ত্রিমুখী সংকটে পড়েছে হাওরাঞ্চলের কৃষক। আগাম বৃষ্টি, শ্রমিক সংকট এবং ধান কাটার যন্ত্রের ঘাটতি- এ তিন সমস্যায় ফসল ঘরে তোলা নিয়ে দুশ্চিন্তায় তারা।
সূত্রমতে, গত বছরের তুলনায় এবার ১০ শতাংশ কম ধান কাটার যন্ত্র (হারভেস্টার) মাঠে ছিল। তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এ দাবি মানতে নারাজ। তারা বলছেন, ধান কাটার পর শুকানোর মেশিন বিভিন্ন এলাকা থেকে তুলে এনে হাওর এলাকায় পাঠাচ্ছেন। দু’পক্ষের রশি টানাটানিতে হাজারো কৃষক পড়েছেন দুশ্চিন্তায়।
এ প্রসঙ্গে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের পরিচালক (সরেজমিন উইং) ওবায়দুর রহমান মণ্ডল আমার দেশকে বলেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রতিটি উপজেলায় অতিরিক্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তারা সরাসরি কৃষকের সঙ্গে কাজ করছেন এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও শ্রমিক সরবরাহে সহায়তা করছেন। তিনি জানান, কয়েকটি জেলা থেকে ড্রায়ার মেশিন এনে সুনামগঞ্জে পাঠানো হচ্ছে।
সূত্র জানায়, আগাম বন্যায় দেশের ২৮ হাজার ২০১ হেক্টর জমির ধান পানিতে পুরো নিমজ্জিত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, যেসব জমি এখনো পানিতে নিমজ্জিত, সেগুলোর সঙ্গে প্রায় চার হাজার কৃষক জড়িত। তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন। ফলে ক্ষতির আশঙ্কা আরো বাড়বে। যা হাওর এলাকার কৃষি অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে দীর্ঘসময় ভেজা অবস্থায় থাকায় ধানে অঙ্কুরোদ্গম (জার্মিনেশন) হওয়া শুরু করেছে, যা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
কৃষকদের মতে, এবার সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো শ্রমিকের অভাব। আগে ফসল কাটার মৌসুমে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে শ্রমিকরা হাওর এলাকায় এসে কাজ করতেন। কিন্তু এ বছর তাদের উপস্থিতি অনেক কম। স্থানীয়ভাবেও পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়া যায়নি। ফলে শ্রমের মজুরি বেড়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো ধান কাটাও সম্ভব হয়নি।
রফিকুল ইসলাম নামে এক কৃষক জানান, এখানকার শ্রমিকরা সাধারণত বছরের অন্য সময় বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। বোরো ধান কাটার সময় তারা হাওরে এসে কাজ করেন। কিন্তু এবার আগাম বৃষ্টির কারণে তাদের অনেকেই আসতে পারেননি। ফলে নির্ধারিত সময়ে ধান কাটা সম্ভব হয়নি।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, হাওরাঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধান উৎপাদন এলাকা। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চলজুড়ে বোরো ধানই এখানকার প্রধান ফসল। বছরের একমাত্র এ ফসলের ওপরই নির্ভর করে হাজারো কৃষকের জীবিকা। কিন্তু সময়মতো ধান কাটা না গেলে আকস্মিক বন্যা বা আগাম বৃষ্টিতে পুরো ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
একজন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা জানান, হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকায় ধান একসঙ্গে পাকতে শুরু করে। ফলে অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল পরিমাণ ধান কাটতে হয়। হাতে শ্রমিক দিয়ে এ কাজ করা প্রায় অসম্ভব। কৃষকরা বলছেন, যন্ত্র থাকলেও তা সবার জন্য সহজলভ্য নয়। অনেক সময় একটি হারভেস্টার বুকিং দিতে কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যে আবহাওয়া খারাপ হলে বড় ক্ষতি হয়ে যায়। অনেক এলাকায় স্থানীয় প্রভাবশালীরা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যন্ত্র ব্যবহার করেন, ফলে সাধারণ কৃষকেরা বঞ্চিত হন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, হাওরের কৃষিতে এ সংকট নতুন নয়, তবে এবার তা বেশি তীব্র আকার ধারণ করেছে। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা বাড়ছে, ফলে আগাম বৃষ্টির ঝুঁকিও বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও দ্রুত সেবা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, প্রতিবছরই কোনো না কোনো সময়ে অতিবৃষ্টি হয়, আর এর সঙ্গে ভারত থেকে আসা ঢল তো থাকেই। তবে তার মতে, হাওর অঞ্চলে এবার ক্ষতির মাত্রা খুব বেশি হবে না, কারণ ইতোমধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি ধান কাটা হয়ে গেছে। তবুও ৩০-৩৫ শতাংশ ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। সামগ্রিকভাবে আগের সময়গুলোর তুলনায় ক্ষতি কমই হবে।
তিনি আরো বলেন, শুধু হাওর অঞ্চলই নয়, অতিবৃষ্টির কারণে দেশের অন্যান্য এলাকাতেও ফসলের ক্ষতি হচ্ছে। ফলে সার্বিকভাবে বোরো ধানের উৎপাদনে প্রায় ১০ শতাংশ পর্যন্ত ঘাটতি দেখা দিতে পারে, যা পরিমাণে প্রায় ২-৩ লাখ টন। এতে কিছুটা খাদ্য ঘাটতি তৈরি হতে পারে এবং খাদ্যদ্রব্যের দামও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, সিলেটের উপ-পরিচালক মো. শামসুজ্জামান জানান, সিলেটে ৮৮ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ফসল উৎপাদন হয়েছে। এর মধ্যে হাওরের ৮৫ ভাগ ফসল কাটা হয়েছে। দ্রুত ধান কেনার জন্য খাদ্য বিভাগে সুপারিশ পাঠানো হয়েছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

