নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে বেশিরভাগ দলের ‘না’, কমিশনের ছাড়

নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে বেশিরভাগ দলের ‘না’, কমিশনের ছাড়

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রথম পর্বের আলোচনায় ঐকমত্য হওয়া বিষয়গুলোর একটি তালিকা দলগুলোর কাছে পাঠিয়েছে ঐকমত্য কমিশন। সব দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে আজ বৃহস্পতিবারের মধ্যেই জুলাই সনদের খসড়া চূড়ান্ত করতে চায় কমিশন।

বুধবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে দ্বিতীয় ধাপের ২২তম দিনের সূচনা বক্তব্যে এ তথ্য জানান কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ।

বিজ্ঞাপন

আলী রীয়াজ বলেন, আলোচনা দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে বুধবার সন্ধ্যা কিংবা প্রয়োজন হলে বৃহস্পতিবারও আমরা একটি চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করতে চাই।

ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে প্রথম পর্বের আলোচনায় (২০ মার্চ থেকে ১৯ মে) ৪৫টি অধিবেশনে ৩৫টি রাজনৈতিক দল ও জোট অংশ নেয়। এতে সংবিধান, নির্বাচনব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, জনপ্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কারের ৬২টি ক্ষেত্রে একমত হয় দলগুলো।

সংবিধান সংস্কার

আইন সভা গঠনে একমত ৩০টি দল, উচ্চকক্ষের সদস্যদের যোগ্যতা ও অযোগ্যতায় একমত ২৪টি দল, জাতীয় সংসদে নারী আসনের বিধানে একমত ১৯টি দল, ডেপুটি স্পিকার পদে বিরোধী দল থেকে মনোনয়নে একমত ২৯টি দল, সংসদের কমিটি ও সদস্যদের অধিকার নির্ধারণের জন্য আইন প্রণয়নে একমত ২৪টি দল। এছাড়া রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়ায় একমত ২৮টি দল, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা ‘বাংলা’য় একমত ৩০টি দল, বাংলাদেশের নাগরিকদের পরিচয়ে একমত ৩১টি দল, সংবিধান বিলুপ্তি ও স্থগিতকরণ ইত্যাদি অপরাধের ক্ষেত্রে ২৮টি দল একমত, সব সম্প্রদায়ের সহাবস্থান ও মর্যাদায় ৩৩টি দল একমত, মৌলিক অধিকারগুলোর তালিকা সম্প্রসারণে ৩১টি দল একমত। আন্তর্জাতিক চুক্তি আইন সভায় অনুমোদনে একমত ২৩টি দল, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর নির্বাচনে ২৮টি দল একমত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় একমত ২৭টি দল, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অধীন ন্যস্ত করায় ২৭টি দল একমত, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব তহবিল সংগ্রহে ২৪টি দল একমত, জেলা সমন্বয় কাউন্সিল প্রতিষ্ঠায় ২৫টি দল একমত এবং ক্রান্তিকালীন ও অস্থায়ী বিধানাবলিতে ২৩টি দল একমত হয়েছে।

নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার

তথ্য অধিকার আইনের আওতায় রাজনৈতিক দলের বিষয়ে ২৪টি দল একমত হয়েছে।

বিচার বিভাগ সংস্কার

আপিল বিভাগের বিচারক সংখ্যায় ৩০টি দল একমত, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগে ২৬টি দল একমত, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ কমিশনসংক্রান্ত বিধানে ২৯টি দল একমত, বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় ৩২টি দল একমত এবং বিচারকদের জন্য পালনীয় আচরণবিধিতে ৩১টি দল একমত হয়েছে। সাবেক বিচারপতিদের জন্য পালনীয় আচরণবিধিতে ২১টি দল একমত, বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণে ৩১টি দল একমত, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় প্রতিষ্ঠায় ৩১ দল একমত, স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠায় ২৯টি দল একমত, স্বতন্ত্র ফৌজদারি তদন্ত সার্ভিস প্রতিষ্ঠায় ৩০টি দল একমত, বিচার বিভাগের জনবল বৃদ্ধির ক্ষেত্রে ৩২টি দল একমত। এছাড়া জাতীয় আইনগত সহায়তা প্রদান সংস্থাকে অধিদপ্তরে রূপান্তরে ৩০টি দল একমত, বিচারক ও সহায়ক কর্মচারীদের সম্পত্তির বিবরণে ২৮টি দল একমত, আদালত ব্যবস্থাপনা সংস্কার ও ডিজিটাইজ করায় ৩২টি দল একমত, কতিপয় আইন রহিতকরণ ও সংশোধনে ৩১টি দল একমত, আইনজীবীদের আচরণবিধির ক্ষেত্রে ২৬টি দল একমত, আইনজীবী সমিতি নির্বাচনে দলীয় রাজনীতির প্রভাব বিলোপে ২৫টি দল একমত, বিচারকদের রাজনৈতিক আনুগত্যের ক্ষেত্রে ৩২টি দল একমত হয়েছে।

জনপ্রশাসন সংস্কার

গণহত্যা ও ভোট জালিয়াতির সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে ৩২টি দল একমত, স্বাধীন ও স্থায়ী জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠনে ২৯টি দল একমত, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯-এর সংশোধনে ৩২টি দল একমত, অফিসিয়াল সিক্রেট অ্যাক্ট, ১৯২৩ সংশোধনে ২৭টি দল একমত, কুমিল্লা ও ফরিদপুর নামে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ গঠনে ২৮টি দল একমত এবং স্বতন্ত্র ভূমি আদালত স্থাপনে ২৫টি দল একমত হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন সংস্কার

সাংবিধানিক ও আইনগত ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সংবিধান সংশোধনে ৩০টি দল একমত, দুর্নীতিবিরোধী কৌশলপত্র প্রণয়নে ৩০টি দল একমত, বৈধ উৎসবিহীন আয়কে বৈধতাদানের চর্চা বন্ধ করায় ৩২টি দল একমত, রাষ্ট্রীয় ও আইনি ক্ষমতার অপব্যবহার রোধে সুবিধাভোগী মালিকানাসংক্রান্ত আইন প্রণয়নে ৩১টি দল একমত, উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি ও অর্থপাচার রোধে আইন প্রণয়নে ২৯টি দল একমত, নির্বাচনি অর্থায়নে স্বচ্ছতা ও শুদ্ধাচার নিশ্চিত করায় ২৫টি দল একমত। এছাড়া পরিষেবা খাতের কার্যক্রম ও তথ্য অটোমেশন করায় ২৯টি দল একমত, বেসরকারি খাতের দুর্নীতিকে শাস্তির আওতায় আনার ক্ষেত্রে ৩১টি দল একমত, কমন রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ডসের বাস্তবায়নে ৩০টি দল একমত, দুদক কমিশনারের সংখ্যা বৃদ্ধি করায় ২৯টি দল একমত, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন সংশোধনে ২৬টি দল একমত। দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনারদের মেয়াদের ক্ষেত্রে ২৫টি দল একমত, দুদক বাছাই কমিটির নাম পরিবর্তনে ৩১টি দল একমত, দুদক বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি গঠনে ২৫টি দল একমত, বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি কর্তৃক দুদক কমিশনার নিয়োগের অনুসরণীয় পদ্ধতির ক্ষেত্রে ২৭টি দল একমত, বাছাই ও পর্যালোচনা কমিটি কর্তৃক দুদকের কার্যক্রম পর্যালোচনার পদ্ধতির ক্ষেত্রে ৩১টি দল একমত, দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ধারা ৩২(ক) বিলুপ্ত করায় ২৭টি দল একমত, আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ৩০৯-এর সংশোধনে ২৭টি দল একমত, ওপেন গভর্নমেন্ট পার্টনারশিপের পক্ষভুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে ২৩টি দল একমত হয়েছে।

নারী প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে বেশিরভাগ দলের ‘না’, কমিশনের ছাড়

জাতীয় সংসদের নারী আসন ১০০-তে উন্নীত করার পক্ষে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রথমে মতৈক‍্য হলেও সরাসরি নির্বাচনে নারীর প্রতিনিধিত্বের বিপক্ষে বেশিরভাগ দল। তাদের অনাগ্রহের কারণে জাতীয় ঐকমত‍্য কমিশন কয়েক দফা প্রস্তাব সংশোধন করলেও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

এদিকে, সংলাপে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, সংস্কারের প্রস্তাবগুলোর আইনগত ভিত্তি না থাকলে তা বাস্তবায়নযোগ্য হবে না। জনগণের কাছেও এর কোনো মূল্য থাকবে না। তাতে আমরা সই করব না। কারণ জনগণের কাছে যার কোনো বাস্তব মূল্য নেই, এমন প্রস্তাবে সই করে লাভ কী?

জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র নিয়ে তৈরি হওয়া বিভ্রান্তি দূর করতে ব্যাখ্যা দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। বৈঠকের বিরতিতে দলটির সদস্য সচিব আখতার হোসেন বলেন, এ দুটি নথি এক নয়। জুলাই ঘোষণাপত্র হচ্ছে গত বছরের আগস্টের গণঅভ্যুত্থান এবং ৫ আগস্টের বিজয়ের একটি ঐতিহাসিক স্বীকৃতি, যার একটি আইনি ভিত্তি থাকা দরকার। অন্যদিকে জুলাই সনদ হচ্ছে রাজনৈতিক সংস্কারের বিষয়ে ঐকমত্যের ভিত্তিতে কমিশনে আলোচিত প্রস্তাবগুলোর একটি বাস্তবায়নযোগ্য রূপরেখা।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন