প্লেজিয়ারিজম (মেধাস্বত্ব চুরি) নিয়ে অভিযোগ ওঠার পর সমালোচনার মুখে পদত্যাগ করেছেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জেসন আর্ডে। মর্যাদাপূর্ণ এই ব্রিটিশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি তার বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগের তদন্ত শুরু করার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই তিনি এই সিদ্ধান্ত নেন।
লন্ডন থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
জেসন আর্ডে ২০২৩ সালে কেমব্রিজের সর্বকনিষ্ঠ কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক হিসেবে নিযুক্ত হয়ে সংবাদ শিরোনামে এসেছিলেন। সম্প্রতি তার পিএইচডি থিসিসের কিছু অংশে মেধাস্বত্ব চুরির অভিযোগের মুখোমুখি হন তিনি। তার একাডেমিক যোগ্যতার কিছু বিষয়ের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
তবে আর্ডে এবং তার সমর্থকরা দাবি করেছেন, এই চুলচেরা বিশ্লেষণের পেছনে বর্ণবাদী উদ্দেশ্য রয়েছে।
অনলাইনে পোস্ট করা এক চিঠিতে আর্ডে উল্লেখ করেন, এই কঠিন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র উপায় ছিল পদত্যাগ করা। তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, তার এই সিদ্ধান্তকে যেন তাকে ঘিরে তৈরি হওয়া অপবাদের স্বীকৃতি হিসেবে ভুল করা না হয়।
তিনি লেখেন, "এটি এমন একজন মানুষের সিদ্ধান্ত, যিনি এতটাই কষ্ট সহ্য করেছেন যে, এর বেশি সহ্য করা কোনো মানুষের কাছ থেকে আর প্রত্যাশা করা যায় না।"
আর্ডে জানান, তিনি কেমব্রিজের 'সোসিওলজি অব এডুকেশন'-এর অধ্যাপক এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের জেসাস কলেজের ফেলো পদ থেকে পদত্যাগ করছেন।
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ঘোষণা করে, তারা অধ্যাপক আর্ডের একাডেমিক যোগ্যতা এবং সম্মানসূচক নিয়োগের বিষয়ে নতুন কিছু তথ্যের ভিত্তিতে একটি তদন্ত শুরু করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়টি আরও জানায়, এর বাইরেও একাডেমিক অসদাচরণ নিয়ে বেশ কিছু চলমান অভিযোগ রয়েছে, যা আমাদের গবেষণা নীতি অনুযায়ী খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এর আগে গত জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আর্ডের পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিল। তখন তারা একে তার ‘ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার একটি জঘন্য প্রচারণা’ বলে আখ্যা দিয়েছিল। একই সাথে তারা দাবি করেছিল, তার থিসিস এবং জার্নাল প্রকাশনা সম্পর্কিত চুরির অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং জার্নাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত করে খারিজ করে দিয়েছে।
তবে, নতুন কী তথ্যের ভিত্তিতে এই তদন্ত শুরু করা হয়েছে, তা বুধবার সুনির্দিষ্টভাবে জানায়নি বিশ্ববিদ্যালয়টি। অন্যদিকে জেসাস কলেজ আলাদাভাবে জানিয়েছে যে, তারাও নিজস্ব তদন্ত শুরু করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের গবেষক এবং নিজেকে ‘রেস রিয়ালিস্ট’ হিসেবে দাবি করা নাথান কফনাস অভিযোগ করেছেন, আর্ডের পিএইচডি থিসিসের একাধিক অংশ অন্যান্য কাজ থেকে হুবহু নকল করা হয়েছে।
বর্ণবাদের অভিযোগে ২০২৪ সালে কেমব্রিজের সাথে কফনাসের গবেষণামূলক সম্পৃক্ততার অবসান ঘটেছিল। আর্ডের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে করা কিছু দাবিও এখন বিতর্কের মুখে পড়েছে। এর মধ্যে রয়েছে তিনি একসময় ৩৫ দিনে ৩০টি ম্যারাথন দৌড়েছিলেন এবং দাতব্য সংস্থার জন্য লাখ লাখ টাকা তহবিল সংগ্রহ করেছিলেন।
গত শনিবার ‘দ্য টাইমস’ পত্রিকাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আর্ডে স্বীকার করেছেন, একাডেমিক ক্ষেত্রে কিছু ‘ভুল’ হয়েছিল। তবে তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘তাকে ভুলভাবে একজন মিথ্যাবাদী, কাল্পনিক চরিত্র ও একাডেমিক প্রতারক হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে।’
তিনি আরও অভিযোগ করেন, তাকে তার পদ থেকে সরানোর এই প্রচারণা আসলে ‘বর্ণবাদ দ্বারা অনুপ্রাণিত’।
ডানপন্থী সংবাদপত্র এবং সমালোচকরা এই কেলেঙ্কারির ঘটনায় সরব হয়েছেন। তারা আর্ডেকে বৈচিত্র্য, সমতা ও অন্তর্ভুক্তি (ডিইআই) নীতির ‘পোস্টার বয়’ বা প্রতীক হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তাকে সমর্থন জানিয়ে এবং প্রভাবশালী পদে থাকা কৃষ্ণাঙ্গদের অবমূল্যায়ন করার চেষ্টার অভিযোগ তুলে একটি খোলা চিঠিতে ১৫ হাজারেরও বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে বিশিষ্ট কৃষ্ণাঙ্গ শিক্ষাবিদ এবং কেমব্রিজের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ রয়েছেন।
এর আগে বুধবার প্রকাশনা সংস্থা 'সাইমন অ্যান্ড শুস্টার' জানায়, তারা তার জীবনকাহিনী প্রকাশ করতে পেরে ‘গর্বিত’। চলতি মাসেই তাদের যুক্তরাজ্য শাখা থেকে আর্ডের স্মৃতিকথা ‘গ্রেট অ্যান্ড আনফরচুনেট থিংস’ প্রকাশিত হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রকাশনা সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, এই স্মৃতিকথার বিষয়ে প্লেজিয়ারিজমের (মেধাস্বত্ব চুরি) কোনো অভিযোগ ওঠেনি।
অটিজমে আক্রান্ত আর্ডে জানান, ৩৭ বছর বয়সে কেমব্রিজের অধ্যাপক হওয়ার আগে ১১ বছর বয়স পর্যন্ত তিনি কথা বলতে পারতেন না এবং ১৮ বছর বয়সে এসে পড়তে ও লিখতে শেখেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘এটাই আমার কাজের শেষ নয়। এখন আমার ‘সুস্থ হয়ে ওঠার এবং নিজের মাঝে ফিরে আসার জন্য সময় প্রয়োজন।’
আর্ডে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, ‘আমি আবারও ফিরে আসব।’
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


