ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার দুই বছর পর আবারও বাংলাদেশে ফেরার দৃঢ় ইচ্ছার কথা জানিয়েছেন পলাতক প্রধানমন্ত্রী হাসিনা।
তিনি বলেছেন, দেশে ফিরলে তাকে গ্রেপ্তার, কারাবন্দি এমনকি মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হতে পারে। তবু সমর্থকদের ছেড়ে তিনি আর বিদেশে থাকতে চান না।
বুধবার নয়াদিল্লি থেকে সাংবাদিকদের উদ্দেশে দেওয়া এক অডিও বার্তায় ৭৮ বছর বয়সী হাসিনা বলেন, ‘আমি জানি, আমাকে আটক করা হতে পারে, কারাগারে পাঠানো হতে পারে। তারা হয়তো সাজানো মামলার রায় কার্যকর করার চেষ্টা করবে। কিন্তু ভয় আমার জনগণের প্রতি দায়িত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।’
নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে দেওয়া এই বক্তব্য ছিল হাসিনার ১৫ বছরের শাসনের অবসানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে। ২০২৪ সালের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের মুখে তার সরকারের পতন হয় এবং তিনি ভারতে চলে যান।
তার শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর দমন-পীড়ন, হত্যা, গ্রেপ্তার, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং বিতর্কিত নির্বাচনের অভিযোগ ছিল। হাসিনা এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
মৃত্যুদণ্ডের রায় ও প্রত্যর্পণের দাবি
২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল হাসিনাকে মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় বিক্ষোভকারীদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগে তাকে এই সাজা দেওয়া হয়।
জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই আন্দোলন চলাকালে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলি ও বিভিন্ন সংঘর্ষে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৪০০ জন নিহত হন।
বাংলাদেশ সরকার বারবার ভারতকে হাসিনাকে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। তবে ঘনিষ্ঠ মিত্র ভারত জানিয়েছে, বিষয়টি তারা পর্যালোচনা করছে।
হাসিনার বক্তব্যের সময় ঢাকায় তার কুশপুত্তলিকা পোড়ান বিক্ষোভকারীরা। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার নয়াদিল্লিতে ওই অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, এ ঘটনা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে আরো চাপ তৈরি করতে পারে।
হাসিনার বক্তব্য ঘিরে নতুন উত্তেজনা
হাসিনার বক্তব্যের দিন মাগুরায় সাবেক ক্রিকেট অধিনায়ক সাকিব আল হাসানের পৈতৃক বাড়িতে হামলা চালায় একটি বিক্ষুব্ধ জনতা।
সাকিব হাসিনার দল আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য। গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে তিনি দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তার বিরুদ্ধে হত্যা, অর্থ আত্মসাৎ, প্রতারণা ও অর্থপাচারের অভিযোগ রয়েছে।
হাসিনার বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান স্মরণে হাসিনার সাবেক সরকারি বাসভবনে একটি স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধন করেন। অনুষ্ঠানে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক প্রধান এবং নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসও উপস্থিত ছিলেন।
‘আমাকে হত্যা করলেও ফিরতে হবে’
নয়াদিল্লির অনুষ্ঠানে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে হাসিনা বলেন, ‘তারা আমাকে কারাগারে পাঠাতে পারে, হত্যা করতে পারে। যেকোনো কিছু ঘটতে পারে। কিন্তু তারপরও আমাকে ফিরতে হবে।’
তিনি তার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জাতীয় পুনর্মিলনের’ উদ্যোগ হিসেবে তুলে ধরেন।
তার ভাষ্য, বাংলাদেশের প্রয়োজন সংঘাত নয়, বরং নিরাময় ও সমঝোতা।
হাসিনার এই ঘোষণায় আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়া নেতা-কর্মীদের মধ্যে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছে।
আল–জাজিরা আওয়ামী লীগের পাঁচ নেতার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তাদের মধ্যে তিনজন মন্তব্য করতে রাজি হননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘নেত্রী অবশ্যই ফিরবেন। আমরা সবাই আমাদের আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসব।’
দলটির কর্মী সাজিদুল ইসলাম সবুজ বলেন, ‘আমরা তার ফেরার অপেক্ষায় আছি এবং দল পুনর্গঠনের কাজ করছি।’
জুলাই আন্দোলনের নেতাদের প্রতিক্রিয়া
তবে ২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতারা বলছেন, জবাবদিহি ছাড়া কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সংসদ সদস্য ও সাবেক ছাত্রনেতা আখতার হোসেন বলেন, ‘হাসিনা চাইলে যেকোনো সময় বাংলাদেশে ফিরতে পারেন। তবে তাকে দেশের বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে।’
তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকার সময় সংঘটিত অপরাধের জন্য জবাবদিহি না করলে আওয়ামী লীগের কোনো রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নেই।
আন্দোলনে অংশ নেওয়া অনেকেই হাসিনার ফেরার ঘোষণাকে সন্দেহের চোখে দেখছেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে আহত হওয়া ২৩ বছর বয়সী আতিকুল গাজী বলেন, ‘তিনি এর আগে বলেছিলেন দেশ ছাড়বেন না। কিন্তু তিনি দেশ ছেড়েছেন। তাই শুধু বললেই তিনি ফিরবেন—এটি আমরা বিশ্বাস করি না।’
তিনি বলেন, হাসিনা ফিরুন বা না ফিরুন, সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে তিনি বিচারপ্রক্রিয়ার মুখোমুখি হন।
‘রাজনৈতিক ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত’
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ এবং নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার স্থায়িত্বের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডেভিড বার্গম্যান বলেন, হাসিনা সত্যিই দেশে ফিরতে চান।
তার মতে, দেশে ফিরলে হাসিনার রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা ধরে রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জও তৈরি হতে পারে।
তবে বার্গম্যান বলেন, আওয়ামী লীগ এখনো দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সঠিকভাবে বুঝতে পারছে না।
তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ না দলটি নিজের বর্তমান পতনের জন্য নিজেদের দায় স্বীকার করছে এবং বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নিচ্ছে, ততক্ষণ দলটির নতুন ভূমিকা তৈরি করা কঠিন।’
হাসিনার জন্য এটি অবশ্য প্রথমবারের মতো নির্বাসন থেকে দেশে ফেরার ঘটনা নয়। ১৯৭৫ সালে মুজিবুর রহমানসহ তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্য নিহত হওয়ার পর হাসিনা দীর্ঘদিন দেশের বাইরে ছিলেন। ১৯৮১ সালে তিনি দেশে ফিরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব নেন।
এরপর সামরিক শাসনের সময়ে তিনি একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। ১৯৯৬ সালে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় আসেন এবং পরবর্তী প্রায় তিন দশক বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম প্রধান চরিত্র ছিলেন।
তবে এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। এবার তিনি শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি নন, তার বিরুদ্ধে রয়েছে আদালতের রায়ও।
ওয়েস্টার্ন সিডনি ইউনিভার্সিটির গবেষক ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মুবারাশ হাসান বলেন, হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা মূলত আওয়ামী লীগের হতাশ নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করার রাজনৈতিক কৌশল।
তিনি বলেন, অনেক নেতাকর্মী মনে করেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট হাসিনা দেশ ছাড়ার সময় তাদের অনেককে অন্ধকারে রেখেছিলেন।
তবে এই কৌশল সফল হবে কি না, তা নিয়ে তিনি সন্দেহ প্রকাশ করেন।
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কে নতুন টানাপোড়েন
হাসিনার বক্তব্যের পর ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্কেও নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘বাংলাদেশ ক্ষুব্ধ।’
বিবৃতিতে হাসিনাকে ‘গণহত্যার দায়ে দণ্ডিত’ উল্লেখ করে বলা হয়, বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার আর কোনো স্থান থাকবে না।
বাংলাদেশ সরকার অভিযোগ করেছে, ভারতীয় ভূখণ্ড ব্যবহার করে হাসিনা বাংলাদেশের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি অবমাননা।
এর আগে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছিলেন, ওই অনুষ্ঠানের সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই এবং সেখানে দেওয়া কোনো বক্তব্য ভারত সমর্থন করে না।
ঢাকায় ২০২৪ সালের আন্দোলনে নিহত ১৭ বছর বয়সী শাহরিয়ার খান আনাসের বাবা-মা হাসিনার সাবেক বাসভবনে স্মৃতি জাদুঘর উদ্বোধনের অনুষ্ঠান থেকে ফেরার পর তার দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।
তারা শুধু বলেন, ‘আজ আমাদের কোনো কথা নেই।’
তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া রিসুল ইসলাম রিফাত বলেন, ‘এটি শুধু ফাঁকা বক্তব্য।’
তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও দেশের বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলো একটি বিষয়ে একমত—শেখ হাসিনা। জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ এবং সাধারণ বাংলাদেশিরা তার রাজনীতির প্রত্যাবর্তন মেনে নেবে না।’
এএম
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

