রাজধানীর নিউমার্কেট থানাধীন শাহ নেওয়াজ ছাত্রবাসের বটতলা এলাকায় দুর্বৃত্তদের গুলিতে শীর্ষ সন্ত্রাসী খন্দকার নঈম আহমেদ টিটন (৫৮) নিহত হয়েছেন। মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে এক দুর্বৃত্ত খুব কাছ থেকে তার মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ৫ থেকে ৬টি গুলি করে একটি মোটরসাইকেলে করে পালিয়ে যায়।
আহত অবস্থায় পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক রাত ৮টা ২৭ মিনিটে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, টিটন তালিকাভুক্ত ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর অন্যতম। ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে কারাগার থেকে টিটন মুক্তি পান। মুক্তি পাওয়ার পর টিটন আবার আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় হন এবং নিউমার্কেট ও হাজারীবাগ এলাকায় চাঁদাবাজিতে লিপ্ত হন। এ ঘটনায় কাউকে আটক করতে পারেনি পুলিশ। তবে দুর্বৃত্তদের ধরতে পুলিশ মঙ্গলবার রাতেই ঢাকাসহ আশপাশের জেলায় সাঁড়াশি অভিযান শুরু করেছে।
শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) রমনা বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার মাসুদ আলম।
ঘটনাস্থলের প্রত্যক্ষদর্শী রতন নামের এক কিশোর বলেন, “টিটন দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিলেন। পেছন দিক থেকে মাস্ক পরিহিত এক যুবক প্রথমে তাকে লক্ষ্য করে দুটি গুলি ছোড়ে। পরে আবার দৌড়ে তার কাছে গিয়ে আরও দুটি গুলি করে। এতে তিনি পড়ে যান। এরপর তার সামনে গিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে। লোকজন চিৎকার দিলে ওই দুর্বৃত্ত আরেকটি ফাঁকা গুলি করে দৌড়ে গিয়ে একটি মোটরসাইকেলের পেছনে বসে পালিয়ে যায়। পরে আশপাশের লোকজনের সহযোগিতায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসি।”
পুলিশ জানায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমনের শ্যালক। ইমন কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বিদেশে পালিয়েছেন এবং সেখান থেকেই আন্ডারওয়ার্ল্ড নিয়ন্ত্রণ করছেন। টিটন মূলত ঢাকার রায়েরবাজার ও হাজারীবাগ এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি শীর্ষ সন্ত্রাসী সানজিদুল ইসলাম ইমনের শ্যালক (ইমন টিটনের ছোট বোন নীলাকে বিয়ে করেছেন)। মূলত ইমনের দাপটেই তিনি অপরাধ জগতে প্রভাব বিস্তার করেছিলেন। দুই যুগ কারাবন্দী থাকার পর ২০২৩ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তিনি জামিন পান, কিন্তু আইনি জটিলতায় তখন কারামুক্তি হয়নি।
এরপর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর তিনি কারামুক্ত হন। তবে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি নিয়মিত আদালতে হাজিরা দেননি এবং পলাতক ছিলেন। তার অনুপস্থিতির কারণে আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। টিটনের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি এবং বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার একাধিক মামলা রয়েছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল, টিটন তাদের অন্যতম।
সূত্র জানায়, ২০০১ সালে পুলিশ যে ২৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে, সেখানে টিটনের নাম ছিল। তার ভগ্নিপতি সানজিদুল ইসলাম ইমন ও তিনি—উভয়ই মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসী চক্র ‘হারিছ-জোসেফ’ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের মূল তৎপরতা ছিল ধানমণ্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়।
পুলিশের তথ্যমতে, টিটন ১৯৯০-এর দশকের শুরুর দিকে ঢাকার অপরাধ জগতে প্রবেশ করেন। তিনি প্রথমে স্থানীয় অপরাধী চক্রের সদস্য ছিলেন এবং ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। ২০০৪ সালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে। টিটন ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। তবে ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগার থেকে তিনি জামিনে মুক্তি পান।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগে গত বছরের ১০ নভেম্বর পুরান ঢাকার ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজের সামনে প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে হত্যা করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈফ মামুনকে। তদন্তে উঠে এসেছে, ওই হত্যার নেপথ্যে ছিলেন টিটনের ভগ্নিপতি সানজিদুল ইসলাম ইমন।
পুলিশ জানায়, খুনিদের ধরতে অভিযান চলছে। ঘটনাস্থলের আশপাশের সিসিটিভির ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে এবং তা চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হচ্ছে। আন্ডারওয়ার্ল্ডের অন্য কোনো সন্ত্রাসীর সঙ্গে আধিপত্য বিস্তারের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ ও কারা এর সঙ্গে জড়িত তা তদন্তের পর নিশ্চিত হওয়া যাবে।
এ বিষয়ে নিউমার্কেট থানার এসআই শাহাদাত জানান, পুলিশ লাশটি ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠিয়েছে। পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে থানায় মামলা নেওয়া হবে।
ঢামেক হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক জানান, নিউমার্কেট এলাকা থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক ব্যক্তিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে আসা হয়েছিল, পরে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


নিউমার্কেট এলাকায় সন্ত্রাসীদের গুলিতে এক ব্যক্তি নিহত