হাসিনা সরকারের ফ্যাসিবাদী জামানা শেষ হলেও বর্তমানে সাংবাদিকতার জগতে নানা ক্ষেত্রেই ফ্যাসিবাদ চলমান রয়েছে বলে 'ফ্যাসিবাদের জামানায় শিকারি সাংবাদিকতা' বিষয়ক সেমিনারে মন্তব্য করেছেন বক্তারা। শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আর সি মজুমদার অডিটরিয়ামে প্রেস ইন্সটিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) এই সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।
সেমিনারে মত প্রকাশ করা হয়, গত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের সংবাদ সম্মলনগুলো 'প্রেস কনফারেন্স' থেকে 'প্রেইজ কনফারেন্স'-এ রূপান্তরিত হয়েছিল। এছাড়াও সরকার প্রেস নোটগুলো যেভাবে দিতো সংবাদমাধ্যমগুলো সেভাবে ছাপাতো। জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিবাদের পক্ষ নেওয়ায় পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমের একজন সম্পাদককেও পদত্যাগ করতে দেখা যায়নি।
পিআইবির সহযোগী অধ্যাপক মনিরা শরমিনের সঞ্চালনা ও পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খান, বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) ড. মামুন আহমেদ। সেমিনারে মুল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক আ-আল মামুন।
এতে আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন চিন্তক ও গবেষক ড. সলিমুল্লাহ খান এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম।
মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনাকালে বিভিন্ন ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে অধ্যাপক আ-আল মামুন বলেন, বাংলাদেশে শিকারি সাংবাদিকতা গভীরভাবে দেখা গেছে। ফ্যাসিবাদী সরকার এটিকে নিজের প্রয়োজনে কুক্ষিগত করে রেখেছে। বর্তমানে যদি অর্থনৈতিক কাঠামোর পরিবর্তন না হয় তবে এই অপসাংবাদিকতা পুনরায় সাংবাদিকতার জগতে ফিরে আসবে।
বক্তব্যে ড. সলিমুল্লাহ খান বলেন, সংবাদপত্রের বড় শত্রু হলো রাষ্ট্র। বর্তমানেও নানা কায়দায় ফ্যাসিবাদ চলমান রয়েছে। ফ্যাসিজম আমাদের প্রতিদিনকার জীবনে আছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের মতামতকে উপেক্ষা করে তার উপরে নিজের মত চাপিয়ে দেওয়া, লাঠির জোরে অথবা টাকার জোরে বা অন্য কোনো ভিন্ন উপায়ে - এগুলো ফ্যাসিজমের সাধারণ বৈশিষ্ট্য। বর্তমানে বাংলাদেশের অনেক সাংবাদিক এখনো ফ্যাসিজম বিষয়টি বলতে রাজি না। এর পরিবর্তে তারা চোরতন্ত্র শব্দটি ব্যবহার করে।
তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিবাদের অন্যতম আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো 'এক নেতা এক দেশ।’ বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ শুরু অনুগত সংবাদপত্র তৈরি করেনি, বরং সংবাদপত্রের সম্পাদকদের যারা শিক্ষক -তারাই তো ফ্যাসিবাদের প্রধান রূপকার হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে।
ফ্যাসিবাদ এখনো জীবন্ত আছে উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, পাঠ্যবইয়ে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের গ্রাফিতি থাকবে এবং এটি নিয়ে একপক্ষ অপরপক্ষকে মারছে এর মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে ফ্যাসিবাদ এখনো জীবন্ত আছে। ফ্যাসিবাদ অন্তরিত হয়নি যার প্রমাণ -জুলাইয়ে যারা আন্দোলন করেছে তাদেরকে পিটানো হচ্ছে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাবি উপাচার্য ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, শিকারি সাংবাদিকতা আবার ফেরত এলে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হবে। তাই সাংবাদিকতার এই বিষয়টি আলোচনায় জিইয়ে রাখা দরকার। কারণ রাষ্ট্রের উত্থান ও পতন সাংবাদিকতার সাথে জড়িত। এটাকে ফেরত আসতে দেওয়া যাবে না।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. মামুন আহমেদ বলেন, আমরা বাক স্বাধীনতায় বিশ্বাস করি। বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদীর উত্থান থেকে পতন পর্যন্ত শিকারি সাংবাদিকতা বহমান ছিলো। এই ধারা পরিবর্তনে প্রয়োজন নতুন এক সংস্কৃতি। আইন করে এটি পরিবর্তন করা যাবে না। ফ্যাসিবাদী সাংবাদিকতা আগেকার থেকে কিছুটা পরিবর্তন হলেও খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি৷
আলোচকের বক্তব্যে সহযোগী অধ্যাপক ড. খোরশেদ আলম বলেন, অবৈধভাবে যারা ক্ষমতায় টিকে থাকতে চায় তারা গণমাধ্যমকে কণ্ঠরোধ করে। গত ফ্যাসিস্ট সরকারও একই কাজটি করেছে। গত সরকারের সংবাদ সম্মলনগুলো 'প্রেস কনফারেন্স' থেকে 'প্রেইজ কনফারেন্স'-এ রূপান্তরিত হয়েছিল। এছাড়াও সরকার প্রেস নোটগুলো যেভাবে দিতো সংবাদমাধ্যমগুলো সেভাবে ছাপাতো। জুলাই আন্দোলনে ফ্যাসিবাদের পক্ষ নেওয়ায় পরবর্তী সময়ে সংবাদমাধ্যমের একজন সম্পাদককেও পদত্যাগ করতে দেখা যায়নি।
এমএস
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

