ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতনের দেড় বছর পর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে প্রকাশ্যে শোডাউন করেছেন আওয়ামীপন্থি সাংবাদিকরা। জুলাই বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর প্রথমবারের মতো প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে মানববন্ধন করেন তারা।
এ সময় তাদের ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’সহ নানা স্লোগান দিতে দেখা যায়। নতুন সরকার গঠনের চার দিনের মাথায় গতকাল শনিবার আওয়ামীপন্থি সাংবাদিকরা এ শোডাউন করেন। গত কয়েকদিনে রাজধানীসহ দেশের বেশ কয়েকটি স্থানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা দলীয় কার্যালয়ের তালা খুলে মিছিল ও স্লোগান দিয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের আওয়ামী অংশের সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপু ও সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেনের নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন সাংবাদিক গতকাল ভোরে প্রেস ক্লাবের সামনের ফুটপাতে জড়ো হন। সেখানে তারা সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য মানববন্ধন করেন বলে জানা গেছে। পরে এসব নেতৃবৃন্দ একুশে ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গিয়ে আওয়ামীপন্থি ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) নামে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাদের কয়েকজন আবারো প্রেস ক্লাবে ফিরে আসেন। এ সময় তারা প্রেস ক্লাবের নিচ তলায় অবস্থিত ডিইউজে কার্যালয়ের সামনে এসে স্লোগান দেন। স্লোগান নিয়ে তারা ডিইউজের বন্ধ কার্যালয় খুলে দেওয়ার দাবি তোলেন। এসব ছবি ও ভিডিও ফেসবুকে শেয়ার করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা গেছে তাদের।
বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) আওয়ামী অংশের সাবেক মহাসচিব ও বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানকারী শাবান মাহমুদ প্রেস ক্লাবের সামনের মানববন্ধনের ছবি পোস্ট দিয়ে বলেন, এই কর্মসূচি আশার আলো জাগিয়েছে। এদিকে তাদের কর্মসূচি নিয়ে অনেককে ক্ষোভ প্রকাশও করতে দেখা গেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। কেউ কেউ এসব ফ্যাসিস্ট সাংবাদিককে চিহ্নিত করে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে বহিষ্কারসহ সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি তোলেন।
উল্লেখ্য, চব্বিশের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর বিক্ষুব্ধ জনতা ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের আওয়ামী অংশের অফিস ভাংচুর করে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এরপর থেকে গত দেড় বছর ধরে কার্যালয়টি তালাবদ্ধ।
শহীদ মিনারের একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আওয়ামী সাংবাদিকরা আসতে শুরু করেন কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। শ্রদ্ধা জানানোর সারিতে না দাঁড়িয়ে তারা বিচ্ছিন্নভাবে উল্টো দিক দিয়ে শহীদ বেদীর দিকে গিয়ে জড়ো হন এবং তারা একত্র হয়ে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। সেখানে একাধিক ছবিও তোলেন তারা। এরপর দ্রুত সরে পড়েন। এ সময় তারা কোনো স্লোগান দেননি।
পরে আওয়ামীপন্থি ডিইউজের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং তালাবদ্ধ কার্যালয় খোলাসহ বন্দি সাংবাদিকদের মুক্তি দাবি করা হয়। এতে বলা হয়, শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে প্রভাতফেরি সহকারে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পদযাত্রা করে ডিইউজে। এর আগে সংগঠনটির উদ্যোগে সকালে জাতীয় প্রেস ক্লাবে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। ডিইউজে সভাপতি সাজ্জাদ আলম খান তপুর সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক আকতার হোসেনের সঞ্চালনায় এ মানববন্ধন হয়। এতে বক্তারা ইউনূসের শাসনামলে তালাবদ্ধ করা কার্যালয় খোলা এবং মিথ্যা মামলায় আটক সাংবাদিকদের মুক্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে, তিন শতাধিক সাংবাদিকের বিরুদ্ধে দায়ের করা হত্যা মামলা প্রত্যাহারসহ চাকরিচ্যুত সাংবাদিকদের পুনর্বহালের দাবি জানান।
এসময় উপস্থিত ছিলেন আওয়ামীপন্থি ডিইউজের সাবেক সভাপতি আবু জাফর সূর্য ও কুদ্দুস আফ্রাদ, সহ-সভাপতি নজরুল ইসলাম মিঠু, অর্থ সম্পাদক সোহেলী চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম মুজতবা ধ্রুব, আইন সম্পাদক আসাদুর রহমান, দপ্তর সম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস চৌধুরী, নির্বাহী সদস্য সাজেদা হক, রারজানা সুলতানা। আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাবেক সহ-সভাপতি আজমল হক হেলাল, সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ জামাল, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাবেক সভাপতি জাকির হোসেন ইমন, ডিইউজের সাবেক আইন সম্পাদক সাইফ আলী, বরিশাল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি স্বপন খন্দকার, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিলের সাংগঠনিক সম্পাদক শহীদ রানা, সিনিয়র সাংবাদিক রেজাউল করিম ও জাহাঙ্গীর খান বাবু, সাংবাদিক রমজান আলী, রহিমা খানম, জয়নুল আবেদীন বাপ্পি, নিশাত বিজয়, উজ্জল মোল্যা, গাজী তুষার আহমেদ ইমরানুল আজিম চৌধুরী ইমু, এস এম রাসেল আহমেদ, মাহবুবুল হক।
মুজিববাদের শিকড় উপড়ে ফেলা হবে : জেআরজেএ
এদিকে, নতুন সরকারের সময় আওয়ামী সাংবাদিকদের এমন শোডাউনের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে জুলাই রেভলুশনারি জার্নালিস্টস অ্যালায়েন্স (জেআরজেএ)। সংগঠনটি বলেছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছয়জন সাংবাদিকসহ দেড় হাজার ছাত্র-জনতার রক্তের বিনিময়ে যে নতুন বাংলাদেশ আমরা পেয়েছি, তা আবারও কলঙ্কিত করার চেষ্টা করেছে সাংবাদিক পরিচয়ে কতিপয় দুর্বৃত্ত। ২১ ফেব্রুয়ারি মহান শহীদ দিবসে জাতীয় প্রেস ক্লাব ও শহীদ মিনারকে আবারও কলঙ্কিত করার চেষ্টা করছে কিছু ‘সাংবাদিক পরিচয়ধারী’ গণহত্যাকারী।
জেআরজেএ-এর সাধারণ সম্পাদক ইসরাফিল ফরাজী বলেন, মুজিববাদী স্লোগান দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে) এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) প্রেস ক্লাব দখলের অপচেষ্টা করেছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট বাংলাদেশ থেকে মুজিববাদের কবর রচিত হয়েছে। সে মুজিববাদকে পুনরায় জাতীয় প্রেস ক্লাব দখলের উদ্দেশ্যে কাজে লাগাতে চাইছে গণহত্যাকারীরা।
জেআরজেএ বলেছে, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই— ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে একটি গণতান্ত্রিক যাত্রা শুরু হয়েছে। এই গণতান্ত্রিক যাত্রাকে দুর্বলতা ভেবে দেশে আবারও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছে আওয়ামী লীগ এবং তার সহযোগী সংগঠনগুলো; তার জবাব বাংলাদেশের মাটিতেই দেওয়া হবে। যারা ২১ ফেব্রুয়ারির দিনে জাতীয় প্রেস ক্লাবের ভেতরে মুজিববাদী স্লোগান দিয়েছে এবং একই সঙ্গে পবিত্র শহীদ মিনারে মুজিববাদী স্লোগান দিয়ে বেদীতে ফুল দিয়েছে—তাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
অধিকাংশই গণহত্যা মামলার আসামি, দ্রুত গ্রেপ্তার দাবি
জেআরজেএ’র বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই— এই সরকার জুলাইয়ের হাজারো ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে; এই রক্তের সঙ্গে বেইমানি করার চেষ্টা করলে তার জবাব জুলাইয়ের কোটি কোটি ছাত্র-জনতা দেবে। আজ যারা প্রেস ক্লাবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করেছে, তাদের অধিকাংশই গণহত্যা মামলার আসামি। আমরা দ্রুত এসব খুনির গ্রেপ্তারের দাবি জানাচ্ছি।
এতে আরো বলা হয়, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সভাপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলতে চাই— যারা প্রেস ক্লাবে মুজিববাদী স্লোগান দিয়েছে, তাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করুন। একই সঙ্গে দাবি করছি— তাদের মধ্যে যদি কেউ এখনো প্রেস ক্লাবে সদস্য থেকে থাকে, তাদের সদস্যপদ বাতিল করুন। কোনো খুনিকে আমরা জাতীয় প্রেস ক্লাবে দেখতে চাই না।
জাতীয়তাবাদ ও ইসলামী শক্তির যে ঐক্য আমরা ৫ আগস্টের আগে ও পরে লক্ষ্য করেছি, সেই ঐক্য ধরে রেখে স্বৈরাচার ও খুনিদের প্রতিহত করার দাবি জানাই। ফ্যাসিবাদবিরোধী যে কোনো কাজে জুলাই রেভলুশনারি জার্নালিস্টস অ্যালায়েন্স প্রেস ক্লাবের সঙ্গে থাকবে, ইনশাআল্লাহ।
ছাত্র-জনতার জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পতিত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। দলটির নেতাকর্মীরা অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাঝেমধ্যে দু-একটি ‘দশ কদম’ মিছিল করে পালিয়ে গেলেও নতুন সরকারের সময়ে দলীয় অফিসগুলো খোলার চেষ্টা করছে। দেড় বছর পর গত শুক্রবার ধানমন্ডিতে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কার্যালয়ের গেটের সামনে শেখ মুজিবুর রহমানের ছবি রেখে প্রকাশ্যে স্লোগান দেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের টানা ১৫ বছরের শাসনের পতন হয়। সেই থেকে বন্ধ রয়েছে আওয়ামীপন্থি সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো। আওয়ামী লীগ এবং এর সব অঙ্গসংগঠন, সহযোগী সংগঠন ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের নেতা-কর্মীদের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তাদের যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয় গত বছরের ১২ মে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপের পর মাঝেমধ্যে কয়েক মিনিটের জন্য ঝটিকা মিছিল করে আবার পালিয়ে যেতে দেখা গেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের। পরে ফেসবুকে শেয়ার করা সেসব মিছিলকে ‘দশ কদম মিছিল’ আখ্যা দিতে দেখা গেছে।
তবে গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় বিএনপির স্থানীয় কিছু নেতাকে আওয়ামী লীগের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যায়, যা সামাজিকমাধ্যমে ভাইরালও হয়। এমনকি বিএনপি সরকার গঠন করার পর বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগের অফিস খুলে দেওয়ার অভিযোগও পাওয়া যায়। এর মধ্যেই খোদ রাজধানীতে আওয়ামী লীগ সভাপতির ধানমণ্ডির অফিসের সামনে শেখ মুজিবের ছবি রেখে স্লোগান দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এবার আওয়ামীপন্থি সাংবাদিকরাও সক্রিয় হলো।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

