প্রকৃতিতে নীরবে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে। বছরের সবচেয়ে উষ্ণতম মাস বলে পরিচিত এপ্রিল-মে মাসে এবার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি এবং তাপমাত্রাও বেশ কম ছিল। অন্যদিকে ১ জুন থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর নাগাদ বর্ষাকাল গণ্য হলেও এবার জুন-জুলাইয়ে স্বাভাবিকের চেয়েও বেশি তাপমাত্রা থাকবে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে মে মাসের প্রথম দিকেই জানানো হয়েছিল এবার বর্ষা মৌসুম জুন-জুলাই মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টি হতে পারে। সেই পূর্বাভাসই যেন সত্যি হতে চলেছে। জুনের দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়া পূর্বাভাসেও গত সোমবার আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, চলতি মাসে দুই থেকে তিনটি ‘মৃদু’ থেকে ‘মাঝারি’ তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তাপপ্রবাহ চলাকালে কিছু এলাকায় তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠতে পারে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।
সংস্থাটির পূর্বাভাস পর্যাকলোচনায় দেখা যায়, জুন মাসে দিন ও রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকতে পারে। এ সময় বিচ্ছিন্নভাবে একাধিক মৃদু থেকে মাঝারি তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। বর্ষার আগমন ঘটলেও স্বাভাবিকের চেয়ে এবার বৃষ্টিপাত তুলনামূলক কম হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে মাসের প্রথমার্ধেই সারা দেশে দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা বিস্তার লাভ করবে। এ মাসে পাঁচ থেকে সাত দিন হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বজ্রঝড় হতে পারে। এছাড়া বঙ্গোপসাগরে এক থেকে দুটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার মধ্যে একটি নিম্নচাপে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ সময় বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় অস্বস্তিকর গরম ও ভ্যাপসা আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে।
এদিকে সোমবার দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার পূর্বাভাস প্রদানের নিমিত্ত বিশেষজ্ঞ কমিটির নিয়মিত সভায় মে মাসের আবহাওয়ার বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্ত পর্যালোচনা করা হয়। এতে বলা হয়, মে মাসে সারা দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে ৭ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাত এবং বাকি বিভাগসমূহে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। ওই মাসে দেশের সর্বোচ্চ, সর্বনিম্ন ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিক অপেক্ষা কম ছিল।
অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. মো. ওমর ফারুক আমার দেশকে বলেন, জুন মাসে দুই থেকে তিনটি তাপপ্রবাহের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে চলমান তাপপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত আছে। এ মাসে দেশে বিছিন্নভাবে একাধিক তাপপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।
দেশের কোথাও তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কম হলে সেটিকে ‘মৃদু তাপপ্রবাহ’ ধরা হয়। ৩৮ থেকে ৪০ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে বলা হয় ‘মাঝারি’ এবং ৪০ থেকে ৪২ ডিগ্রির কম তাপমাত্রাকে ‘তীব্র তাপপ্রবাহ’ বলা হয়। তাপমাত্রা ৪২ ডিগ্রির উপরে উঠলে সেটিকে ধরা হয় ‘অতি তীব্র তাপপ্রবাহ’।
আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, আবওহাওয়া অধিদপ্তর জুন মাসে দেশে স্বাভাবিকের চেয়ে কম বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়েছে। ফলে এ মাসে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিক থেকে বেশি থাকতে পারে।
এদিকে তাপপ্রবাহ শুরুর তৃতীয় দিনে মঙ্গলবার দেশের ৪১ জেলার ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। যা আগের দিন ছিল ৪০ জেলায়। এতে তীব্র ভ্যাপসা গরমে জনজীবনে চরম অস্বস্তি দেখা দিয়েছে। আজ বুধবার পর্যন্ত এই অবস্থা থাকতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
তাপপ্রবাহের সঙ্গে বাতাসে বেশি আর্দ্রতার কারণে সারা দেশে অসহনীয় ভ্যাপসা গরম অনুভূত হচ্ছে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের লোডশেডিং বাড়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অসহনীয় গরমে ছটফট করছে মানুষ। বুধবার তাপমাত্রা আরো বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানায়, মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল নীলফামারী সৈয়দপুরে ৩৮ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের খুলনায় ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছিল । মঙ্গলবার রাজধানীর সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা আগের দিন ছিল ৩৬ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। অর্থাৎ আগের দিনের তুলনায় সারাদেশেই তাপমাত্রা বেড়েছে।
আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক আমার দেশকে বলেন, আগামী ৪ জুন থেকে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়ে ধীরে ধীরে তাপমাত্রা প্রশমিত হতে পারে। তিনি বলেন, ৫ জুনের পর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমা মৌসুমীবায়ু সক্রিয় হয়ে বৃষ্টিপাতের প্রবণতা বেড়ে স্বস্তি দেখা দিতে পারে।
আজ বুধবার সকাল নাগাদ গত ২৪ ঘন্টায় সিলেট, মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল, কুড়িগ্রামের রাজারহাট, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালী জেলা ছাড়া দেশের আর কোথাও বৃষ্টি হয়নি। সর্বোচ্চ সিলেটে ২৪ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া পটুয়াখালীতে ১০, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ৮, শ্রীমঙ্গলে ১ ও চট্টগ্রামে ২ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া দেশের অধিকাংশ এলাকাজুড়ে বৃষ্টিপাত কমে মৃদু থেকে মাঝারি ধরনের তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার এই নীরবে বড় পরিবর্তন ঘটছে। আগামী বছরগুলোতে আরো বড় পরিবর্তন লক্ষণীয় হবে।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

