বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণে জাতীয় ন্যায়পাল পদ সৃষ্টির প্রস্তাব দিয়েছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। তিনি বলেন,বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসন থেকে দেশের জনগণ মুক্ত হয়েছে। ফলে জুলাই বিপ্লবের জনআকাঙ্খাকে সামনে রেখে জাতীয় ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি প্রয়োজন। এই পদের নির্বাহী কোনো ক্ষমতা থাকবে না তবে কোনো নাগরিক রাষ্ট্রের দ্বারা বৈষম্যের শিকার হলে নৈতিক অবস্থানের দিক ন্যায়পাল থেকে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে।
মঙ্গলবার সকালে জাতীয় প্রেসক্লাব অডিটোরিয়ামে এবি পার্টির উদ্যোগে ‘অনুপ্রেরণা, আত্মপর্যালোচনা ও প্রত্যয়দীপ্ত অঙ্গীকারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ৩৬ দিন উদযাপন’ এর উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এই কথা বলেন।
৫ আগস্টের মধ্যে জুলাই প্রক্লেমেশন (ঘোষণাপত্র) দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, জুলাই শহীদদের রক্তের বিনিময়ে এই সরকার গঠিত হলেও এক বছরেও জুলাই প্রক্লেমেশন দিতে পারেনি। এটা অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা। কোনো কারণে যদি সরকার জুলাই প্রক্লেমেশন দিতে না পারে তাহলে এর পুরো দায়ভার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনুস নিতে হবে।
জুলাই প্রক্লেমেশন না করা অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এ কথা জানিয়ে তিনি, জুলাই শহিদদের ভুলে গেলে আমাদের অস্তিত্ব থাকবে না। ফলে সরকারের উচিত অবিলম্বে জুলাই প্রক্লেমেশন (ঘোষণাপত্র) দেওয়া।
মাহমুদুর রহমান বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার আলোকে সংস্কারের মাধ্যমে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণ করতে পারলেই কেবল জুলাই শহীদদের প্রতি আমরা প্রকৃত শ্রদ্ধা নিবেদন করতে পারবো। হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের মতো আর যাতে কোনো ফ্যাসিবাদী শাসন ফিরে না আসতে পারে। তার জন্য রাষ্ট্রের যে প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রয়োজন তা করতে হবে। তবেই আমরা বুঝতে পারবো জুলাই শহীদদের আত্মত্যাগ ও আহতদের ত্যাগ বৃথা যায়নি।
তিনি বলেন, এর পথ চলা শুরু হয়েছে। আমরা শুনতে পেরেছি দুবারের বা ১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকবেনা এ ব্যাপারে সকল রাজনৈতিক দল ঐকমত্য পোষণ করেছে। এটা একটা প্রাথমিক ধাপ। কারণ যে মুহূর্তে একজন মনে করবেন আমি আজন্ম প্রধানমন্ত্রী বা শাসক থাকতে পারবো। সেইমূহূর্তে এখানে নতুন করে ফ্যাসিবাদী শাসনের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়ে যাবে। তবে এখানে একটি ক্যাচ আছে তা আমি আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই- দুবারের বা ১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকবেনা। কিন্তু বলা হয়নি দুবার বা ১০ বছর পর তিনি আবার রাষ্ট্রপতি হতে পারবেন না। এখানে ক্যাচটা হলো রাশিয়ার মতো। পুতিন দুইবার প্রেসিডেন্ট থাকার পর প্রধানমন্ত্রী হয়ে গেলেন। সেহেতু ক্ষমতা তার হাতেই থেকে গেল। তাই এটা যদি আমরা বন্ধ করতে চাই তাহলে আমাদের আইনের মাধ্যমে এই সংস্কার করতে হবে যে- দুবারের বা ১০ বছরের বেশি কেউ প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন। এরপর তিনি আর কখনো রাষ্ট্রপতি কিংবা সরকার প্রধান হতে পারবেন না। এটা সবার মাথায় থাকতে হবে। এটা না করতে পারলে আবার ভিন্ন ফর্মে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসবে।
দ্বিতীয়ত আর যাতে ভারতীয় আধিপত্যবাদ কোনোভাবেই ফিরে না আসতে পারে। তার ব্যবস্থা আমাদের করতে হবে। কারণ পুরানো ফ্যাসিবাদ তৈরি হতে দিল্লি থেকে তাদেরকে ব্লাঙ্ক চেক দেওয়া হয়েছিল। তাদেরকে বলে দেওয়া হয়েছিল তোমরা যত পারো জুলুম চালিয়ে যাও তোমাদের পাশে আমরা ঢাল হয়ে থাকবো। যেমনিভাবে এই মুহূর্তে জায়োনিস্ট ইসরাইলি ফিলিস্তিনে জুলুম চালাতে পারছে মার্কিন আধিপত্যবাদের ছত্রছায়ায়। এ কারণে ইসরাইল দানব হয়ে উঠেছে। হাসিনাও দিল্লির আধিপত্যবাদ দ্বারা দানব হয়ে উঠেছিল। আমরা সেটা কোনোভাবেই ভুলে যেতে পারিনা। তাই আমাদের ঐক্যবদ্ধ হতে হবে আর যাতে দিল্লি কেন, আর কোনো বিদেশি শক্তি যাতে এখানে আধিপত্য বিস্তার না করতে পারে। সেই ব্যাপারে একটা ন্যাশনাল চার্টার হওয়া প্রয়োজন।
তৃতীয়তঃ বিগত ৫ বছরের মতো আর যাতে দেশের সম্পদ লুণ্ঠন না হয়। গোটা জাতি দেখেছে বিগত ১৫ বছরে কিভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাট হয়েছে। লাখো কোটি টাকা লুট করা হয়েছে হাসিনার আমলে। তাই আমাদের এমন আইন করতে হবে এভাবে যাতে আর কোনো দিন রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট না হয়।
চতুর্থতঃ জাতীয় ন্যায়পাল পদ সৃষ্টি প্রয়োজন। এই পদের নির্বাহী কোনো ক্ষমতা থাকবে না তবে কোনো নাগরিক রাষ্ট্রের দ্বারা বৈষম্যের শিকার হলে নৈতিক অবস্থানের দিক ন্যায়পাল থেকে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারবে।
অনুষ্ঠানের সভাপতি এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, এবি পার্টি ক্ষমতার জোটে বিশ্বাসী না, জনতার জোটে বিশ্বাসী। সেহেতু বৈষম্যহীন রাষ্ট্র বিনির্মাণে আগামী দিনে এবি পার্টি বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবে।
এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, রাষ্ট্রীয় সংস্কারে বাঁধা দেয়া গাদ্দারীর লক্ষণ। কোনো কোনো দল জুলাই বিপ্লবের সাথে মীরজাফর ও লেন্দুপ দর্জির ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধক শহীদ নাজমুল কাজীর স্ত্রী মারিয়া সুলতানা রাখি বলেন, পৃথিবীর সব সম্পদ লিখে দিলেও আমি আমার স্বামী হারানোর বেদনা এবং আমরা সন্তান তার বাবা হারানোর বেদনা ভুলে যেতে পারবে না। তিনি শহীদ নাজমুল কাজীর কথা স্মরণ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাছুম, এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা প্রফেসর ডা. মেজর আব্দুল ওয়াহাব মিনার, এবিএম নাজমুল হাসান, এবি পার্টির নারীবিষয়ক সম্পাদক ফারাহ নাজ সাত্তার, লে. কর্নেল দিদারুল আলাম, শাহাদাতুল্লাহ টুটুল, আমিনুল ইসলাম, হাদিউজামান খোকন, আলতাফ হোসেন, ব্যারিস্টার নাসবীন সুলতানা মিলি, এবিএম খালিদ হাসান প্রমুখ। এছাড়া শহীদ নাজমুল কাজীর সন্তান কাজী নুজাইরাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

