বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে ‘প্রগতিশীলতার’ সাইনবোর্ড ব্যবহার করে দীর্ঘকাল ধরে ভারতীয় ন্যারেটিভ ও ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে আসা ‘বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’ এখন চরম অস্তিত্ব সংকটের মুখে। চলতি বছরের ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবসে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ক্যারিকেচার প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটির ভেতরের দ্বন্দ্ব তীব্র হয়েছে।
চব্বিশের জুলাই বিপ্লবে শত শত শিক্ষার্থী, শিশু ও শ্রমজীবী মানুষকে হত্যার পরও উদীচীর ভেতরে থাকা একদল বামপন্থির ‘হাসিনা-তোষণ’ এবং জনগণের আকাঙ্ক্ষার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় সংগঠনটি এখন খণ্ডবিখণ্ড হয়ে পতনের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
১৯৬৮ সালে সত্যেন সেন ও রণেশ দাশগুপ্তের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত উদীচী শুরু থেকেই প্রগতিশীলতার কথা বললেও অনেকের মতে এটি মূলত বাংলাদেশে ভারতীয় সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের একটি ‘সফট পাওয়ার’ হিসেবে কাজ করে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বিগত ১৬ বছরের আওয়ামী দুঃশাসনে উদীচী কখনোই সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার বা রাষ্ট্রীয় ও দলীয় জুলুমের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেনি। বরং ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ দোহাই দিয়ে তারা এমন এক ধরনের বামপন্থা চর্চা করেছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় মূল্যবোধে আঘাত করে এবং দিল্লির প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ‘ইসলামোফোবিয়া’ বা ইসলামভীতি ছড়াতে সহায়তা করে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শেখ ওমর আমার দেশকে বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকার যখন হাজারো ছাত্র-জনতাকে নির্বিচারে হত্যা করছিল, তখন উদীচীর একটি বড় অংশ রহস্যজনকভাবে নীরব ছিল। এই বামপন্থিরা জুলাই গণহত্যার ভয়াবহতাকে ছোট করে দেখতে চায়। তাদের কাছে হাসিনার ‘সেক্যুলার’ ইমেজটি এতই প্রিয়, হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে আসা পরিবর্তনকেও তারা ‘সাম্প্রদায়িক উত্থান’ হিসেবে চিত্রায়িত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এটি তাদের পক্ষপাতদুষ্ট ও গণবিরোধী চরিত্রের নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
জুলাই গণহত্যা ও বামপন্থিদের ‘সিলেক্টিভ’ মানবতাবাদ
গত ২৫ মার্চ রাতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারসংলগ্ন এলাকায় উদীচীর (মাহমুদ সেলিম-অমিত রঞ্জন দে অংশ) আয়োজিত অনুষ্ঠানে একটি চিত্রপ্রদর্শনী ও পথনাটকের আয়োজন করা হয়। সেখানে ভারতে পলাতক শেখ হাসিনাকে ‘দানবীয়’ রূপে ফুটিয়ে তোলা রাজনৈতিক ক্যারিকেচার প্রদর্শন করা হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময়কার দমনপীড়ন এবং শেখ হাসিনার ১৬ বছরের গুম-খুনের প্রতীকী উপস্থাপন ছিল এ ক্যারিকেচারের মূল উপজীব্য।
এ প্রদর্শনীর পর ‘হাসিনাপন্থি’ তথাকথিত বামপন্থিরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখায়। বামপন্থি সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক নেতা ও সাংবাদিক রহমান মুস্তাফিজ এ ক্যারিকেচারের তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে ফেসবুকে লেখেন, ‘… একসময় এক মিছিলের সাথী ছিলাম... তাদের না থাকুক, আমার তো লজ্জা-শরম আছে!’
পোস্টে শেখ হাসিনার ক্যারিকেচারের প্ল্যাকার্ড বহনকারী উদীচীর এক নেত্রীর ছবি যুক্ত করে দেন তিনি। ওই নেত্রীও একসময় ছাত্র ইউনিয়ন করতেন এবং তার স্বামী কমিউনিস্ট পার্টির শীর্ষ নেতা, যিনি একসময় মেয়র পদে নির্বাচন করে বাজেভাবে হেরেছিলেন। রহমান মুস্তাফিজের পোস্টে বেশ কয়েকজন হাসিনাপন্থি সাংবাদিক, বামপন্থি অ্যাক্টিভিস্ট ও এনজিওকর্মীও ক্যারিকেচারটির সমালোচনা করেন।
হাসিনাপন্থি এসব লোকের ভাষ্য, উদীচীর এ কর্মকাণ্ড ডলারের বিনিময়ে করা একটি ‘দেশবিরোধী চক্রান্ত’, যা জনগণের ম্যান্ডেটহীন একদল ‘ভণ্ড বাম’ দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে এবং এর মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও দেশের স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করার চেষ্টা করা হচ্ছে। মন্তব্যের একটি বড় অংশজুড়ে ছিল চরম ব্যক্তিগত আক্রমণ।
উদীচীর এ ক্যারিকেচার বিতর্ক সংখ্যালঘু বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশকেও ক্ষুব্ধ করেছে। তাদের মতে, উদীচী অতীতে সবসময় সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু বর্তমানে শেখ হাসিনার ‘জুলুম’ তুলে ধরতে গিয়ে যেভাবে তাকে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা তাদের কাছে ‘একপাক্ষিক’ মনে হচ্ছে। প্রাবন্ধিক ও ছড়াকার অজয় দাশগুপ্ত তার ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, ‘… হায়রে সোনার উদীচী!’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উদীচীর সমর্থকদের কাদা ছোড়াছুড়ির পরিপ্রেক্ষিতে সংগঠনটি নিজেদের ভেরিফায়েড পেজে এর ব্যাখ্যা দিয়েছে। এতে বলা হয়, ২৫ মার্চের বিতর্কিত কর্মসূচির দায় পুরো সংগঠনের নয়; বরং এটি উদীচীর নাম ব্যবহারকারী একটি ‘বিচ্যুত’ বা ‘অপভ্রংশ’ অংশের কাজ। সংগঠনটি মনে করে, ১৯৭১ সালের সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় গণহত্যাকে অন্য যেকোনো সময়ের রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে একই সমান্তরালে বা সরলরেখায় বিচার করা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং এটি ইতিহাস বিকৃতির শামিল।
এ ব্যাপারে উদীচীর সাধারণ সম্পাদক (একাংশ) জামসেদ আনোয়ার তপন বলেন, এটা আমরা গত বছরও করেছি, এ বছরও করেছি। এ বছর আমরা যে দেশে দেশে কালে কালে যে হত্যাকারীরা ছিল, তাদের মধ্যে ছয়জনের ছবি এখানে প্রদর্শনে করেছি। ... এখন ফেসবুক বা অন্যান্য জায়গায় যারা আমাদের গালাগালি করছে, তাদের আপত্তিটা শুধু ওই জায়গায়, শুধু শেখ হাসিনার জায়গায়। শেখ হাসিনার ছবি যদি না থাকত, তাহলে তারা এভাবে গালাগালি করত না। এখন শেখ হাসিনাকে যারা গণহত্যাকারী হিসেবে মানতে চায় না এবং ফ্যাসিবাদী বলে মনে করে না, তারাই গালাগালি করছে, পরিষ্কার।
উদীচীর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিমকে এ ব্যাপারে জানতে ফোন করা হলে সাড়া মেলেনি। হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা দিলেও তিনি জবাব দেননি।
উদীচী ও ইসলামোফোবিয়া, একটি পুরোনো কৌশল
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, উদীচীর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের অভিযোগÑতারা প্রগতির নামে সুকৌশলে ইসলামোফোবিয়া ছড়িয়ে আসছে। তাদের নাটক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রায়শই দাড়ি-টুপিধারী চরিত্রগুলোকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয়, যা ভারতীয় উগ্রবাদী ন্যারেটিভের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। বর্তমান ক্যারিকেচার বিতর্কেও তারা হিন্দু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তাহীনতার দোহাই দিয়ে মূলত সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠীর গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে ‘মৌলবাদ’ হিসেবে দাগিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এই ‘ইসলামোফোবিক’ অবস্থানই এখন সাধারণ মানুষের কাছে উদীচীকে একটি ‘বিজাতীয় সংস্থা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
ভারতপন্থি উইং ও ২৩তম সম্মেলনের পচন
উদীচীর বর্তমান এ অস্থিরতার মূলে রয়েছে ভারতের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার লড়াই। ২০২৫ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত সংগঠনের ২৩তম জাতীয় সম্মেলনে নতুন কমিটি গঠন নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে নজিরবিহীন হট্টগোল ও মারামারি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন নিয়ে দুপক্ষের অনড় অবস্থানের কারণে সম্মেলন পণ্ড হয়ে যায়। পরে মাহমুদ সেলিমকে ভারপ্রাপ্ত সভাপতি এবং অমিত রঞ্জন দেকে সাধারণ সম্পাদক করে একটি অংশ কার্যক্রম শুরু করে। পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে অন্য পক্ষ হাবিবুল আলমকে সভাপতি এবং জামসেদ আনোয়ার তপনকে সাধারণ সম্পাদক ঘোষণা করে পৃথক কমিটি গঠন করে।
বিভক্ত উদীচীর হাবিবুল আলম-জামসেদ আনোয়ার তপন অংশটি এখনো পুরোনো আমলের ‘ভারত-তোষণ’ নীতিতে অনড়। তাদের মতে, ক্যারিকেচার প্রদর্শনীর মাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা’ প্রচার করা উদীচীর সংস্কৃতি নয়। অন্যদিকে মাহমুদ সেলিম-অমিত রঞ্জন দে অংশটি জুলাই অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে একাত্ম হওয়ার দাবি জানালেও সংগঠনের ভেতরে কোন্দল থামেনি।
চলতি বছরের ২৮ মার্চ উদীচীর প্রতিষ্ঠাতা সত্যেন সেনের ১১৯তম জন্মবার্ষিকী পালনের মধ্য দিয়ে এ বিভক্তি চূড়ান্ত রূপ নেয়। জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে মাহমুদ সেলিম ও অমিত রঞ্জন দের নেতৃত্বাধীন অংশটি সমাবেশ করে। একই সময় প্রেস ক্লাবের উল্টো দিকে সচিবালয় মেট্রোরেল স্টেশনের নিচে পৃথক কর্মসূচি পালন করে হাবিবুল আলম ও জামসেদ আনোয়ার তপন নেতৃত্বাধীন অংশটি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতের ‘সাংস্কৃতিক উইং’ হিসেবে পরিচিত সংগঠনটি এখন নিজের ভারেই ভেঙে পড়ছে। জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, বাংলাদেশের মানুষ আর কোনো ‘আমদানি করা’ সংস্কৃতি বা ইসলামোফোবিক রাজনীতি গ্রহণ করবে না। উদীচীর বর্তমান এ ভাঙন মূলত তাদের দীর্ঘদিনের ভণ্ডামিরই অনিবার্য পরিণতি।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

