কওমি মাদরাসায় শিশু নির্যাতন ও অনিয়মে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির দাবি

কওমি মাদরাসায় শিশু নির্যাতন ও অনিয়মে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির দাবি

কওমি মাদরাসা ও দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা, শিশু নির্যাতন ও অনিয়ম প্রতিরোধ এবং সমকালীন আদর্শিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন আলেম-উলামারা। এসব প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে স্বাধীন তদন্ত সেল গঠন, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু, শিশু সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন, শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা যাচাই এবং প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন

রোববার দুপুর ২টায় রাজধানীর রমনায় ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনের সেমিনার কক্ষে ইসলামী আইন সংরক্ষণ পরিষদের উদ্যোগে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। ‘কওমি মাদরাসাবিরোধী অপপ্রচার প্রতিরোধ, দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের সুরক্ষা এবং সমকালীন আদর্শিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উলামায়ে কেরামের ভূমিকা’ শীর্ষক সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি মুফতী বশিরুল্লাহ। প্রধান অতিথি ছিলেন মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মাওলানা মুহিউদ্দীন রাব্বানী বলেন, ওলামায়ে কেরাম জাতির আস্থার জায়গা। তাঁদের মূল দায়িত্ব জাতির ঈমান-আকিদা সংরক্ষণ এবং ইসলামী আদর্শ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তবে কওমি মাদরাসা ও দ্বীনি শিক্ষার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অপপ্রচারের মোকাবিলায় আলেম-উলামাদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি মাদরাসার পবিত্রতা রক্ষায় শিশু নির্যাতনসহ যেকোনো অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে।

আলোচনা সভায় সংগঠনের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম কাসেমী ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে কওমি মাদরাসা ও দ্বীনি শিক্ষার বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অপপ্রচারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়। ঘোষণাপত্রে বলা হয়, বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো শিক্ষাব্যবস্থা বা ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই।

মাদরাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা, নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঘোষণাপত্র থেকে ছয় দফা প্রস্তাব পেশ করা হয়—

১. স্বাধীন তদন্ত সেল গঠন: আল-হাইআতুল উলয়া ও বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কওমি মাদরাসার বোর্ডগুলোর অধীনে অভিজ্ঞ আলেম ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে স্বাধীন তদন্ত সেল গঠন করতে হবে এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।

২. ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু: ভুক্তভোগীদের পরিচয় গোপন রেখে অভিযোগ জানানোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু এবং তাদের আইনি ও মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।

৩. শিশু সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের আবাসনব্যবস্থা নিরাপদ করা, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুদের সুরক্ষায় সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন এবং সার্বক্ষণিক সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করতে হবে।

৪. শিক্ষক নিয়োগে যোগ্যতা যাচাই: শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে নৈতিক চরিত্র, পেশাগত দক্ষতা ও শিশু মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে প্রয়োজনীয় জ্ঞানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।

৫. বালিকা মাদরাসার নিরাপত্তা: বালিকা মাদরাসায় নারী প্রশাসকদের অগ্রাধিকার এবং বহিরাগতদের প্রবেশের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

৬. নিবন্ধন ও জবাবদিহি নিশ্চিত: অপরিকল্পিত ও অনিয়ন্ত্রিত মাদরাসাগুলোকে জাতীয় শিক্ষা বোর্ডের নিবন্ধন এবং জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

ঘোষণাপত্রে আরও বলা হয়, জন্মগত শারীরিক ভিন্নতা (ইন্টারসেক্স/হিজড়া) এবং ‘ট্রান্সজেন্ডার’ ধারণার মধ্যে পার্থক্য স্পষ্টভাবে অনুধাবন করা জরুরি। ইন্টারসেক্স বা হিজড়া জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা মানবিক দায়িত্ব। তবে ইসলামী মূল্যবোধ ও ধর্মীয় পারিবারিক কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো মতবাদ জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে আলেম ও আইনজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি গবেষণা কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

সভায় মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং যেকোনো অনিয়ম ও অপরাধের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণের জোর আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি গণমাধ্যমকে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা বজায় রাখা এবং সরকারকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও আলেম-উলামাদের বিরুদ্ধে অহেতুক হয়রানি বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

সভাপতির বক্তব্যে মুফতী বশিরুল্লাহ বলেন, বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তির অপরাধের দায় পুরো কওমি শিক্ষাব্যবস্থা বা দ্বীনি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যেমন অন্যায়, তেমনি প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ অনিয়ম কিংবা শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। মাদরাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের পবিত্রতা রক্ষায় আমরা স্বাধীন তদন্ত সেল গঠন, ২৪ ঘণ্টার হটলাইন চালু, সুরক্ষা নীতি বাস্তবায়ন, সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণের জোর দাবি জানাচ্ছি। একই সঙ্গে জন্মগতভাবে ভিন্ন শারীরিক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হিজড়া জনগোষ্ঠীর অধিকার ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার পাশাপাশি ইসলামী মূল্যবোধের পরিপন্থী যেকোনো ভিনদেশি মতবাদ চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা প্রতিরোধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

আলোচনা সভায় সংগঠনের নির্বাহী সভাপতি মুফতী আব্দুল্লাহ ইয়াহইয়া স্বাগত বক্তব্য রাখেন। সংগঠনের সহসভাপতি মুফতী মাহফুজুর রহমান ও সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা আফসার মাহমুদের সঞ্চালনায় সভায় আরও বক্তব্য রাখেন—মুফতী মিজানুর রহমান সাঈদ, মাওলানা যায়নুল আবেদীন, মাওলানা আতাউল্লাহ আমীন, মুফতী কিফায়াতুল্লাহ আজহারী, মুফতী জাবের হুসাইন কাসেমী, মাওলানা মুজিবুর রহমান হামিদী, মাওলানা মুস্তাকীম বিল্লাহ হামিদী, মাওলানা ইয়াসিন আরাফাত, মুফতী মাহমুদুর রহমান, মুফতী শামসুল আলম, মুফতী ওয়াজেদ আলী, মুফতী হুসাইন মুহাম্মদ সোহরাব, মুফতী জুনাঈদ আইয়ূবী, মুফতী তানভীর আহমদ সিদ্দিকী, মুফতী আনোয়ারুল হক, মুফতী হামীদুল হক, মাওলানা আব্দুল্লাহ ফিরুজ, মুফতী জুবায়ের রশীদ, মাওলানা আ. ফ. ম. আকরান হুসাইন, মুফতী আনিসুর রহমান, মুফতী সুলতান আহমাদ জাফরী, মুফতী আঞ্জুম হাসান, মাওলানা আব্দুল্লাহ আল মাসঊদ খান, মাওলানা এহতেশেমুল হক সাখী, মাওলানা সানাউল্লাহ, মাওলানা আবু রাহাত কামাল ও মুফতী যুবাইর আহমাদ ভৈরবীসহ দেশের বিশিষ্ট আলেম-উলামারা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন