প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি এবং সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
বৃহস্পতিবার (২৬ ফেব্রুয়ারী) রাজধানীর ‘বাংলা একাডেমি’ প্রাঙ্গণে ‘বহুমাত্রিক বাংলাদেশ’ – স্লোগানে আয়োজিত ‘অমর একুশে বই মেলা ২০২৬’ উদ্বোধনপূর্ব ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এসব কথা বলেন।
তারেক রহমান বলেন, আমি মনে করি বর্তমান গ্লোবাল ভিলেজের এই সময়ে মাতৃভাষা ছাড়াও আরো একাধিক ভাষার সঙ্গে পরিচিত হওয়া জরুরি। বর্তমানের প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে সমৃদ্ধি এবং সম্মানের সঙ্গে টিকে থাকতে হলে জ্ঞান এবং মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র এবং সমাজ প্রতিষ্ঠার বিকল্প নেই। এ জন্য আমাদেরকে জ্ঞানে-বিজ্ঞানে-প্রযুক্তিতে মেধায় নিজেদেরকে সমৃদ্ধ হতে হবে। একইসঙ্গে বাংলা ভাষাকে জাতিসংঘের অফিসিয়াল ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের জন্য আমাদের প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকবে।
ভাষণে অমর একুশে বইমেলাকে আন্তর্জাতিক বইমেলায় পরিণত করার বিষয়ে বিবেচনা করার জন্য অনুরোধ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, ৫২ সালের ভাষা শহীদদের আকাঙ্খাকে ধারণ করে আজকের এই বাংলা একাডেমি। বাংলা একাডেমির সৃজনশীল কার্যক্রমের অন্যতম একটি গুরুত্ত্বপূর্ণ আয়োজন ‘অমর একুশে বইমেলা’।
তবে সময়ের প্রেক্ষিতে আগামী বছরগুলোতে ‘অমর একুশে বইমেলা’কে ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’য় হিসেবে আয়োজন করার সুযোগ রয়েছে কিনা, সেটি আপনারা বিবেচনা করতে পারেন। ‘অমর একুশে আন্তর্জাতিক বইমেলা’ অনুষ্ঠিত হলে বিশ্ব সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বহু ভাষা এবং সংস্কৃতি শেখা-জানা এবং বোঝার দিকে আমাদের নাগরিকদের আগ্রহী করে তুলতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আমার বিশ্বাস।
এসময় সারাদেশে বই মেলা আয়োজনের আহ্বান জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বইমেলা শুধু একটি নির্দিষ্ট মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সীমাবদ্ধ না রেখে সারাবছর দেশের সব বিভাগ, জেলা, উপজেলায়ও আয়োজিত হতে পারে। এ ব্যাপারে বই প্রকাশকগণও উদ্যোগী ভূমিকা রাখতে পারেন বলে আমি মনে করি। এ ব্যাপারে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় আপনাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত।
তরুণ প্রজন্মকে বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলতে হবে বলে জানান তারেক রহমান। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে তথ্য প্রযুক্তি মানুষের বই পড়ার অভ্যাসে প্রধান বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইন্টারনেট আসক্তি তরুণ প্রজন্মকে বই বিমুখ করে তুলছে। ইন্টারনেটেও অবশ্যই বই পড়া যায়…তবে গবেষকরা বলছেন, বইয়ের পাতায় কালো অক্ষরে লেখা বই পড়ার মধ্যে যেভাবে জ্ঞানের গভীরতা উপভোগ করা যায়, একইভাবে দিনের পর দিন কম্পিউটারের মনিটরে ডুবে থেকে জ্ঞানার্জন সম্ভব হলেও শরীর এবং মনোজগতে এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রভাবও কম নয়।
যুক্তরাজ্য কিংবা কানাডার মতো অনেক উন্নত দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরায় বলছেন,ইন্টারনেট ব্যবহারের আসক্তি পড়াশোনার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হারিয়ে ফেলার তীব্র ঝুঁকি রয়েছে। সময়ের প্রেক্ষিতে জন জীবনে ইন্টারনেট অনিবার্য অনুষঙ্গ হয়ে উঠলেও এর নেতিবাচক দিকগুলো সম্পর্কেও আমাদেরকে সচেতন থাকতে হবে। বিশেষ করে বইয়ের প্রতি তরুণ প্রজন্মের আগ্রহ বাড়াতে হবে।
তিনি আরো বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারের যাত্রা শুরু হয়েছে। জনগণের প্রতি জবাবদিহিমূলক এ সরকার দেশটাকে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করতে চায়। অমর একুশে বইমেলা কেবল বই বেচাকেনার মেলা নয় বরং মেলা হয়ে উঠুক শিক্ষা এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের সূতিকাগার। অমর একুশে বইমেলা কেন্দ্র করে বাংলা একাডেমি মাসব্যাপী আলোচনা অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বিশেষ করে শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন, সংগীত ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতার যে আয়োজন করে -এইসব উদ্যোগ নতুন প্রজন্মের সামনে তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরী করে দেয়। এভাবেই বইমেলা হয়ে উঠুক আমাদের সকলের মিলনমেলা, প্রাণের মেলা।
অমর একুশে বইমেলা শুধুমাত্র উৎসবই হবে না বরং এই মেলা বাংলাদেশের মানুষকে বইপ্রেমী করে তুলবে সেই প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, বইপ্রেমীদের তালিকায় ১০২ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৭তম। অমর একুশে বইমেলা শুধুমাত্র একটি উৎসবই হবেনা বরং এই মেলা আমাদেরকে আরো বইপ্রেমী করে তুলবে, নিয়মিত বই পড়ায় আগ্রহী করে তুলবে, আজকের এই বই মেলায় দাঁড়িয়ে এটিই আমার প্রত্যাশা।
বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে গিয়ে জার্মান দার্শনিক ‘মারকুইস সিসেরো'র একটি উক্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘বই ছাড়া ঘর আত্মা ছাড়া দেহের মতো’।
স্বাগত বক্তব্যে বাংলা একাডেমি মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম বলেন, আমরা আশাকরি রোজা ও ঈদের উৎসবমূখরতার সাথে বই মেলার ঐতিহ্য এবং উৎসব প্রবণতা একাকার হয়ে এবার আমাদের জন্য এক নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করবে। আমি সবাইকে বইমেলা উদযাপনের আমন্ত্রণ জানাই। আমি আশাকরি এবছর ঈদের উপহারের মধ্যে বই একটি বিশেষ স্থান দখল করে নিবে। আমি আশাকরি বাংলা একাডেমির অপূর্ণতা দূরীকরণে সাধ্যমতো যত্নবান হবে এবং স্বাধীন মননশীলতার চর্চায় আন্তরিক হবে। তাহলেই কেবল জাতির মননের প্রতীক হিসেবে এপ্রতিষ্ঠান (বাংলা একাডেমি) আগামী দিনে বৃহত্তর ভূমিকা পালন করতে পারবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, এই মেলা শুধু বই বিতরণের মেলা নয় এটি আমাদের আত্মপরিচয়ের উৎস। বই হচ্ছে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে আমরা বই বিমুখ হবো না। আমাদের নবগঠিত সরকার সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার প্রসারে দৃঢ় অঙ্গিকারবদ্ধ। আসুন আমরা বই কিনি, বই পড়ি এবং বই উপহার দেই। তরুণ প্রজন্মকে বই পড়ার প্রতি আকৃষ্ট করি। কারণ একটি বই বদলে দিতে পারে একটি জীবন। একটি চিন্তা বদলে দিতে পারে একটি সমাজ। আসুন বই পাঠের মধ্য দিয়ে একটি আলোকিত সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ে তুলি।
সভাপতির বক্তব্যে বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ঈদ উপলক্ষে স্বজনদের ও প্রিয়জনদের অন্তত একটি বই উপহার দেওয়ার জন্য দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করেন। এসময় একটি জ্ঞানভিত্তিক ও মেধাভিত্তিক সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য সকলকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান ও বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি রেজাউল করিম বাদশা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে তার স্ত্রী ডা. জোবায়দা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান উপস্থিত ছিলেন। উদ্বোধন ঘোষণার পর তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বই মেলা ঘরে দেখেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

