এক সময় উচ্চমূল্য ও ফলনশীল চারার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু এসব বিদেশি চারা এখন সহজেই মিলছে দেশে। প্রযুক্তির কল্যাণে জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, জারবেরা, লিলিয়াম কিংবা অর্কিডের মতো উচ্চমূল্যের ফল ও ফুলের চারা দেশেই সংগ্রহ করা যায়। আমদানিকৃত চারার দাম ছিল বেশি। অনেক ক্ষেত্রে রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও থাকত। সে চিত্র এখন দ্রুত বদলাচ্ছে। আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করে দেশের সরকারি গবেষণাগারেই উৎপাদিত হচ্ছে হাজার হাজার রোগমুক্ত ও উন্নতমানের চারা। একটি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ টিস্যু থেকে তৈরি হচ্ছে একই বৈশিষ্ট্যের অসংখ্য চারা, যা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানোর পাশাপাশি উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের চাষ সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) উদ্যোগে পরিচালিত টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প’ এখন দেশের উদ্যান খাতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। প্রকল্পের আওতায় উৎপাদিত রোগমুক্ত চারা ইতোমধ্যে কৃষক ও উদ্যোক্তাদের হাতে পৌঁছাতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণাধীন নতুন ল্যাবগুলো চালু হলে দেশে মানসম্মত চারার উৎপাদন কয়েকগুণ বাড়বে। এতে শুধু আমদানিনির্ভরতা কমবে না; বরং রপ্তানিযোগ্য মানের ফল, ফুল ও উদ্যান ফসল উৎপাদনেরও নতুন ভিত্তি তৈরি হবে।
বছরে উৎপাদন দুই লাখের বেশি চারা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহে তিনটি সরকারি টিস্যু কালচার ল্যাব কার্যক্রম পরিচালনা করছে। গত এক বছরে এসব ল্যাবে দুই লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি রোগমুক্ত চারা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে এক লাখ ৯২ হাজার ৬৩৭টি চারা কৃষক, নার্সারি মালিক ও কৃষি উদ্যোক্তাদের কাছে বিক্রি করা হয়েছে।
উৎপাদনের দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে মাদারীপুরের ল্যাব, যেখানে এক বছরে উৎপাদিত হয়েছে ৯০ হাজার ২৩৭টি চারা। বগুড়ায় উৎপাদিত হয়েছে ৬২ হাজার ৫০০টি এবং ময়মনসিংহে ৫৯ হাজার ৬৫০টি চারা।
সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে জি-৯ কলা, জারবেরা, স্ট্রবেরি, আলু, এমডি-২ আনারস, অর্কিড, লিলিয়াম ও স্টেভিয়ার চারার। এসব চারার বাজার চাহিদা বাড়তে থাকায় আগামী অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও বৃদ্ধি করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
একটি টিস্যু থেকে হয় হাজারো চারা
সম্প্রতি মাদারীপুরের মোস্তফাপুর হর্টিকালচার সেন্টারের টিস্যু কালচার ল্যাব ঘুরে দেখা যায়, পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে অত্যন্ত জীবাণুমুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। গবেষক ও প্রযুক্তিবিদরা ল্যামিনার এয়ারফ্লোর সামনে বিশেষ সতর্কতার সঙ্গে উদ্ভিদের ক্ষুদ্র টিস্যু এক পাত্র থেকে অন্য পাত্রে স্থানান্তর করছেন।
ল্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিবিদ এনামুল হক জানান, প্রথমে উন্নত ও সুস্থ মাতৃগাছ থেকে শুট টিপ সংগ্রহ করা হয়। এরপর জীবাণুমুক্ত করে বিশেষ পুষ্টিমাধ্যমে স্থাপন করা হয়। নির্দিষ্ট মাত্রার উদ্ভিদ হরমোনের প্রভাবে কোষ বিভাজন শুরু হয়। পরপর কয়েক দফা সাব-কালচার করার মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই হাজার হাজার চারা উৎপাদন সম্ভব হয়।
তিনি বলেন, ল্যাবে উৎপাদিত চারা সরাসরি মাঠে দেওয়া হয় না। প্রথমে পলি হাউস ও হার্ডেনিং জোনে ধাপে ধাপে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া হয়। পর্যাপ্ত শক্ত হওয়ার পরই কৃষকের হাতে দেওয়া হয়।
তার ভাষায়, টিস্যু কালচারে উৎপাদিত প্রতিটি চারা মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে। ভাইরাস ও রোগমুক্ত হওয়ায় এসব চারা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং মাঠে অধিক ফলন দেয়।
আমদানির বিকল্প দেশীয় চারা
এক সময় জারবেরা, লিলিয়াম কিংবা এমডি-২ আনারসের মতো উচ্চমূল্যের চারার জন্য বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যেত।
বর্তমানে সরকারি টিস্যু কালচার ল্যাবেই এসব চারা উৎপাদিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে, ভারত থেকে আমদানি করা একটি জারবেরা চারার দাম যেখানে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সেখানে একই মানের সরকারি ল্যাবে উৎপাদিত চারা পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ টাকার কাছাকাছি।
মাদারীপুর ল্যাবে প্রথমবারের মতো টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে লিলিয়ামের চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। চলতি বছর প্রায় আট হাজার চারা উৎপাদিত হয়েছে। আগামী মৌসুমে এ সংখ্যা ২০ হাজারে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
এছাড়া স্টেভিয়া নিয়েও পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলছে। বিদেশি চারার দাম কয়েকশ টাকা হলেও দেশীয়ভাবে উৎপাদিত চারা অনেক কম দামে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা
প্রকল্পটি কেবল চারা উৎপাদনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, কৃষি প্রযুক্তির উন্নয়ন, মাঠ পর্যায়ে প্রযুক্তি সম্প্রসারণ এবং নতুন কৃষি উদ্যোক্তা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে হাজারো কৃষি উদ্যোক্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকে টিস্যু কালচারের রোগমুক্ত চারা ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে ফুল, ফল ও উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের চাষ শুরু করেছেন। এতে দেশীয় নার্সারি শিল্পও ধীরে ধীরে শক্তিশালী হচ্ছে।
নির্মাণাধীন আরো পাঁচ ল্যাব
বর্তমানে চালু থাকা তিনটি ল্যাবের পাশাপাশি বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালাখ, কুমিল্লা, ভোলার চরফ্যাশন এবং টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে আরো পাঁচটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব নির্মাণাধীন রয়েছে।
এসব ল্যাবে থাকবে আন্তর্জাতিক মানের মিডিয়া প্রস্তুতি কক্ষ, ইনোকুলেশন রুম, কালচার রুম, গ্লাস হাউস, হার্ডেনিং জোন এবং গবেষণা ও প্রশিক্ষণের আধুনিক সুবিধা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের আশা, নতুন ল্যাবগুলো চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসম্মত ও রোগমুক্ত চারার সহজ প্রাপ্যতা নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতাও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে।
উৎপাদনশীলতা বাড়াবে
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আব্দুর রহিম বলেন, আধুনিক কৃষিতে মানসম্মত ও রোগমুক্ত চারা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। টিস্যু কালচার প্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষক শুরু থেকেই সুস্থ ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চারা পাচ্ছেন, যা উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং ফসলের গুণগত মানোন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তিনি বলেন, বর্তমানে তিনটি ল্যাবে সফলভাবে চারা উৎপাদন করা হচ্ছে। নতুন ল্যাবগুলো চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে উন্নতমানের চারার সরবরাহ আরো বাড়বে এবং উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের চাষ সম্প্রসারণ সহজ হবে।
প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, প্রকল্পের মূল লক্ষ্য উন্নতমানের রোগমুক্ত চারা সহজলভ্য করা এবং গবেষণাগারের প্রযুক্তি দ্রুত মাঠ পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া।
তার মতে, এক সময় বিদেশ থেকে চারা আমদানি করতে হলেও এখন সরকারি ল্যাবেই সেগুলো উৎপাদন করা হচ্ছে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমছে, দেশীয় নার্সারি খাত শক্তিশালী হচ্ছে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে।
তিনি জানান, জি-৯ কলার ক্ষেত্রে টিস্যু কালচার চারা ব্যবহার করে প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি লাভের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এমডি-২ আনারস, স্ট্রবেরি, জারবেরা ও লিলিয়ামের মতো উচ্চমূল্যের ফসলের উৎপাদনও বাড়ছে।
আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রযুক্তি
স্বাধীনতা পুরস্কারপ্রাপ্ত কৃষিবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এমএ রহিম বলেন, ভাইরাসমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদনের ক্ষেত্রে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির কার্যকারিতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। যেসব ফসলের দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে বংশবিস্তার করতে হয়, সেসব ক্ষেত্রে এ প্রযুক্তির বিকল্প খুবই সীমিত।
তিনি বলেন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে এ প্রযুক্তির সফল ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশে নির্মাণাধীন ল্যাবগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী উদ্যান খাতের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশের কৃষি এখন শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে নয়; বরং মানসম্মত উপকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও উচ্চমূল্যের ফসল সম্প্রসারণের দিকেও এগোচ্ছে। সে পরিবর্তনের অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে টিস্যু কালচার প্রযুক্তি। রোগমুক্ত ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চারা সহজলভ্য হলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমবে, ফলনের স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং উচ্চমূল্যের ফল, ফুল ও উদ্যান ফসলের বাণিজ্যিক চাষ আরো বিস্তৃত হবে। একই সঙ্গে চারার আমদানি কমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের পাশাপাশি ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী উদ্যান শিল্প গড়ে তোলার পথ আরো সুদৃঢ় হবে।
এমই
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


