হাসিনা প্রাধান্য নীতিতে ভারতের প্রতি ক্ষুব্ধ বিএনপি

হাসিনা প্রাধান্য নীতিতে ভারতের প্রতি ক্ষুব্ধ বিএনপি
ঢাকার রাজপথে হাসিনা-বিরোধী গ্রাফিতি, ২০২৬ সালের জুন মাসের ছবি।

বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী হাসিনাকে নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়ায় ভারত সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘হাসিনাকে ভারত সরকার গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ কেন দিল—এটি আমাদের প্রশ্ন।’

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে হাসিনা ভারতে অবস্থান করছেন। বিষয়টি উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে। কিন্তু সেখানে আশ্রয়ে থেকে হাসিনা বাংলাদেশকে নিয়ে রাজনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন। তাকে সরাসরি গণমাধ্যমে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’

তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফাঁসির দণ্ড নিয়ে ভারতে থাকা হাসিনাকে ভারত সরকার কেন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালানোর সুযোগ দিল?’

গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পূর্তির দিনে নয়াদিল্লিতে দক্ষিণ এশিয়া ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে অডিও সংযোগের মাধ্যমে যুক্ত হন হাসিনা। সেখানে তিনি বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন।

এই ঘটনায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে। বিএনপি নেতাদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দলটির কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন।

জুলাই হত্যাকাণ্ড নিয়ে ক্ষমা না চাওয়ার অভিযোগ

নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকেরা হাসিনাকে প্রশ্ন করেছিলেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করবেন কি না বা ক্ষমা চাইবেন কি না। তবে তিনি ওই প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেননি।

ওই সংবাদ সম্মেলনে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এক পক্ষকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছে।

তার দাবি, এক পক্ষ দায়মুক্তি পেলে অন্য পক্ষেরও সেই অধিকার থাকা উচিত।

তবে দুই বছর আগে গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ নেতাদের কোনো অনুশোচনা না থাকায় দেশে সক্রিয় রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে তারা (আওয়ামী লীগ সরকার) গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু তারা এখন পর্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। এমনকি তাদের কোনো অনুশোচনাও নেই।’

তিনি আরো বলেন, ‘বরং তারা ভারতে আশ্রয় নিয়ে বাংলাদেশের মানুষের বিরুদ্ধে তৎপরতা চালাচ্ছে। জনগণ তাদের প্রতি ক্ষুব্ধ।’

আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে অবস্থান

হাসিনা সরকারের পতনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার অধ্যাদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করা হয়।

পরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করে। নতুন সরকার সন্ত্রাসবিরোধী আইনের সংশোধনী প্রস্তাব সংসদে পাস করে। এর ফলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকে।

নয়াদিল্লির সংবাদ সম্মেলনে হাসিনা আওয়ামী লীগের ওপর থেকে এই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি জানান।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের তদন্ত চলছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বিষয়ে বিচার হবে। সংশ্লিষ্ট আইনে সেই বিধান যুক্ত করা হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি নির্বাহী আদেশে কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে চায় না। কিন্তু আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিয়ে সিদ্ধান্ত আদালতের বিষয়। তারা তো আদালতে যায়নি। আদালত থেকেই যে সিদ্ধান্ত আসবে, সেভাবেই সরকার কাজ করবে।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘জনগণও বিচার করবে। জুলাই আন্দোলনে তারা গণহত্যা চালিয়েছে। দীর্ঘ শাসনামলে বিরোধী দল ও মতের মানুষের ওপর দমন-পীড়ন, গুম ও হত্যার অভিযোগ রয়েছে। ফলে তাদের প্রতি জনগণের কোনো আস্থা নেই।’

সংবাদ সম্মেলনের আগে ঢাকার উদ্বেগ

নয়াদিল্লিতে হাসিনা সংবাদ সম্মেলনে ভার্চ্যুয়ালি যুক্ত হতে পারেন—এমন খবর প্রকাশের পরই বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে উদ্বেগ জানানো হয়।

গত সোমবার ঢাকায় ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। ওই বৈঠকে হাসিনা যাতে দিল্লিতে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে না পারেন, সে বিষয়ে ভারত সরকারের সহযোগিতা চাওয়া হয়।

একই দিনে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ভারত সরকারকে এ বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করার আহ্বান জানান।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সভাপতিকে ঘিরে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

এরপর মঙ্গলবার আদালতের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে বাংলাদেশের সরকারের পক্ষ থেকে তথ্য বিবরণীতে হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে প্রচার না করার অনুরোধ জানানো হয়।

প্রধানমন্ত্রীর তথ্যবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলেন।

ভারতের বক্তব্য ও বিএনপির প্রতিক্রিয়া

হাসিনার সংবাদ সম্মেলন নিয়ে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এটি বেসরকারিভাবে আয়োজন করা হয়েছে। এর সঙ্গে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। সেখানে দেওয়া বক্তব্য ভারত সরকার সমর্থনও করে না।

তবে বাংলাদেশের সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে আপত্তি জানানোর পরও নয়াদিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে হাসিনা সরাসরি বক্তব্য দেন এবং সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেন।

বিএনপি সরকারের একাধিক সূত্র বলছে, ভারত সরকারের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যাই দেওয়া হোক না কেন, তাদের সমর্থন ছাড়া নয়াদিল্লিতে এ ধরনের সংবাদ সম্মেলন আয়োজন সম্ভব নয় বলে তারা মনে করে।

এই কারণেই বিএনপি সরকার এবং দলটির শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের পক্ষ থেকে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।

এএম

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন