানি জমে রয়েছে। সেই নোংরা পানিতেই দাঁড়িয়ে আছে কোরবানির পশু। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে ক্লান্ত হয়ে অনেক গরুকে কাদাপানির মধ্যেই শুয়ে পড়তে দেখা গেছে।

বৃষ্টিতে ভিজে অনেক গরু অসুস্থ হয়ে পড়েছে, খামারীদের ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে গরুকে ওষুধ খাওয়াতে। সব মিলিয়ে হাটের এমন বেহাল দশা ও চরম অব্যবস্থাপনায় বেপারিদের মাঝে তীব্র অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিরাজ করছে।

হাটের এই বৈরী পরিবেশের কারণে বাধ্য হয়ে লোকসানে পশু ছেড়ে দিচ্ছেন বিক্রেতারা। জামালপুরের আব্দুল জলিল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন আমরা যে দামে গরু এলাকায় বিক্রি করতে পারতাম, আজ এখানে তার চেয়েও কম দাম। একদিকে হাটের দর কম, অন্যদিকে পানি-কাদাসহ নানা সমস্যায় হাটে টেকা মুশকিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বড় ক্ষতির চেয়ে কম দামে স্বল্প লোকসানে বিক্রি করে বাড়ি ফেরাই এখন আমাদের মুক্তি।

অনুরূপ অভিজ্ঞতা রাজশাহীর বাগা থেকে ছয়টি গরু নিয়ে আসা ওসমানের। তিনি বলেন, গতকাল যে গরু এক লাখ ১০ হাজার টাকা দাম বলার পরও দিইনি, আজ সেটা বরাবর এক লাখে বিক্রি করতে হলো। অথচ এটা বিক্রি করার টার্গেট ছিল এক লাখ ২০ হাজারে৷ এই গরু আমি কিনেছি ৬৭ হাজারে। এরপর ছয় মাস লালনপালন করলাম। ভাড়া খরচ করে ঢাকায়ও নিয়ে আসলাম। কিন্তু কমেই দিতে হলো।

কমে ছাড়ার কারণ বলতে গিয়ে তিনি বলেন, বৃষ্টির কারণে কাদা-পানিতে গরু নিয়ে টেকা কঠিন। তাই পুরো লসের চেয়ে সামান্য লস মেনে নিয়েই ছেড়ে দিলাম।

চুয়াডাঙ্গার সরোজগঞ্জ থেকে ২০টি গরু নিয়ে আসা মো. হাবিব জানান, চারটি গরু বিক্রি করে তার ইতোমধ্যে ৬০ হাজার টাকা লোকসান হয়েছে। তিনি বলেন, ঋণ করে গরু হাটে এনেছিলাম। এখন গ্রামে ফিরে খেত-খামারে দিনমজুরি (বদলা) দিয়ে এই ঋণ শোধ করতে হবে।

নাটোরের সিংড়া থেকে দুটি মহিষ নিয়ে আসা আব্দুস সবুর চরম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমরা এই হাটে আর কখনোই আসব না। পুরো হাটেই অব্যবস্থাপনা। যথাসময়ে হাট প্রস্তুত হয়নি। পানি নেমে যাওয়ার কোনো ব্যবস্থাই নেই। ছয় মাস লালন-পালন করার পরও কেনা দরেই মহিষ বিক্রি করতে হচ্ছে।

এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে চুরির আতঙ্ক। মো. হাবিব অভিযোগ করেন, হাটে কোনো নিরাপত্তা নেই। পাশের বেপারির দুইটা গরু চুরি হয়ে গেছে। এরপর বেচারা আর দুইটা কম দামে দিয়ে চলে গেছে। এরপর তো কাদা-পানির কষ্ট আছেই।

বিক্রেতাদের যখন মন খারাপ, ক্রেতাদের মুখে তখন স্বস্তির হাসি। দাম কম হওয়ায় ক্রেতারা একে 'ন্যায্য দাম' বা নিজেদের জয় হিসেবে দেখছেন।

উত্তরা থেকে আসা ব্যাংকার হারুন মোরশেদ বলেন, আগে যে গরুর দাম এক লাখ ৪০ হাজার চেয়েছিল, সেটা আজ এক লাখে কিনলাম। আজ মোটামুটি সস্তা। হাঁটু সমান কাদা-পানি মাড়িয়ে কষ্ট করে হলেও বাজেটের মধ্যে পাওয়ায় আজই কিনে নিলাম।

ওসমান খামারীর কাছ থেকে এক লাখ টাকায় গরু কেনা মেহেদি মাহবুব বলেন, অন্য হাটেও দেখে এসেছি, এখানে আজ একটু কমেই পাওয়া যাচ্ছে। খামারির লোকসান ঠেকাতে যে আমি কিছু বেশি দেব, সেই বাজেট তো আমার নেই। আমি এক লাখ বললাম আর উনি দিয়ে দিলেন।

১ লাখ ৯০ হাজার টাকায় বড় একটি অস্ট্রেলিয়ান ক্রস জাতের গরু কিনে নিয়ে যাওয়ার সময় আহমেদ তালুকদার নামের এক ক্রেতা বলেন, এতদিন বেপারীরা বেশি দাম হাঁকাচ্ছিল। আজ বাধ্য হয়ে ন্যায্য দামে দিল। গতবারের তুলনায় এই দামটাই পারফেক্ট।

হাটের বিকেল ও সন্ধ্যার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, আবহাওয়া এবং অব্যবস্থাপনাকে পুঁজি করে ক্রেতারা দরদামে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন। তবে মাঠের পানি নিষ্কাশন ও নিরাপত্তার বিষয়ে হাট ইজারাদারদের গাফিলতি ক্ষুব্ধ করে তুলেছে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আসা প্রান্তিক খামারীদের। তাদের কেউ কেউ সামান্য লাভ করতে পারলেও ছোট ব্যবসায়ীরা মূলত লোকসানে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...