আন্দোলনকে আইনবিরোধী আখ্যা দিয়ে কাজে যোগ না দিলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি এবং ছয়জনের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত শুরুর ঘোষণার পর আন্দোলন প্রত্যাহার করেছে এনবিআর ঐক্য পরিষদ।
গতকাল রোববার রাতে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক শেষে কর্মসূচি প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয় সংগঠনটি। এদিকে এনবিআর সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়নে উপদেষ্টা পরিষদের পাঁচ সদস্যকে নিয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার।
গত শনিবার থেকে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও ‘মার্চ টু এনবিআর’ কর্মসূচি পালন করে আসছিল ঐক্য পরিষদ। এ আন্দোলনের কারণে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে দেশের অর্থনীতিতে।
মূলত এনবিআর সংস্কারকে ঘিরে গত মে মাস থেকে আন্দোলন করে আসছে ঐক্য পরিষদ। কিন্তু সংস্কার বাদ দিয়ে সংস্থাটির চেয়ারম্যানের পদত্যাগের দাবিকেই মুখ্য দাবিতে পরিণত করে সংগঠনটি। ওই দাবিকে কেন্দ্র করে কলমবিরতি ও অবস্থান কর্মসূচির পর তারা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি শুরু করেছিল। চাকরিবিধি অনুযায়ী সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের আন্দোলনে অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকলেও দিনের পর দিন তারা এ আন্দোলন অব্যাহত রাখেন।
অপরদিকে গত দেড় মাসের অধিক সময় ধরে এ আন্দোলন চলমান থাকলেও সরকার এটি সমাধান করতে কার্যত ব্যর্থ হয়। সময়মতো সঠিক উদ্যোগের পরিবর্তে বিভিন্ন সময় বিবৃতি দেওয়া ছাড়া সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। আন্দোলনকারীদের এ ধরনের একগুঁয়েমি ও সরকারের ব্যর্থতার কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়ে দেশের অর্থনীতি।
দেড় মাসের বেশি সময় ধরে এনবিআরে আন্দোলন চলমান থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করা হয়। এরপর এনবিআরের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুদক তদন্ত শুরুর কথা বলে। সরকারের পক্ষ থেকে নেওয়া এসব উদ্যোগের পর নিজেদের কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয় ঐক্য পরিষদ।
জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন আমার দেশকে বলেন, সরকার ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংকট সমাধানের কার্যত কোনো প্রচেষ্টা দেখা যায়নি। সংস্কারের মূল ফোকাস থেকে সরে গিয়ে আন্দোলনকারীরা এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণের বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে। কিছু অভিযোগের ভিত্তিতে একজনের অপসারণের দাবির বিষয়টি মারাত্মক। আর যদি তাদের দাবি সঠিকও হয়, তাহলে তারও নিয়ম রয়েছে। কিন্তু কোনো নিয়ম না মেনে দিনের পর দিন এভাবে আন্দোলন করার কোনো যৌক্তিকতা নেই।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ আমার দেশকে বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টিকে সঠিকভাবে সমাধানের চেষ্টা করা হয়নি। অপরদিকে আন্দোলনকারীরাও বাড়াবাড়ি করেছেন। আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম বন্ধ রেখে এ ধরনের আন্দোলন কোনো অবস্থায়ই গ্রহণযোগ্য নয়।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ধ্বংসস্তূপ থেকে এখনো পুরোপুরি বের হয়ে আসতে পারেনি দেশের অর্থনীতি। রেমিট্যান্স ও দেশের রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি থাকলেও বিনিয়োগে বড় ধরনের খরা চলছে। সরকারের রাজস্ব আদায়ের হার বড় ধরনের ঘাটতির মুখে রয়েছে। এ ছাড়া ভূরাজনৈতিক ও বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অস্থিরতার কারণেও দেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হচ্ছে। এ অবস্থায় অর্থবছরের শেষ সময়ে এসে সরকারের রাজস্ব আহরণের সঙ্গে জড়িত এ খাতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলন দেশের অর্থনীতির সংকটকে আরো গভীর করে তুলেছে।
শুধু আন্তর্জাতিক যাত্রীসেবা ব্যতীত সব ধরনের সেবা বন্ধ করে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলে বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল। গত শনিবার দেশের ১২টি ব্যবসায়ী সংগঠনের জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এনবিআর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আন্দোলনের কারণে দেশের অর্থনীতির ক্ষতির বিষয়টি তুলে ধরে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা প্রকাশ করা হয়। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বাবু বলেছিলেন, আন্দোলনের কারণে শুধু পোশাক খাতেই দৈনিক প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটেছে।
‘মার্চ টু এনবিআর’ ও ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির কারণে দেশের আমদানি-রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্রমে অচলাবস্থা তৈরি হয়। বন্ধ থাকে আমদানি-রপ্তানিপণ্যের শুল্কায়ন। পণ্য খালাস হয়নি। শুধু চট্টগ্রাম বন্দরেই নয়, দেশের সব স্থলবন্দর ও শুল্ক স্টেশনের কার্যক্রমও বন্ধ হয়ে যায়।
সরকারের হুঁশিয়ারি
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, গত দুই মাস ধরে আন্দোলনের নামে চরম দুর্ভোগ তৈরি করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার গ্রহণযোগ্য সমাধান না করে তারা আন্দোলনের নামে অনমনীয় অবস্থান নিয়ে ক্রমাগত দেশের অর্থনীতির ক্ষতি করে চলেছে। আইনবিরোধী ও জাতীয় স্বার্থবিধ্বংসী কর্মকাণ্ড থেকে সরে না এলে দেশের জনগণ ও অর্থনীতির সুরক্ষায় সরকার কঠোর হতে বাধ্য হবে।
৬ জনের বিরুদ্ধে দুদকের অনুসন্ধান
ঐক্য পরিষদের সভাপতি, সিনিয়র সহসভাপতিসহ পরিষদের পাঁচ নেতা এবং এক সদস্যের বিরুদ্ধে দুদকের কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলে জানিয়েছে দুদক। দুদকের পক্ষ থেকে বলা হয়, এনবিআরের কতিপয় অসাধু সদস্য ও কর্মকর্তা কর ও শুল্ক আদায়ের ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ঘুসের বিনিময়ে করদাতাদের কর ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। তারা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মালিক ও নিজেদের লাভে করের পরিমাণ কমিয়ে দিতেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
পাঁচ সদস্যের কমিটি গঠন
এনবিআর সংস্কারে জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী দুটি বিভাগ গঠনে করণীয় নির্ধারণে উপদেষ্টামণ্ডলীর পাঁচ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে সরকার। কমিটির সদস্যরা হলেনÑবিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেন।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


