জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর নিত্যপণ্যের বাজারে। ইতোমধ্যে পণ্যসামগ্রীর দামে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে বাজার অস্থির হয়ে উঠেছে। এ নিয়ে মানুষের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও উদ্বেগ বিরাজ করছে। এছাড়া মানুষের আর্থিক অবস্থা মোটেও ভালো নয়, বেচাকেনা কম। ব্যবসায় এক ধরনের মন্দাভাব চলছে। তবে ক্রেতারা বলছেন, গত সপ্তাহে জ্বালানির দাম বাড়ানোর পর থেকে সব পণ্যের দামই ঊর্ধ্বমুখী। দামের এ ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতায় নিম্ন ও মধ্যবিত্তের নাভিশ্বাস উঠেছে।
গতকাল শনিবার কারওয়ান বাজার, বাবুবাজার, নয়াবাজার, হাতিরপুলসহ কয়েকটি বাজার ঘুরে ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। এতে নিত্যপণ্যের দামে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এখনো ব্যাপকহারে প্রভাব না পড়লেও কিছুদিন পর থেকে এ প্রভাব আরো বেশি পড়তে পারে।
কারওয়ান বাজারের মুদি ব্যবসায়ী বাবুল মিয়া আমার দেশকে বলেন, কয়েক দিন ধরে ব্যবসায় ব্যাপক মন্দাভাব বিরাজ করছে। আগে যেখানে লাখ টাকার মতো বেচাবিক্রি হতো, এখন সারা দিনে ২০ হাজার টাকাও বিক্রি হচ্ছে না। দোকানে ক্রেতার আনাগোনা কমে গেছে।
সপ্তাহের ব্যবধানে বেড়েছে ডিম, মাছ, ভোজ্যতেলসহ অনেক পণ্যের দাম। মাঝে কয়েক দিন সবজির সরবরাহ কিছুটা বেড়ে দাম নিম্নমুখী হলেও এখন আবার বাড়ছে। এছাড়া অন্যান্য নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
মুদি ব্যবসায়ী মায়ের দোয়া স্টোরের ইমাম উদ্দীন বাবলু আমার দেশকে বলেন, অনেক কোম্পানিই পণ্য সরবরাহ করেনি। তেলের দাম বৃদ্ধির ফলে দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। জ্বালানি তেলের সংকটের কারণে এরই মধ্যে অনেক নিত্যপণ্যের দাম বেড়ে গেছে, দাম আরো বাড়বে । এছাড়া আমদানিনির্ভর মসলা, প্যাকেটজাত দুধ, চা, টিস্যু, চিনি, পোলাও চাল ও মসুর ডালের দাম বেড়েছে।
এদিকে, ব্রয়লার মুরগির দাম খুব বেশি না বাড়লেও দেশি ও সোনালি মুরগি বাড়তি দামে বিক্রি হচ্ছে। কাঁচাবাজারে ঢ্যাঁড়শ এবং আলু ছাড়া সব সবজির দাম বেশি। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবে দাম বাড়ছে বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা।
গতকাল বিকালে স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ধানমন্ডি এলাকা থেকে কারওয়ান বাজারে কেনাকাটা করতে আসেন সরকারি কর্মচারী রিপন মিয়া। তিনি ৭০ টাকায় একটি ছোট আকারের লাউ কেনেন। এছাড়া সোনালি মুরগি ৩৮০ টাকা এবং লেয়ার মুরগি ৩৪০ টাকা কেজি দরে কেনেন। এ সময় তিনি বলেন, সব জিনিসের দামই তো বাড়তির দিকে। মনে হচ্ছে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে। তিনি আরো জানান, কারওয়ান বাজারের চেয়ে ধানমন্ডি এলাকায় মুরগির দাম আরো ৬০-৭০ টাকা বেশি। সবজি কেজিতে ২০-৩০ টাকা বাড়তি দামে বিক্রি হয়।
বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, আলু ও ঢ্যাঁড়শ ছাড়া বর্তমানে বেশিরভাগ সবজিই বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকার বেশি দামে। গতকাল কাকরোল ১০০ থেকে ১৩০ টাকা, করলা ৮০ থেকে ১০০, বেগুন ৮০ থেকে ১০০, শজিনা ১২০ থেকে ১৪০, পটোল ৭০ থেকে ৮০, শিম ৮০, ঢ্যাঁড়শ ৪০-৫০, টমেটো ৪৫-৫০, গাজর ৪০-৫০, মিষ্টিকুমড়া ৪০-৪৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে।
তবে আলুর দাম কিছুটা কমে ১৮-২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। শাকের দাম প্রতি আঁটি ২০ থেকে ৪০ টাকা। লাউ বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকায়। এভাবে সব ধরনের সবজি এখন বাড়তি দামেই বিক্রি হচ্ছে।
তবে গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি, উত্তরাসহ অভিজাত এলাকার বাজারে আরো বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পাড়া-মহল্লার দোকানেও বাড়তি দামে পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
মাসখানেক আগে ৩০০ থেকে ৩২০ টাকায় বিক্রি হওয়া সোনালি মুরগি মানভেদে ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। হাইব্রিড সোনালি বিক্রি হচ্ছে ৩০০ থেকে ৩৪০ টাকায়। ২৮০ টাকার লেয়ার মুরগি গতকাল বিক্রি হয় ৩৪০ টাকায়। ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগি বাড়তি দামেই ৭০০ থেকে ৭৫০ টাকায় বিক্রি করতে দেখা গেছে। গরুর ও খাসির গোশতের দাম স্থিতিশীল রয়েছে।
কারওয়ান বাজারের শ্রীপুর ব্রয়লার হাউসের সেলিম বলেন, সরবরাহ কম হওয়ায় সোনালি মুরগির দাম বেড়েছে। তবে গত সপ্তাহের তুলনায় ২০-৩০ টাকা কমলেও কিছুদিন আগের তুলনায় ৮০ থেকে ১০০ টাকা বেড়েছে। দাম আরো বাড়তে পারে।
এদিকে, সবজির পাশাপাশি মাছ ও ডিমের দামও বেড়েছে। কয়েক দিনের ব্যবধানে ডিমের ডজনে বেড়েছে ২০ থেকে ৪০ টাকা পর্যন্ত। গতকাল মুরগির ডিমের ডজন বিক্রি হয় ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়। তবে পাড়া-মহল্লার দোকানে ১৪০ থেকে ১৪৫ টাকা ডজন বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মাছ বিক্রেতা সামিউল বলেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে সব ধরনের মাছ কেজিতে ৪০-৫০ টাকা বাড়তি দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে, ভোজ্যতেলের বাজারে অস্থিরতা এখনো কাটেনি। বোতলজাত সয়াবিন তেল গায়ের দামেই বিক্রি হচ্ছে। খোলা সয়াবিন তেলের দাম লিটারপ্রতি ১০ টাকা বেড়ে ১৯৫ থেকে ২০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই ভাবে খোলা পাম তেলের দামও লিটারপ্রতি প্রায় ১০ টাকা বেড়ে হয়েছে ১৮৪ থেকে ১৮৫ টাকা।
চাঁদপুর রাইস এজেন্সির স্বত্বাধিকারী বাচ্চু মিয়া বলেন, নতুন চাল বাজারে আসায় চালের দাম না বাড়লেও ৩০০ বস্তা চালে চার হাজার টাকা পর্যন্ত ট্রাক ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।
জনতা রাইস এজেন্সির রাসেল মিয়া বলেন, আমাদের চাল আসে নওগাঁ থেকে। ট্রাকপ্রতি ভাড়া বেড়েছে পাঁচ-ছয় হাজার টাকা। যদিও এখনো চালের দাম বাড়েনি, কিছুদিন পর প্রভাব পড়বে।
সিদ্ধ চালের দাম স্থিতিশীল থাকলেও পোলাও চালের দাম বেড়েছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্যাকেটজাত পোলাও চালের কেজিতে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়ে এখন ১৮০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা পোলাও চালও কেজিতে পাঁচ থেকে ১০ টাকা বেড়ে ১৪৫ থেকে ১৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে কেজিতে পাঁচ টাকা বেড়ে খোলা চিনি ১০০ থেকে ১০৫ টাকা আর প্যাকেট চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ টাকায়।
নিত্যপণ্যের পাশাপাশি রান্নার গ্যাস সিলিন্ডারের দামও বেড়েছে। সরকার দুদফায় প্রায় ৬০০ টাকার মতো বাড়িয়ে এক হাজার ৯৪০ টাকা নির্ধারিণ করলেও কোথাও এ দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

