ছেলে হত্যার বিচার চান সর্বকনিষ্ঠ শহীদ আহাদের বাবা

ছেলে হত্যার বিচার চান সর্বকনিষ্ঠ শহীদ আহাদের বাবা
শহীদ আব্দুল আহাদ

জুলাইয়ের রক্তস্নাত আন্দোলনে সর্বকনিষ্ঠ শহীদের নাম আব্দুল আহাদ। চার বছরের ছোট্ট এই শিশু রাজধানীর রায়েরবাগে নিজ বাসায় গুলিবিদ্ধ হয়ে শাহাদতবরণ করে। দিনটি ছিল ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই শুক্রবার। বিকালে বাসার বারান্দা থেকে রাস্তায় সংঘর্ষ দেখতে গিয়ে নিচ থেকে ছোড়া গুলিতে আটতলায় গুলিবিদ্ধ হয় ছোট্ট আহাদ। ২০ জুলাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শাহাদতবরণ করে এই নিষ্পাপ শিশু। এখন ছেলে হত্যার বিচার চান বাবা আবুল হাসান।

সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবুল হাসান বলেন, শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দে ঘুম ভেঙে যায় আহাদের। আমাদের ১১ তলা ভবনের নিচের রাস্তা থেকে আসছিল ওই আওয়াজ। আমরা তখন সাততলার ফ্ল্যাটে থাকতাম। ঘুম থেকে উঠে আহাদ বারান্দায় ছুটে গিয়ে বলল, বাবা বাবা দেখো, নিচে কী হচ্ছে! আমি আর আমার স্ত্রী কোহিনূর আক্তার সুমি বারান্দায় গিয়ে আহাদের পাশে দাঁড়াই। নিচে তখন সংঘর্ষ চলছে। এক পাশে আন্দোলনরত ছাত্ররা, অন্য পাশে আওয়ামী লীগের লোকজনÑছাত্রলীগ, যুবলীগ আর শ্রমিক লীগের কর্মীরা। একে অন্যকে লক্ষ্য করে ছুড়ছিল ইটপাটকেল। এ সময় গুলির শব্দ আর সাউন্ড গ্রেনেডের বিকট আওয়াজে কেঁপে ওঠে চারপাশ। হঠাৎ একটি গুলি এসে সোজা আমার ছেলের ডান চোখে বিদ্ধ হলে সে আমার সামনেই লুটিয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শহীদ আহাদের বাবা বলেন, এরপর রক্তমাখা ছেলেকে কোলে নিয়ে কোনোভাবে ছুটে যাই ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সে পথও সহজ ছিল না। তখন শহরজুড়ে আতঙ্ক। মূল সড়ক এড়িয়ে গলিপথ ধরে রিকশায় করে হাসপাতালে পৌঁছাই। এরপর সেখানে ভর্তি করা হয় আহাদকে। আইসিইউতে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। কিন্তু তার অবস্থা এতটাই জটিল ছিল যে, ব্রেনে গুলি আছে কি না, তা নিশ্চিত করতে সিটিস্ক্যানও করা যায়নি। কারণ স্ক্যান করতে হলে লাইফ সাপোর্ট খুলতে হতো, যা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পরে এক্স-রেতে দেখা যায়, গুলিটি ওর মাথায় বিঁধে আছে। পরদিন ২০ জুলাই রাত সাড়ে ৮টা থেকে ৯টার মধ্যে ডাক্তার এসে জানান, আহাদ আর নেই।

বাকরুদ্ধ হাসান বলেন, ২১ জুলাই বেলা ৩টার দিকে ময়নাতদন্ত শেষে ছেলের লাশ নিয়ে গ্রামের বাড়ি ফরিদপুরে চলে যাই। সেখানে পুখুরিয়া গ্রামে দাফন করা হয় তাকে।

শহীদ আহাদের বাবা আবুল হাসান সরকারি চাকরিজীবী। সন্তান হারানোর পর রায়েরবাগ এলাকা যেন তার কাছে বিভীষিকাময় হয়ে দাঁড়ায়। ওই এলাকা ছেড়ে এখন তিনি থাকেন মিরপুরের একটি সরকারি স্টাফ কোয়ার্টারে। এলাকা ছাড়লেও শহীদ সন্তানের স্মৃতি তাকে তাড়া করে ফেরে প্রতিনিয়ত।

আমার দেশ-এর সঙ্গে আলাপকালে গত রোববার আবুল হাসান বলেন, মনের অবস্থা বোঝানোর ভাষা নেই। সন্তানহারা হওয়ার যন্ত্রণা কাউকে বোঝানো সম্ভব নয়।

ছোট ছেলেকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন ছিল আবুল হাসানের। বড় ছেলে মেহরাজ হাসান দিহান একটি হাফেজি মাদরাসায় পড়ে। আহাদকেও হাফেজ বানানোর স্বপ্ন দেখতেন তিনি।

এখন তিনি চান তার নিষ্পাপ শিশুসন্তান হত্যার বিচার। কিন্তু এ নিয়ে হতাশ আবুল হাসান। আমার দেশকে তিনি জানান, তার সন্তান হত্যায় অজ্ঞাতনামা আসামি করে যে মামলা হয়েছিল, তা ইতোমধ্যে খারিজ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। থানা থেকে জানানো হয়েছিল, তিনি ইচ্ছা করলে নতুন করে মামলা করতে পারেন। কিন্তু আবুল হাসান নতুন করে মামলার ঝুঁকি নিতে চান না। কারণ মামলায় যাদের আসামি করা হবে, তারা জামিনে বের হয়ে তার জীবন হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

তিনি বলেন, একটি নিষ্পাপ শিশুর হত্যাকারীদের খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারের। আমি এ হত্যার বিচার চাই। কিন্তু তা সরকারকে করতে হবে

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন