দেশে কয়েক দিন ধরে বিপজ্জনক মাত্রার বায়ুদূষণ হচ্ছে। বাড়ছে শীতের তীব্রতাও। এর প্রভাবে বাড়ছে শিশুদের সর্দি, কাশি ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ।
প্রতিদিনই এসব রোগ নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। চিকিৎসকদের ব্যক্তিগত চেম্বারেও তাদের নেওয়া হচ্ছে।
ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই কমছে তাপমাত্রা। গতকাল ঢাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল গোপালগঞ্জে, ১২ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
বায়ুদূষণে ঢাকার বাতাস বৃহস্পতিবার রাতেও খুবই অস্বাস্থ্যকর ছিল। একিউআই’র তথ্য অনুযায়ী এ সময় ঢাকার বাতাসের মান ছিল ২২০।
শিশু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অধ্যাপক মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, “বৃহস্পতিবার ছাড়া দেশে সেভাবে কনকনে শীত পড়েনি। গত এক মাস মৃদু শীতের সঙ্গে খুব শুকনো মৌসুম গেছে। বৃষ্টি না থাকায় বাতাসে ধূলিকণা অনেক বেশি। এর প্রভাবে শিশুদের সর্দি ও কাশি বেড়েছে।”
এদিন শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে সর্দিকাশি নিয়ে আসা শিশুদের ভিড় দেখা গেছে।
মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থেকে ৯ মাস বয়সী শিশু অয়ন সরকারকে নিয়ে এখানেএসেছেন তার বাবা-মা।
অয়নের বাবা মিঠুন সরকার বলেন, “তার কয়েকদিন ধরেই ঠান্ডা, গ্যাস দিলে কমে যায়। শীত বাড়লে ঠান্ডাও বাড়ছে। গলায় গর গর করে, কাশে। এজন্য নিয়া আসছি।”
মিরপুরের শ্যাওড়াপাড়া থেকে এক মাস বয়সী ইহানকে নিয়ে এসেছেন তার মা নয়নতারা। তিনি বলেন, “দুইদিন ধরে বাচ্চার খুব ঠান্ডা, কাশিও আছে। এ কারণে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে এসেছি। হঠাৎ করেই ঢাকায় শীত পড়ে গেছে, এ কারণে বাচ্চা অসুস্থ হয়ে গেছে।”
ঢাকার কল্যাণপুরের এক মাস বয়সী আহনাফের মা মেহনাজ বলেন, বেশ কিছু দিন ধরে তার ছেলের জ্বর। এখন তা আরও বেড়েছে।
দুই সপ্তাহ ধরে জ্বর, থেমে থেমে জ্বর আসে। সঙ্গে কাশি ছিল। ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়ানোর পর কাশি থামছে, কিন্তু জ্বর সারেনি। এ কারণে আজ আবার নিয়ে আসছি- বলেন মেহনাজ
শিশু হাসপাতালের তথ্যে দেখা গেছে, ১৫ থেকে ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৩৮ শিশু বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে। এ সময় প্রতিদিন গড়ে বহির্বিভাগে এসেছে ২০৯ শিশু। ১ থেকে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসেছে ২৪৩২ শিশু, অর্থাৎ দৈনিক গড়ে ২২১ জন।
১৫ নভেম্বর থেকে গত বুধবার পর্যন্ত ৪ হাজার ২৯৪টি শিশু এসেছে সর্দি-কাশি নিয়ে। এছাড়া ১০৮৬টি শিশু নিউমোনিয়া, ৩৯০টি শিশু অ্যাজমার চিকিৎসা নিয়েছে এই হাসপাতালে।
শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ১৫ নভেম্বর থেকে গত বুধবার পর্যন্ত ১২২৭টি শিশু ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে এসেছে। এর মধ্যে ২০১ জনকে ভর্তি করা হয়েছে।
হাসপাতালের জরুরি বিভাগের আবাসিক চিকিৎসক মাহমুদুল হক চৌধুরী বলেন,সম্প্রতি এ ধরনের রোগ নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। সাধারণ সর্দি নিয়ে আসা শিশুর সংখ্যাই বেশি।
“বেশিরভাগ শিশুরই নাক দিয়ে সর্দি পড়ছে। অনেকের নাক বন্ধ থাকছে। শিশুদের মায়েরা বলছে তাদের কাশি। আসলে ওটা কাশি নয়। হাসপাতালে যেমন রোগী আসছে, চেম্বারেও আসছে”- বলেন মাহমুদুল হক চৌধুরী।
শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা বলেন, “কাশি আবার দুই রকম হচ্ছে, শুকনো কাশি ও ভেজা কাশি। সর্দি, কাশি, জ্বর, কখনো বমি, ডায়রিয়া আক্রান্ত হয়ে শিশুরা আসছে। ডেঙ্গুর প্রভাব এখনও যায়নি, ডেঙ্গুতেও শিশুরা আক্রান্ত হচ্ছে।”
শীতকালীন রোগ থেকে শিশুদের রক্ষায় অভিভাবকদের সচেতন থাকার বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, এখন দিনের তাপমাত্রা সবসময় এক রকম না। সে অনুযায়ী কাপড় পরানো, ধুলায় সমস্যা হয় এমন বাচ্চাদের বাইরে কম নিয়ে যাওয়া এবং মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে।
“মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে পারলে ধূলিজনিত সর্দি, কাশি দূর করা সম্ভব। যেসব বাচ্চার অল্পতেই সর্দি-কাশি জ্বর হয়, তাদের বেশি ভিড় হয় এমন জায়গায় নেওয়া যাবে না। খালি পায়ে হাঁটা যাবে না, গরম পানি দিয়ে গোসল করানো, এক বছরের বেশি বয়সের বাচ্চাদের আদা চা, লেবু চা, গরম পানিতে মধু, তুলসিপাতা মিশিয়ে খাওয়ানো যেতে পারে। প্রাথমিকভাবে প্রাকৃতিক পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করলে চিকিৎসক পর্যন্ত যাওয়া লাগে না”- উল্লেখ করেন ডা. মোহাম্মদ সহিদুল্লা।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

