ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনক

এম কে মনির, চট্টগ্রাম

ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিতে চট্টগ্রাম আক্রান্তের হার আশঙ্কাজনক

চট্টগ্রামে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। প্রতিদিন গড়ে ১১ জন করে এই রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। বছরের শুরুতে শহরে রোগী বেশি হলেও বর্ষা মৌসুমের শুরুতে রোগী বেড়েছে গ্রামে। চলতি মাসের প্রথম পাঁচ দিনেই ৫৭ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন। এর মধ্যে গত রোববার ২৪ ঘণ্টায় ১৮ জন আক্রান্ত হন। শুধু তাই নয় নগরীর আটটি ওয়ার্ডকে ডেঙ্গুর উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করেছে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয়। সম্প্রতি পরিচালিত এক জরিপে এসব এলাকার প্রতি চারটি বাড়ির একটিতে ডেঙ্গু মশার লার্ভা পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করা হয়।

লাফিয়ে বাড়তে থাকা ডেঙ্গু আক্রান্তের হার জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। পাশাপাশি সরকারি হাসপাতালগুলোর পরিকল্পনা, প্রস্তুতি ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় বাসিন্দারা। নগরবাসীর অভিযোগÑ নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডে নিয়মিত ডেঙ্গু ওষুধ ছিটানো হচ্ছে না। মশার উপদ্রব বাড়লেও এলাকাভিত্তিক ওষুধ প্রয়োগের হার বাড়েনি। কোনো কোনো এলাকায় এক মাসেও প্রয়োগ করা হয়নি ওষুধ কিংবা ফগার মেশিন।

বিজ্ঞাপন

যদিও জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় ও চসিক সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রত্যেক সরকারি হাসপাতালে আলাদা ডেঙ্গু কর্নার চালু করা হয়েছে। বাড়ানো হয়েছে কিট ও বেডের সংখ্যাও। রোগীদের অগ্রাধিকার দিয়ে চিকিৎসা সেবা জোরদার করা হচ্ছে। এছাড়াও প্রত্যেক এলাকায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে জনগণকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) বলছে, সব এলাকায় পর্যাপ্ত পরিমাণে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে। জনবল বাড়ানোর পাশাপাশি উন্নতমানের ওষুধ প্রয়োগ করা হচ্ছে। তবে সময় বুঝে ওষুধ ছিটাতে হয় বলে অনেকেই বিষয়টি নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা রাখেন।

জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, চলতি জুলাইয়ের প্রথম দিন ৯ জন আক্রান্ত হন। পরের দিন ১০ জন, ৩ জুলাই ৭ ও ৪ জুলাই ১৩ এবং ৫ জুলাই ১৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২ জুলাই পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে ৩৫৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে মহানগরে ১৩১ জন আর জেলায় ১৪৪ জন। বাকি ৮০ জন অন্যান্য জেলার রোগী।

এ বছরের জানুয়ারিতে আক্রান্ত হন ৬৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২২, মার্চে ২০, এপ্রিলে ২৯, মে-তে ৩৭, জুনে ১২২ এবং চলতি মাসের পাঁচদিনে ৫৭ জন আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সেই হিসাবে দেখা যায়, চলতি বছরের বিগত মাসগুলোর তুলনায় জুলাইয়ের শুরুতেই রোগী বেড়েছে প্রায় তিনগুণ। যেখানে গড়ে প্রতিদিন ১১ জন আক্রান্ত হচ্ছেন।

জেলা সিভিল সার্জন অফিস জানায়, বর্তমানে ৫১ জন রোগী নগরীর বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সবচেয়ে বেশি রোগী রয়েছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে ২৮ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। আর উপজেলা পর্যায়ে সীতাকুণ্ডে ডেঙ্গু রোগী সবচেয়ে বেশি। উপজেলাটিতে এখন পর্যন্ত ৩৫ জন ও দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাউজানে ১৭ ও মিরসরাই উপজেলায় ১৫ জন আক্রান্ত হয়েছেন।

চলতি বছর চট্টগ্রামে আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১৯৭, নারী ৯৩ ও শিশু ৬৫ জন। গত পাঁচ মাসে একজনের মৃত্যু হয়েছে চট্টগ্রামে। তবে গত তিন মাসে শহরের তুলনায় গ্রামেই এখন রোগী বেশি।

জানা যায়, গত বছর চট্টগ্রামে চার হাজার ৮৬৪ আক্রান্তের মধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়। চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ মৃত্যু ছিল ২০২৩ সালে। ওই বছর ১৪ হাজার ৮৭ জন ডেঙ্গু রোগীর মধ্যে ১০৭ জনের মৃত্যু হয়।

এদিকে, চট্টগ্রাম বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর নগরের আটটি ওয়ার্ডকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে ঘোষণা করেছে। ‘ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার বাহক এডিস মশার সার্ভে’ শীর্ষক জরিপে বলা হয়, নগরীর জরিপ করা প্রতিটি ওয়ার্ডেই এডিস মশার উপস্থিতি রয়েছে। তবে ১০ নম্বর উত্তর কাট্টলী, ৩ নম্বর পাহাড়তলী, ২ নম্বর আলকরণ, ১৭ নম্বর পশ্চিম বাকলিয়া, ১৯ নম্বর দক্ষিণ বাকলিয়া, ৩৯ নম্বর দক্ষিণ বালুচরা, ৩৪ নম্বর পাথরঘাটা এবং ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা এই আটটি ওয়ার্ডকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ওই জরিপে দেখা গেছে নগরীর ৪১টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৮টি ওয়ার্ডে ৩৭০টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৯৯টি বাড়িতে, অর্থাৎ ২৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ বা প্রতি চারটি বাড়ির একটি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। জরিপ চলাকালে ১১৪টি এডিস মশার লার্ভা পজিটিভ কনটেইনারও শনাক্ত করা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শনাক্ত হওয়া এডিস মশার ৭০ থেকে ৮০ শতাংশই এডিস ইজিপটাই প্রজাতির, যা ডেঙ্গু ভাইরাসের প্রধান বাহক। বাকি ২০ থেকে ৩০ শতাংশ এডিস এলবোপিকটাস, যা ডেঙ্গুর দ্বিতীয় প্রধান বাহক হিসেবে পরিচিত।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা কমান্ডার ইখতিয়ার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, সাতটি জোনে আমরা প্রতিদিন নগরে মশার ওষুধ ছিটাচ্ছি। এই বিভাগের জনবল ১৬০ জন থেকে ২০০ জন করা হয়েছে। পুরোনো ও অকেজো সব ফগার মেশিন মেরামত করে চালু করা হয়েছে। মশার প্রজননস্থান ধ্বংসে চসিক কাজ করে যাচ্ছে। কোথাও কোনো অভিযোগ থাকলে আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেব।

বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. সেখ ফজলে রাব্বী জানান, তিনটি কর্মপন্থা ঠিক করেছি। আমরা চসিককে প্রতিবেদনটি দিয়েছি। তারা তাদের আলোকে কাজ করবে। আমরা বলেছি কার্যকর এবং মানসম্মত ওষুধের প্রয়োগ যেন বেগবান করা হয়। সেবা সংস্থাগুলোর জনবলকে আমরা প্রশিক্ষিত করে তুলছি। হাসপাতালে পর্যাপ্ত কীট, মশারি, কর্নার তৈরি করেছি। আমরা চাই যে কোনো রোগীর চিকিৎসা যেন উপজেলা পর্যায়ে শেষ হয়। জনসাধারণের কাছে আহ্বান জানাই তারা যেন নিজ বাড়ির এডিশ মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন