আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

অংশ নিচ্ছে ৫৪৯ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান

অমর একুশে বইমেলা শুরু আজ

স্টাফ রিপোর্টার

অমর একুশে বইমেলা শুরু আজ
ফাইল ছবি

ভাষার মাস ফেব্রুয়ারি ঘিরে প্রত্যাশা, বিতর্ক ও নানা জটিলতা পেরিয়ে আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে অমর একুশে বইমেলা–২০২৬। তিন দফা তারিখ পরিবর্তন এবং প্রকাশকদের বিভিন্ন দাবিকে কেন্দ্র করে আলোচনা-সমালোচনা থাকলেও শেষ পর্যন্ত বইপ্রেমীদের জন্য প্রস্তুত হয়েছে বর্ণিল সাংস্কৃতিক প্রাঙ্গণ। পবিত্র মাহে রমজান উপলক্ষে বইমেলা ঘিরে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। মেলা উপলক্ষে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ তিন স্তরের নিরাপত্তা বলয় গড়ে তুলেছে।

এর আগে ফেব্রুয়ারি মাসে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও পবিত্র রমজান হওয়ায় গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর বাংলা একাডেমি ঘোষণা করেন, এ বছর ডিসেম্বর থেকে মেলা শুরু হবে। বাংলা একাডেমি তখন জানায়, আগামী ১৭ ডিসেম্বর থেকে ১৭ জানুয়ারি পর্যন্ত বইমেলা অনুষ্ঠিত হবে। পরবর্তী সময়ে প্রকাশকদের একুশে ও ভাষার মাসের চেতনা রক্ষার দাবির পরিপ্রেক্ষিতে মেলা পেছানো হয়।

বিজ্ঞাপন

পরে লেখক-প্রকাশক ও ছাত্রনেতাদের নিয়ে গঠন করা হয় বইমেলা পরিচালনা কমিটি। পরিচালনা কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম তখন জানান, কোন নোট অব ডিসেন্ট ছাড়াই কমিটির মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত হয় ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ মেলা শুরু হবে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে অধ্যাপক আজম বলেন, অনিবার্য বাস্তবতার কারণে অন্যান্য বছরের মতো এবার পহেলা ফেব্রুয়ারিতে বইমেলা শুরু করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে ১ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরু না হওয়ার প্রতিবাদে প্রতীকী বইমেলা পালন করে একুশে বইমেলা সংগ্রাম পরিষদ। সেই সঙ্গে বইমেলা পেছানোসহ চার দাবিতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বরাবর স্মারকলিপি দেয় প্রকাশকদের একাংশ ‘প্রকাশক ঐক্য’। মেলা না পেছানোয় তারা মেলায় অংশগ্রহণ না করার সিদ্ধান্ত জানায়। পরে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পর নবনিযুক্ত সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী ও প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের নেতৃত্বে সব পক্ষের সঙ্গে বৈঠকের পর সম্পূর্ণ স্টল ফি মওকুফ ও প্যাভিলিয়ন না রাখার শর্ত মেনে নিয়ে ২৫ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর তারিখ নির্ধারণ করা হয়, যা শেষ হবে ১৫ মার্চ। পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শিডিউল না পাওয়ায় একদিন পিছিয়ে ২৬ ফেব্রুয়ারি মেলা শুরুর তারিখ নির্ধারণ করা হয়।

সব বিতর্ক ছাপিয়ে এখন মূল আলোচনায় প্রস্তুতির অগ্রগতি। বইমেলা কমিটির সদস্য সচিব ও বাংলা একাডেমির সচিব ড. সেলিম রেজা জানান, মেলার সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে।

গতকাল বুধবার সরেজমিন দেখা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানজুড়ে তৈরি হচ্ছে ইট বিছানো হাঁটার রাস্তা, যাতে পাঠক, লেখক ও দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারেন। স্টল নির্মাণ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তবে কিছু কিছু স্টলের নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি । প্রকাশকরা নিজ নিজ স্টল নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তুলছেন, কোথাও বইয়ের কভারভিত্তিক থিম, কোথাও লেখককেন্দ্রিক অলংকরণ, আবার কোথাও আধুনিক আলোকসজ্জা।

এ বছর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট ৫৪৯টি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান মেলায় অংশগ্রহণ করছে। এর মধ্যে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে ৮১টি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যান অংশে ৪৬৮টি নিয়ে মোট ১০১৮টি ইউনিট রয়েছে। ৮৭টি লিটলম্যাগকে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আর শিশুচত্বরে মোট প্রতিষ্ঠান ৬৩টি এবং ইউনিট ১০৭টি।

এবারের মেলা রমজান মাসে হওয়ায় বিশেষ প্রস্তুতিও রাখা হয়েছে। বাংলা একাডেমি জানিয়েছে, ন্যায্যমূল্যে ইফতারের ব্যবস্থা, নামাজের জন্য মসজিদ নির্মাণ করা হয়েছে। রাখা হয়েছে শৌচাগার ও অজুর ব্যবস্থা। প্রতিদিন বেলা ২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে মেলা প্রাঙ্গণ। ছুটির দিনগুলোতে বেলা ১১টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকবে। তবে রাত সাড়ে ৮টার পর নতুন করে আর কেউ মেলায় প্রবেশ করতে পারবে না। এবারের অমর একুশে বইমেলা উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

রমজান মাসে মেলা হওয়া নিয়ে রুহামা পাবলিকেশনের স্বত্বাধিকারী রফিকুল ইসলাম আমার দেশকে বলেন, এবারের একুশে বইমেলা পবিত্র মাহে রমজানে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, এটি আমাদের জন্য এক বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও জ্ঞানচর্চার মাস। আমি বিশ্বাস করি, যে কোনো বিষয়ের সঠিক জ্ঞান নিজেই এক পবিত্র সম্পদ আর সে জ্ঞানচর্চার জন্য প্রয়োজন পরিশুদ্ধ, সুশৃঙ্খল ও পবিত্র পরিবেশ। সৌভাগ্যক্রমে এ বছর আমরা তেমন একটি আবহে বইমেলা পাচ্ছি। আশা করছি, সবাই পবিত্র মাসের মর্যাদা রক্ষা করে জ্ঞান অন্বেষণ ও চর্চায় আরো মনোযোগী হবেন।

অন্যদিকে রমজান মাসে বইমেলা হওয়ায় অর্থনৈতিক ক্ষতি দেখছেন প্রগতি পাবলিকেশনের প্রকাশক আশরার মাসুদ। তিনি মনে করেন, এবার বইমেলা রমজান মাসে হওয়ায় এটি জমে উঠবে না। ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন তিনি।

বইমেলাকে ঘিরে সম্ভাব্য কোনো নিরাপত্তা হুমকির তথ্য না থাকলেও সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)। মেলা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকা রাখা হচ্ছে কঠোর নজরদারিতে। গতকাল সকালে বইমেলা প্রাঙ্গণে স্থাপিত পুলিশ কন্ট্রোল রুমের সামনে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (অ্যাডমিন) সরওয়ার ।

তিনি বলেন, বইমেলা ঘিরে ২৪ ঘণ্টা কার্যকর থাকবে পুলিশি মনিটরিং। মেলায় স্থাপিত কন্ট্রোল রুম থেকে দিনরাত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি নিরাপত্তা তদারকি করবেন। বইমেলাকে কেন্দ্র করে পরিকল্পিত কোনো মব বা বিশৃঙ্খলার সুনির্দিষ্ট আশঙ্কা নেই। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে বা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিঘ্নিত করতে পারেÑএমন কোনো প্রকাশনা পাওয়া গেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে ।

এছাড়া ইউনিফর্মধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে বিশেষ টিম, ফুট প্যাট্রোল ও মুক্তমঞ্চকেন্দ্রিক বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা থাকবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ডিবি, সিটিটিসি, বোম্ব ডিসপোজাল ইউনিট ও সোয়াটসহ বিশেষায়িত ইউনিট প্রস্তুত থাকবে।

অন্যদিকে ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ পৃথক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা নিয়েছে। বইমেলা চলাকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় দিনে ও রাতে ভারী যানবাহন প্রবেশ করতে পারবে না। টিএসসি থেকে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত সড়ক সার্বক্ষণিক বন্ধ থাকবে না, দর্শনার্থীর চাপ বিবেচনায় সময়ভিত্তিক খোলা বা বন্ধ রাখা হবে।

নির্ধারিত পার্কিং ব্যবস্থার আওতায় ফুলার রোড, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার-সংলগ্ন এলাকায় অনুমোদিত যানবাহন রাখা যাবে। নো-পার্কিং জোনে গাড়ি রাখলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নীলক্ষেত/ভিসি বাংলো ক্রসিং, শাহবাগ ও দোয়েল চত্বর থেকে আগত যানবাহনের জন্য নির্দিষ্ট ইউটার্ন ও ডাইভারশন রুট নির্ধারণ করা হয়েছে।

এছাড়া মেলা প্রাঙ্গণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত রাখতে কঠোর নজরদারি থাকবে। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় আয়োজক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয় জোরদার করা হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন