এনডিএফের কর্মশালায় বক্তারা

স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়লেই হবে না, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে

স্টাফ রিপোর্টার

স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বাড়লেই হবে না, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে

অতীতের তুলনায় চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্যখাতে প্রায় দ্বিগুণ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে এর প্রকৃত সুফল পেতে হলে জনগণের চিকিৎসা ব্যয় হ্রাস, দুর্নীতি রোধ, প্রশাসনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বরাদ্দকৃত অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চেলেঞ্জ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য খাতের বিশেষজ্ঞ, অর্থনীতিবিদ, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যসাংবাদিকরা।

তারা বলছেন, শুধু বড় বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না। সেই অর্থ সঠিক খাতে, সঠিক সময়ে এবং সঠিক পদ্ধতিতে ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে স্বচ্ছতা ও দক্ষতাও বাড়াতে হবে। অন্যথায় বড় বাজেটে স্বাস্থ্যখাতেও কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব হবে না।

বিজ্ঞাপন

বুধবার সকালে রাজধানীর বাংলামটরে ন্যাশনাল ডক্টরস ফোরামের (এনডিএফ) আয়োজনে ‘স্বাস্থ্য বাজেট ২০২৬-২৭’ শীর্ষক স্বাস্থ্য সাংবাদিক কর্মশালায় বক্তারা এসব কথা বলেন।

এনডিএফের দপ্তর সম্পাদক ডা. জিয়াউল হকের সঞ্চালনায় ও সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. একেএম ওয়ালিউল্লাহর সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ।

কর্মশালায় কি-নোট স্পিকার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক। প্রধান আলোচক ছিলেন একই বিভাগের আরেক অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ। এছাড়াও বক্তব্য রাখেন ন্যাশনাল হেলথ অ্যালায়েন্সের (এনএইচএ) আহ্বায়ক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শাদরুল আলম।

কর্মশালায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. রুমানা হক।

তিনি বলেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা জিডিপির ১.০১ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ৭.৪ শতাংশ। গত এক দশকের মধ্যে এটি সর্বোচ্চ বরাদ্দ। বাজেটে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, রোগ প্রতিরোধ, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য, পুষ্টি, টিকাদান কর্মসূচি এবং অসংক্রামক রোগের স্ক্রিনিংয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

ড. রুমানা হক বলেন, বর্তমানে দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৭৯ শতাংশ জনগণকে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে একটি অসুস্থতা বহু পরিবারকে আর্থিক সংকটে ফেলে দেয়। দ্রুত নগরায়নের সঙ্গে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় চাপ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি যেভাবে বাড়ছে, তার প্রভাব স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপরে এসেও পড়বে।

তিনি আরও বলেন, ৫ হাজার চিকিৎসক এবং ১ লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা, ই-হেলথ কার্ড চালু, কেয়ারগিভার প্রশিক্ষণ এবং নার্সিং ও মিডওয়াইফারি শিক্ষার সম্প্রসারণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে সহায়ক হবে।

ড. রুমানা হক বলেন, এবারের বাজেটের অন্যতম ইতিবাচক দিক হলো চিকিৎসা ব্যয় কমাতে বিভিন্ন কর ছাড়ের উদ্যোগ। হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত স্টেন্টের ওপর কর কমানো হয়েছে, ফলে রোগীদের ব্যয় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমতে পারে। একইভাবে চোখের অপারেশনে ব্যবহৃত লেন্স, কিডনি ডায়ালাইসিসের যন্ত্রপাতি এবং ক্যানসারের ওষুধ তৈরির কাঁচামালের ওপর কর কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। অতীতে দেখা গেছে, ঘোষিত বাজেটের বড় অংশ বাস্তবায়িত হয়নি কিংবা সংশোধিত বাজেটে বরাদ্দ কমে গেছে। ফলে এবারের বরাদ্দও কতটা বাস্তবায়িত হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

যশোর-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. মোসলেহ উদ্দিন ফরিদ বলেন, স্বাস্থ্য খাতে টেন্ডার ব্যবস্থার সংস্কার অত্যন্ত জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে টেন্ডার বারবার হাতবদল হওয়ায় প্রকল্পের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যয় বৃদ্ধি পায়।

তিনি বলেন, চৌগাছা স্বাস্থ্যসেবায় মডেল দেখিয়েছে যে জনসম্পৃক্ততা থাকলে সীমিত সম্পদ দিয়েও কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রশংসিত এই মডেলের মূল ভিত্তি হলো জনগণের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় সমস্যার দ্রুত সমাধান।

ডা. ফরিদ বলেন, হাসপাতালগুলোকে নির্দিষ্ট মানদণ্ডের ভিত্তিতে অধিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং রোগীসেবার ভিত্তিতে অর্থায়ন চালু করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার মান আরও উন্নত হবে। তিনি মনে করেন, এসডিজি অর্জনের জন্য প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানো জরুরি।

কর্মশালার সভাপতির বক্তব্যে এনডিএফের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. এ কে এম ওয়ালীউল্লাহ বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি, দালালচক্র এবং কিছু অসাধু গোষ্ঠীর প্রভাব এখনো বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে হাসপাতালের নিম্নস্তরের কর্মচারীদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক প্রশাসনিক কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে সাধারণ রোগীরা হয়রানির শিকার হন এবং কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হন।

যশোরের চৌগাছা উপজেলা স্বাস্থ্যসেবার একটি সফল উদাহরণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, স্থানীয় জনগণ, শিক্ষক, সাংবাদিক, ব্যবসায়ী ও পেশাজীবীদের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে সেখানে একটি কার্যকর স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে।

কর্মশালায় অনলাইনে যুক্ত হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আবদুল হামিদ বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বড় বরাদ্দ দেওয়া হলেও দুর্নীতি, স্থানীয় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রিতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না।

তিনি বলেন, সরকারি হাসপাতালগুলোতে এখনো পরিচ্ছন্নতা, ওষুধ সরবরাহ এবং রোগীবান্ধব সেবার ঘাটতি রয়েছে। হাসপাতাল ব্যবস্থাপকদের আর্থিক ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বাড়াতে হবে। একইসঙ্গে ওষুধ সরবরাহ ব্যবস্থা এবং অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।

ড. হামিদ বলেন, বাজেটে রাখা বিশাল থোক বরাদ্দ কার্যকরভাবে ব্যবহার করতে হলে দ্রুত প্রকল্প গ্রহণ ও অনুমোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থবছরের প্রথম তিন মাসের মধ্যে পরিকল্পনা শুরু না হলে বিপুল পরিমাণ অর্থ অব্যবহৃত থেকে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

তিনি মাতৃস্বাস্থ্য, কিডনি, ক্যানসার ও হৃদরোগীদের জন্য বিশেষ সুরক্ষা কর্মসূচি চালুরও প্রস্তাব দেন। পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনায় আহতদের জন্য বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে জরুরি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে সরকারি সহায়তা প্রদানের সুপারিশ করেন।

বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ বলেন, স্বাস্থ্য খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হলো প্রশাসনিক অদক্ষতা। বর্তমানে অনেক চিকিৎসক স্বাস্থ্য প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করলেও তাদের বড় অংশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। ফলে নীতি ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়।

তিনি বলেন, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া অর্থের একটি বড় অংশ প্রতি বছর অব্যবহৃত থেকে যায়। ২০২১ সালে উন্নয়ন বাজেটের বাস্তবায়ন হার ছিল মাত্র ৫৮ শতাংশ এবং ২০২২ সালে তা ৭৯ শতাংশে উন্নীত হলেও জাতীয় গড়ের চেয়ে অনেক কম। এই প্রবণতা বন্ধ করতে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

প্রতীক ইজাজ আরও বলেন, স্বাস্থ্য খাতকে দলীয় রাজনীতির বাইরে রাখতে হবে। স্থানীয় পর্যায়ের ছোট ছোট সমস্যাই জাতীয় পর্যায়ে বড় সংকটে রূপ নেয়। তাই সংসদ সদস্যসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের নিজ নিজ এলাকার হাসপাতালগুলোর কার্যক্রম নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

সর্বশেষ

এলাকার খবর
Loading...