পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মাঠে থাকলেও পায়নি নগদ বরাদ্দ

পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনাবাহিনী মাঠে থাকলেও পায়নি নগদ বরাদ্দ
ছবি: সংগৃহীত

সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানের দুর্গম জনপদে যখন হাজারো মানুষ খাদ্য ও আশ্রয় সংকটে দিন কাটাচ্ছেন, তখন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সবচেয়ে বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। নৌকা, ট্রাক ও হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় খাদ্য ও জরুরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার দৃশ্য প্রতিনিয়ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বরাদ্দের সরকারি নথিতে দেখা গেছে, মাঠে সবচেয়ে সক্রিয় এ বাহিনীর জন্য কোনো নগদ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়নি।

গত ৭ জুলাই জারি করা মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ-সংক্রান্ত ওই নথি অনুযায়ী, অর্থ মন্ত্রণালয় পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অনুকূলে ত্রাণ (টিআর) খাতে ৫৩ হাজার ৮০০ টন চাল, ৩০ হাজার টন গম এবং ৯ কোটি টাকা নগদ বরাদ্দ দিয়েছে। তিন পার্বত্য জেলার সরকারি মঞ্জুরি আদেশের মাধ্যমে এ বরাদ্দ ছাড় করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

নথি অনুযায়ী, সংস্কৃতি ও উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের ২৪ পদাতিক ডিভিশনের জিওসির অধীনে সেনাবাহিনীর জন্য চার হাজার টন চাল ও ৮ হাজার টন গমসহ মোট ১২ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে এ খাতে কোনো নগদ অর্থ বরাদ্দ নেই।

অন্যদিকে ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং একই কর্মসূচিসংশ্লিষ্ট টাস্কফোর্সের জন্য পৃথকভাবে মোট ৯ কোটি টাকা নগদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি এসব কর্মসূচির আওতায় প্রায় ৭১ হাজার টন খাদ্যশস্য বরাদ্দের তথ্যও রয়েছে।

বরাদ্দের তালিকা অনুযায়ী, বিশেষ প্রকল্প কর্মসূচির আওতায় পার্বত্য জেলা পরিষদ, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে ১৯ হাজার ৭২৫ দশমিক ৩০৭ টন চাল এবং ৫ হাজার ৬৫২ টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী পুনর্বাসন কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত ১২ হাজার ২২৩ পরিবারের জন্য খাগড়াছড়ি এবং রাঙ্গামাটির জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সাড়ে ১৫ হাজার টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। উপজাতীয় পরিবারের গৃহায়ন কর্মসূচির আওতায় ২৩ হাজার ৯৯৭ পরিবারের জন্য ১২ হাজার দশমিক ৭২৪ টন চাল ও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গম বরাদ্দ রয়েছে।

এ ছাড়া জনসংহতি সমিতির তালিকাভুক্ত ১ হাজার ৯৬৬ সদস্যের খাদ্য পুনর্বাসন কর্মসূচির জন্য ২ হাজার ৩৫৯ দশমিক ৮০০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সব মিলিয়ে মোট ৫৩ হাজার ৮০০ টন চাল ও ৩০ হাজার টন গম বরাদ্দের বিপরীতে সেনাবাহিনীর অংশ মাত্র ১২ হাজার টন খাদ্যশস্য।

বরাদ্দের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন

নগদ বরাদ্দের তালিকায় আপৎকালীন পরিস্থিতি মোকাবিলা কর্মসূচির আওতায় তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান, জেলা প্রশাসক এবং ভারত প্রত্যাগত উপজাতীয় শরণার্থী প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু নির্দিষ্টকরণ ও পুনর্বাসন-সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যানকে পৃথকভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। একই টাস্কফোর্সের জন্য আবার আলাদা খাতেও অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। ফলে দুটি খাত মিলিয়ে নগদ বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি টাকা।

অথচ নগদ বরাদ্দের কোনো তালিকাতেই সেনাবাহিনীর নাম নেই। ফলে সবচেয়ে বেশি মাঠপর্যায়ে সক্রিয় বাহিনী হয়েও তারা কেবল খাদ্যশস্য বরাদ্দেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

ত্রাণ পৌঁছানো নিয়েও সংশয়

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সাম্প্রতিক বন্যা ও পাহাড়ি ঢলের সময় দুর্গম এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমে সেনাবাহিনীকেই সবচেয়ে বেশি সক্রিয় দেখা গেছে। কিন্তু একই সময়ে আঞ্চলিক পরিষদ, টাস্কফোর্স বা অন্য সংস্থাগুলোর ত্রাণ কার্যক্রম মাঠপর্যায়ে তেমন দৃশ্যমান ছিল না।

তাদের মতে, বিভিন্ন কর্মসূচির নামে বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য ও নগদ অর্থ বরাদ্দ হলেও তা প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে কতটা পৌঁছায়, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তারা মনে করেন, ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তার বড় একটি অংশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বিতরণ করা হলে তা অধিক স্বচ্ছতার সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হতো। একই সঙ্গে পার্বত্য অঞ্চলের জনগণের সঙ্গে সেনাবাহিনীর আস্থা ও সম্পর্ক আরো সুদৃঢ় হতো।

তাদের ভাষ্য, সেনাবাহিনী নিজেদের জন্য বরাদ্দকৃত সীমিত খাদ্যশস্যের প্রয়োজনীয় অংশ ব্যবহারের পর অবশিষ্ট অংশও বিভিন্ন সময় দুর্গম এলাকার অসহায় মানুষের মধ্যে বিতরণ করে থাকে। সীমিত বরাদ্দ নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে তারা মানবিক সহায়তা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যা

এ বিষয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন বলেন, সরকারি বিধিবিধান অনুসারেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি নতুন কোনো ব্যবস্থা নয়; বহু বছর ধরেই একই পদ্ধতিতে বরাদ্দ হয়ে আসছে। তিনি বলেন, মাঠপর্যায়ে ত্রাণ কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা তিনি নিজেই তদারকি করছেন।

তবে বাস্তবতা হলো, সাম্প্রতিক দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি মাঠে থেকে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা বাহিনীর জন্য নগদ বরাদ্দ না থাকায় বরাদ্দের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, ভবিষ্যতে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বরাদ্দ কাঠামো পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

এলাকার খবর
Loading...