আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

জ্বালানি সংকট

সরকারের বারবার আশ্বাসেও থামছে না অস্থিরতা

ইসমাঈল হোসাইন সোহেল

সরকারের বারবার আশ্বাসেও থামছে না অস্থিরতা

ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া মার্কিন-ইসরাইল যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল প্রায় ভেঙে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়াসহ বিশ্বব্যাপী নানা ধরনের সংকট চলছে। জ্বালানি নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে। জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে বারবার আশ্বস্ত করা হলেও এ নিয়ে অস্থিরতা থামছেই না।

জ্বালানি তেল নিয়ে পেট্রোল পাম্পগুলোতে হাহাকার চলছে। কিন্তু একের পর এক জ্বালানি তেলের ট্যাংকার এনেও সেই অবস্থার সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে সরকার। মাঠের পরিস্থিতির সঙ্গে সরকারের উদ্যোগের সমন্বয় না হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। সেই সঙ্গে সরকারের বিভিন্ন দপ্তর ও সংস্থা এবং পেট্রোল পাম্প মালিক সমিতির নেতাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতাসহ যথাযথ তদারকির অভাবকে দায়ী করেছেন তারা।

বিজ্ঞাপন

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় আমেরিকা ও ইসরাইল। পরে ইরানের পাল্টা জবাবের জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ জ্বালানি পরিবহনের রুট হরমুজ প্রণালিতে কঠোরতা আরোপ করে ইরান। এতে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। আতঙ্কে স্বাভাবিক চাহিদার চেয়ে বেশি করে জ্বালানি তেল কেনার প্রবণতা শুরু হয় যানবাহনের চালক ও মালিকদের মধ্যে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার রেশনিং পদ্ধতি চালু করে। অবস্থা কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে দাবি করে একপর্যায়ে এ পদ্ধতিও প্রত্যাহার করা হয়। কিন্তু এখনো পেট্রোল পাম্পগুলোতে যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।

জ্বালানি সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় গতকাল শুক্রবার অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্টের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের উপরে উঠেছে। বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ-বিঘ্নের ঝুঁকি মূল্যায়ন করছে বাজার। তা সত্ত্বেও দেশে জ্বালানি তেলের দাম না বাড়িয়ে ভর্তুকি দিয়ে যাচ্ছে সরকার। গতকাল শুক্রবার এক বক্তব্যে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেছেন, জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে বিদ্যুৎ, গণপরিবহন ও খাদ্যপণ্যের মূল্য বেড়ে যায়। চতুর্দিক থেকে চাপ থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর কোনো পরিকল্পনা করেনি সরকার। জনগণের দুর্ভোগ যাতে না বাড়ে সেটি নিশ্চিত করতে প্রতিদিন সরকার ১৬৭ কোটি টাকা জ্বালানি তেলে ভর্তুকি দিচ্ছে। অন্যদিকে দেশে জরুরি জ্বালানি চাহিদা মেটাতে বৃহস্পতিবার তিন লাখ মেট্রিক টন ডিজেল কেনার অনুমোদন দেয় সরকার। ভার্চুয়ালি অনুষ্ঠিত অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির সভায় এ অনুমোদন দেওয়া হয়।

এছাড়া রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পেট্রোবাংলার সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) নিয়ে তিনটি ট্যাংকার আসছে, যেখানে মোট প্রায় এক লাখ ৯৩ হাজার টন এলএনজি রয়েছে। এর মধ্যে একটি ট্যাংকার ইতোমধ্যে বাংলাদেশের জলসীমায় পৌঁছেছে বলেও জানা গেছে। বাকি দুটিও আগামী বুধবারের মধ্যে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।

তবে মজুত ও সরবরাহ নিয়েও বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান এবং পেট্রোল পাম্প মালিকদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। ফলে সরকারের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলা হলেও বাস্তবে কতটা রয়েছে তা পরিষ্কার হচ্ছে না। অন্যদিকে চাহিদার তুলনায় অর্ধেক জ্বালানি তেল পাচ্ছেন বলে দাবি করছেন পেট্রোল পাম্পের মালিকরা। সে কারণে সরকারের এত সব উদ্যোগের সুফল জনগণের পর্যায়ে খুব কমই পৌঁছাচ্ছে। সেই সঙ্গে পাওয়া যাচ্ছে অবৈধ মজুতের অভিযোগও।

সরকারের পক্ষ থেকে বরাবরই জনগণকে আশ্বস্ত করা হচ্ছে, দেশের জ্বালানি তেলের মজুতে কোনো ঘাটতি নেই। সর্বশেষ গতকাল সিরাজগঞ্জে ৬৮ মেগাওয়াট সোলার পাওয়ার প্লান্ট পরিদর্শন শেষে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, জ্বালানির অভাবে নয়, অনেক সময় প্রয়োজনের কারণে পাওয়ার স্টেশন বন্ধ করে রাখতে হয়, রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রাখতে হয়। বর্তমান যে চাহিদা রয়েছে, সেই অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। এ কারণে রোজায় আপনারা বিদ্যুতের কোনো কষ্ট পাননি।

গত মঙ্গলবার জ্বালানিমন্ত্রী বলেছেন, দেশে জ্বালানি তেলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। মানুষ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনতে শুরু করায় পাম্পগুলোতে সময়ের আগেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে। তবে মন্ত্রীর এমন বক্তব্যকে পুঁজি করে কিছু কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অবৈধভাবে তেল মজুত করছে বলেও মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুরে ‘তেল নেই’ ঘোষণা দেওয়া পাম্পে মিলছে ৯ হাজার ৭৮৩ লিটার তেল। পরে ‘মেসার্স ব্রাদার্স অ্যান্ড সিস্টার্স ফিলিং স্টেশন’ নামের ওই প্রতিষ্ঠানকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা করা হয়।

এছাড়া চট্টগ্রামের পতেঙ্গা থানার মাদরাসা গেট এলাকার একটি খোলা বাজার থেকে ছয় হাজার ব্যারেল ডিজেল উদ্ধার এবং একজন ব্যবসায়ীকে গ্রেপ্তার করা হয়। অন্যদিকে শেরপুর শহরের একটি পাঁচতলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় ট্যাংক বানিয়ে ১৮ হাজার লিটার ডিজেল মজুত করার অভিযোগে এক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেই পরিমাণ অনিয়মের ঘটনা ঘটছে, সে তুলনায় সরকারের উদ্ধার অভিযান কম। ফলে এর সুযোগ নিচ্ছে অসাধু ব্যবসায়ীরা। পরিস্থিতি সামাল দিতে সমন্বিত পদক্ষেপ নিতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন আমার দেশকে বলেন, জ্বালানি তেলের মধ্যে ডিজেলের পুরোটাই আমাদের আমদানি করতে হচ্ছে। পেট্রোল ও অকটেনের চাহিদার বেশিরভাগই দেশীয় উৎপাদন ব্যবস্থা থেকে জোগান দেওয়া হয়। আমরাও দেখছি বাজারে ডিজেলের কোনো ঘাটতি নেই। অথচ অকটেন ও পেট্রোলের জন্য সর্বত্র হাহাকার চলছে। স্বাভাবিকভাবে এটি হওয়ার কথা নয়। এ দৃষ্টিকোণ থেকে মন্ত্রী ও সরকারের নীতি-নির্ধারকদের পর্যাপ্ত মজুতের কথা বলাটা অতিরঞ্জিত নয়।

তবে মাঠের চিত্র ভিন্ন দাবি করে জ্বালানি খাতের এ বিশেষজ্ঞ বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই সরকারের উচিত ছিল সব অংশীজনকে নিয়ে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া। কারণ সমস্যা সামনে আরো প্রকট হবে। ওই পরিস্থিতিতে সরকার প্রায় তিনগুণ দামে স্পট মার্কেট থেকে জ্বালানি কিনছে। এটা সাপ্লাই চেইনে যোগ হতেও সময় লাগবে। তাছাড়া সবার বক্তব্যেও একটি সমন্বয় থাকা প্রয়োজন, যাতে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি না হয়। অকটেন ও পেট্রোল ডিপো থেকে পাম্পে ঠিকমতো যাচ্ছে কি না বা পাচার হচ্ছে কি না, সেটাও তদারক করা জরুরি।

জ্বালানি ব্যবহারে আরো সাশ্রয়ী ও এখনই কর্মপদ্ধতি নির্ধারণের পরামর্শ দিয়েছেন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি বলেন, এ সংকটের বিষয়ে সবাই অবগত। এখন পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হবে। আমাদের কৃষিকে আগে বাঁচাতে হবে। ব্যক্তিগত পর্যায়ের গাড়ির ব্যবহার কমিয়ে গণপরিবহন ব্যবহারে সবাইকে উৎসাহিত করাসহ জ্বালানি সাশ্রয়ী কার্যক্রম নিতে হবে।

অবৈধ তেল কারবারিদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে প্রশাসন

জ্বালানি নিয়ে অস্থিরতার পেছনে সরকারের যথাযথ তদারকের অভাবকে দায়ী করে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে এ ব্যাপারে কঠোর হওয়ার বার্তা দিয়ে গতকাল বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পাঠানো বিবৃতিতে বলা হয়, প্রাথমিক অনুসন্ধানে জানা গেছে, সমুদ্রগামী জাহাজ ও তেল ডিপো থেকে জ্বালানি তেল পরিবহনের সময় একটি অসাধু চক্র অবৈধভাবে জ্বালানি তেল অপসারণ করে তা বিভিন্ন স্থানীয় বিক্রেতার নিকট সরবরাহ করে থাকে। জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা বজায় রাখা, জ্বালানি তেলের সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা এবং অবৈধ মজুত প্রতিরোধের লক্ষ্যে জেলা প্রশাসন কঠোর অবস্থানে রয়েছে। বর্তমানে সব তেল ডিপো, পেট্রোল পাম্প ও সংশ্লিষ্ট তেল কারবারিরা প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় রয়েছে। এ ধরনের অবৈধ কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।

অন্যদিকে দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষকে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়েছে পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি জানিয়েছে, আজ শনিবার থেকেই জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়ে আসবে। গতকাল এক বিবৃতিতে অ্যাসোসিয়েশন পক্ষ থেকে আতঙ্কিত না হয়ে সবাইকে স্বাভাবিকভাবে তেল সংগ্রহের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন