আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

আজ জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস

খাদ্যের নামে মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে ‘বিষ’

সরদার আনিছ

খাদ্যের নামে মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে ‘বিষ’

আজ সোমবার পালিত হচ্ছে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস-২০২৬। এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে- ‘খাদ্য নিশ্চিত করি সুস্থ সবল জীবন গড়ি।’ এর আগে ২০১৮ সালে দেশে প্রথমবারের মতো দিবসটি পালন করা হয়।

দিবসটি উপলক্ষে আজ বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। সংস্থাটির কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস পালনের মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির অধিকার নিশ্চিত করা। এছাড়াও সর্বসাধারণকে নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ, বিপণন ও বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম বিষয়ে সর্বস্তরে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করাই এ দিবসের প্রধান লক্ষ্য।

বিজ্ঞাপন

তবে সংস্থাটি কি সত্যিই দেশের মানুষকে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পারছেন, তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বিএফএসএ চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) জাকারিয়া বর্তমানে খাবারে ট্রান্সফ্যাট বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন। তিনি আমার দেশকে বলেন, এ বিষয়ে আমরা কাজ করছি। এর সঙ্গে অনেক প্রতিষ্ঠান জড়িত, তারাও কাজ করছেন। এর নিয়ন্ত্রণ তো একদিনে হবে না; আমরা তো আর খাদ্য বন্ধ করে দিতে পারব না। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে মনিটরিং ও জনসচেতনতাসহ নানাভাবে কাজ করে আসছি। তবে যারা খাবার উৎপাদন, সরবরাহ, বিক্রি ও গ্রহণ করেন সবাইকে সচেতন হতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুসারে, ট্রান্সফ্যাটঘটিত হৃদরোগে মৃত্যুর সর্বাধিক ঝুঁকিপূর্ণ ১৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। দেশে হৃদরোগজনিত মৃত্যুর ৪ দশমিক ৪১ শতাংশের জন্য দায়ী ট্রান্সফ্যাট।

হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মো. আফজালুর রহমান বলছেন, খাবারের ট্রান্সফ্যাট হলো ক্ষতিকর চর্বিজাতীয় খাবার। এটি রক্তের ‘ভালো’ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয় এবং ‘খারাপ’ কোলেস্টরেলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। রক্তে অতিরিক্ত মাত্রার খারাপ কোলেস্টেরল হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বাড়ায়।

সার্বিকভাবে চিকিৎসক ও গবেষকরা চর্বি ও ট্রান্সফ্যাটকে হৃদরোগের জন্য দায়ী করেন। বাংলাদেশে অসংক্রামক রোগে যত মানুষ মারা যায় তার অর্ধেকই মারা যায় হৃদরোগে, যার সংখ্যা প্রায় তিন লাখ।

রাজধানীতে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিমেল সাহা বলেছেন, বাংলাদেশে যত মানুষ হৃদরোগে আক্রান্ত হন, তার বেশিরভাগের জন্যই দায়ী এই ট্রান্সফ্যাট। গবেষণা ও অ্যাডভোকেসি প্রতিষ্ঠান প্রজ্ঞার (প্রগতির জন্য জ্ঞান) নির্বাহী পরিচালক এবিএম জুবায়ের বলেন, খাদ্যে ট্রান্সফ্যাটের প্রধান উৎস পারশিয়ালি হাইড্রোজেনেটেড অয়েল (পিএইচও), যা ডালডা বা বনস্পতি ঘি নামে পরিচিত। সাধারণত বেকারি পণ্য, প্রক্রিয়াজাত ও ভাজা পোড়া খাবার এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ ও সড়কসংলগ্ন দোকানে বিভিন্ন খাবার তৈরিতে ডালডা ব্যবহৃত হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি।

পুষ্টিবিদরা মনে করেন, ট্রান্স ফ্যাটি এসিড (টিএফএ) বা ট্রান্সফ্যাট একটি বিষাক্ত খাদ্য উপাদান যা হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপসহ নানাবিধ অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। ট্রান্সফ্যাটমুক্ত খাবার নিশ্চিত করতে বিএফএসএ সব ধরনের ফ্যাট, তেল এবং খাদ্যদ্রব্যে ট্রান্সফ্যাটের সর্বোচ্চ সীমা মোট ফ্যাটের ২ শতাংশ নির্ধারণ করে প্রবিধানমালা প্রকাশ করেছে।

এদিকে ফাস্ট ফুডের সুস্বাদু খাদ্যের নামে মানুষকে খাওয়ানো হচ্ছে ‘স্নায়ু বিষ’। এসব খাবারের স্বাদ বাড়াতে টেস্টিং সল্টের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। এটি পরিমাণে বেশি ও দীর্ঘদিন খেলে স্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়। নিয়মিত টেস্টিং সল্ট খেলে কিডনি বিকলসহ জটিল সব রোগ দেখা দিতে পারে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা।

জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের ন্যাশনাল ফুড সেফটি ল্যাবরেটরির সমীক্ষায় বাজারে প্রচলিত আলুর চিপসের পাশাপাশি ৫৫টি নুডুলস, পপকর্ন ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাইতে অতিমাত্রায় টেস্টিং সল্ট পাওয়া গেছে। পুষ্টিবিদরা বলেন, মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট টমেটো ও পনিরে প্রাকৃতিকভাবেই থাকে। তাই খাবারে টেস্টিং সল্টের পরিবর্তে টমেটো ব্যবহার করলে পুষ্টিও পাওয়া যায় এবং খাবারের স্বাদও বাড়ে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাট হৃদরোগ, স্ট্রোক ও ক্যানসারের মতো অসংক্রামক রোগের অন্যতম কারণ। খাদ্যে এসব উপাদানের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ। দেশের মানুষ খাবারের নামে বিষ খাচ্ছে কি নাÑএ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার আহ্বান জানান তারা।

বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডা. মো. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, আমাদের ভাবতে হবে, আমরা খাবারের নামে বিষ কিনে খাচ্ছি কি না। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা জরুরি, কারণ দেশে অসংক্রামক রোগ বাড়ছে।

সেন্টার ফর ল অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্সের গবেষণায় উঠে এসেছে, অধিকাংশ মোড়কজাত খাদ্যে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত কোনো সতর্কবার্তা নেই। চিপস ও উচ্চ চিনিযুক্ত পানীয়তে মোটিভেশনাল শব্দ ব্যবহারের মাধ্যমে ভোক্তাদের আকৃষ্ট করা হয়। বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রায় শতভাগ দোকানে এসব পণ্যের বিজ্ঞাপন রয়েছে, ৭০ শতাংশ দোকানি অতিরিক্ত বিক্রির জন্য কমিশন পান, ৫২ শতাংশ দোকানে ব্র্যান্ডের ফ্রিজ ও ৩৬ শতাংশ দোকানে সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শিব্বির আহমেদ ওসমানী বলেন, সরকার মোড়কজাত খাদ্যে চিনি, লবণ ও ট্রান্সফ্যাট সংক্রান্ত তথ্য উল্লেখ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য মোহাম্মদ সোয়েব জানান, নিরাপদ খাদ্য আইন একটি শক্তিশালী আইন। এর আলোকে মোড়কজাত প্রবিধানমালা তৈরি হয়েছে। তবে অনেক ব্যবসায়ী এখনো তা মেনে চলছেন না। আমরা ফ্রন্ট প্যাকেটে লেবেলিং বাস্তবায়নে কাজ করছি।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন