দেশজুড়ে হামের উদ্বেগজনক প্রাদুর্ভাবে গত ১৫ দিনে ৪২৩ শিশু আক্রান্ত হয়েছে এবং ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সরকার ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামে শুরু করছে। আগামী রোববার থেকে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের টিকা দেওয়া হবে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় স্বাস্থ্যকর্মীদের সব ধরনের ছুটি বাতিল করা হয়েছে।
এদিকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামের টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ দিয়েছে মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া।
টিকাদান কর্মসূচি শুরু হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন। বুধবার সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তিনি এ ঘোষণা দেন।
মন্ত্রী জানান, রোববার থেকে ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের হামের টিকা দেওয়া হবে। একইসঙ্গে সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই)-এর আওতায় অন্যান্য টিকাদান কার্যক্রমও চলমান থাকবে। তিনি বলেন, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবারের মধ্যে প্রয়োজনীয় টিকা ও সিরিঞ্জ সংগ্রহ করে সারা দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। টিকাদান কার্যক্রম নির্বিঘ্ন করতে দেশের সব স্বাস্থ্যকর্মীর ছুটি বাতিল করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় সরকার প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে। দেশের হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেটর প্রস্তুত রাখা হয়েছে এবং রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক শয্যার ব্যবস্থাও করা হয়েছে।
এদিকে, দেশজুড়ে হামের আকস্মিক বিস্তার গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ দিনে (বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত) ৪২৩ শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান না থাকায় প্রকৃত চিত্র আরও বেশি হতে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হান আমার দেশকে বলেন, বুধবার সকাল আটটা পর্যন্ত শেষ ১৫ দিনে হামের মতো উপসর্গ নিয়ে মেডিকেলে ভর্তি হয়েছে ২ হাজার ৩১৪ শিশু। তাদের মধ্যে ৪২৩ শিশু আক্রান্ত হয়েছে হামে। যার মধ্যে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আর এই ডাটা প্রায় নির্ভুল। কারণ একদম উপজেলা থেকে শুরু করে জেলা ও বিভাগ হয়ে আমাদের হাতে আসে। ডাটায় কোনো গ্যাপ থাকার সম্ভাবনা নেই। থাকলেও খুবই কম।
এই অবস্থায় হামের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা জিয়া হায়দার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন বলে মনে করেন ডা. রায়হান। তিনি বলেন, ওনার সিদ্ধান্তে জুন থেকে যে ক্যাম্পেইন হওয়ার কথাছিল, সেই ক্যাম্পেইনের ২ কোটি ১৯ লাখ টিকা ইমার্জেন্সি ভ্যাকসিনেশন প্রোগ্রামে ব্যবহার করা হবে। এতদিন আমরা টিকা দেওয়া শুরু করতে পারতাম, শুধু সিদ্ধান্তের সংকট ছিল আর কোনো সংকট ছিলো না। এখন আমাদের এসব টিকা ব্যবহার করা হবে, পরবর্তীতে আবার ক্যাম্পেইনের টিকাগুলো দিয়ে দেওয়া হবে। সেগুলো দিয়েই নিয়মিত ক্যাম্পেইন জুনে শুরু হবে।
এদিকে, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে হামের টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আইনি নোটিশ পাঠানো হয়েছে। মানবাধিকার কর্মী ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া এ নোটিশ পাঠান। নোটিশে হামের টিকার অভাবে শিশু মৃত্যুর ঘটনা উল্লেখ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। অন্যথায় সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী হাইকোর্টে রিট দায়েরের কথাও বলা হয়েছে।
রাজশাহীতে আরেক শিশুর মৃত্যু, আইসিইউর অপেক্ষায় ৫৬
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হামে আক্রান্ত আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মঙ্গলবার রাতে হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। শিশুটির বাড়ি রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলায়। এ নিয়ে রামেক হাসপাতালে হামে আক্রান্ত মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াল চারজনে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ডা. শংকর কে বিশ্বাস জানান, বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে ২২ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। একই সময়ে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১৪ জন। বর্তমানে হাসপাতালে হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১১৭ জন শিশু। তাদের মধ্যে ১২ জন আইসিইউতে ভর্তি রয়েছে। এছাড়া আইসিইউ সেবার জন্য অপেক্ষায় রয়েছে আরও ৫৬ জন শিশু।
এছাড়াও বড়দের জন্য আইসিইউ রয়েছে ২৮টি। বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আইসিইউ এর জন্য অপেক্ষামান রোগির সংখ্যা ৮৪ জন বলে জানান ডা. শংকর কে বিশ্বাস। দুপুর ১টায় তিনি হাসপাতালের হামে আক্রান্ত রোগিদের নিয়ে ব্রিফ করেন।
চট্টগ্রামে বাড়ছে হাম-এর উপসর্গে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা
চট্টগ্রামে উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে হাম-এর উপসর্গে আক্রান্ত শিশুদের সংখ্যা। আক্রান্ত শিশুদের বড় একটি অংশই কোনো ধরনের টিকা নেয়নি। গত ৮৪ ঘণ্টায় নতুন করে আরও ২৬ জন শিশু বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ নিয়ে বর্তমানে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫৫ জনে। যদিও এদের মধ্যে কয়েকজন ইতোমধ্যে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। গতকাল শুধু চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল-এ ৩৩ জন শিশু ভর্তি ছিল, যাদের অধিকাংশই টিকাবিহীন। এখন পর্যন্ত ভর্তি রোগীদের মধ্যে ৭ জনের হাম এবং একজনের রুবেলা শনাক্ত হয়েছে।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রাম নগর থেকে গতকাল ৬ জন শিশুর নমুনা ঢাকার ন্যাশনাল পোলিও অ্যান্ড মিজেলস-রুবেলা ল্যাবরেটরিতে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে নগর থেকে মোট ৪১ জনের নমুনা পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে ১৫টি উপজেলা থেকে গতকাল আরও ১০ জনের নমুনা পাঠানো হয়। সব মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ৯১ জন শিশুর নমুনা পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
রংপুরে নেই পরীক্ষণ যন্ত্র, রোগ নির্ণয়ে দেরি
রংপুর বিভাগে হাম রোগীর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এখন পর্যন্ত ৭ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে নির্দিষ্ট পরীক্ষার যন্ত্র না থাকায় রোগ নির্ণয়ে দেরি হচ্ছে। চিকিৎসকরা উপসর্গ দেখে প্রাথমিক চিকিৎসা দিচ্ছেন এবং নমুনা ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে, ফলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগ্রেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, ৭ জন রোগী হাসপাতালের আছে। এর মধ্যে সকালে একজনকে রিলিজ দেওয়া হয়েছে। আতঙ্কিত হবার কিছু নেই। আপাতত আমরা ১০ বেডের আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত করেছি, প্রয়োজনে আরো বেড বাড়ানো হবে। আমরা আইসোলেশন ওয়ার্ডে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সরবরাহ, ডাক্তার, নার্সসহ প্রয়োজনীয় সব কিছুই প্রস্তুত রেখেছি। ভবিষ্যতে রোগী বাড়লে, আইসিইউ প্রয়োজন হলে সেটাও আমরা প্রস্তুত করে রাখছি।
কুমিল্লায় মেঝেতে রোগীদের চিকিৎসা, ক্যানোলা ফিট করতে ৫০০ টাকা
এবছরেই হাম আক্রান্ত হয়ে ঢাকায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিন শিশুর মৃত্যু, মোট আক্রান্ত ৯১ জন। শুধু কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে গত ১৮ মার্চ থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তি হয়েছে ৩২ শিশু, ঢাকায় রেফার ১ জন, সুস্থ হয়েছেন ১৪ জন ও বর্তমানে চিকিৎসাধীন ১৭ শিশু। কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন তথ্যমতে গত ২৪ ঘন্টায় জেলাজুড়ে হাম রুগে সন্দেহজনক আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা আনুমানিক ২২, কোন রুগী মারা যায়নি।
ডাক্তারদের আন্তরিকতা ও চিকিৎসার মান নিয়ে সন্তুষ্টি প্রকাশ করলেও এসব রুগীদের জন্য নেই পর্যাপ্ত আবাসন ব্যবস্থা, সেবার মান নিয়ে অভিযোগ রয়েছে রুগীর স্বজনদের। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে মেঝেতে দেয়া হচ্ছে চিকিৎসা, সময়মত পাওয়া যাচ্ছে না নার্স, বাইরে থেকে লোক এনে পুষ করা হচ্ছে ইনজেকশন ও ক্যানেলা। তবে কুমিল্লা মেডিকেল কর্তৃপক্ষের দাবি হাম আক্রান্ত শিশুদের জন্য আলাদা রুমের ব্যবস্থা ও সার্বক্ষণিক চিকিৎসার মধ্যে রাখা হচ্ছে। যেকারনে এখন পর্যন্ত কোন মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে দুইদিন ধরে হাসপাতালের মেঝেতে আছেন তামান্না আক্তার। তিনি আমার দেশকে বলেন, অসুস্থ বাচ্চাকে নিয়ে গত দুই দিন ধরে হাসপাতালের মেঝেতে অবস্থান করছি। ডাক্তাররা নিয়মিত আসার কারণে কিছুটা সুস্থ হলেও এখানের সেবার মান ভালো না। একটা ইঞ্জেকশন দিতে হলে অথবা একটা ক্যানোলা ফিট করতে চাইলে বাইরে থেকে লোক আনতে হয় এর কারণে তারা ৫০০ টাকা করে নেয়। তিনি আরো বলেন, আমাদের ভাইরাস ভালো হবে কিভাবে আমাদের আশেপাশে যে পরিমাণ নোংরা এতে আমরা আরো অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। খুবই অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে আমাদেরকে রাখা হচ্ছে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

