জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্যও বড় হুমকি। তাপপ্রবাহ, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, দাবানল ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে কৃষি, শিল্প, অবকাঠামো, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানে তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। কিন্তু এই ক্ষতির ভার পৃথিবীর সব মানুষ বা দেশের ওপর সমানভাবে পড়ছে না। তুলনামূলকভাবে কম কার্বন নিঃসরণ করা দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোই অনেক ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।
চরম আবহাওয়া সরাসরি ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরোক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতি। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা চরম আবহাওয়ায় আক্রান্ত নিম্নআয়ের দেশগুলোর মানুষের মধ্যে ৬৯ শতাংশ মানুষ আয় হারানোর এবং ৭২ শতাংশ সম্পদ হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ একটি জলবায়ু দুর্যোগ দরিদ্র পরিবারের জন্য শুধু সাময়িক সমস্যা নয়; তা তাদের সঞ্চয়, সম্পদ ও ভবিষ্যৎ আয়ের ওপর দীর্ঘস্থায়ী আঘাত করতে পারে।
সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে কারা?
দরিদ্র ও নিম্নআয়ের দেশ
দরিদ্র দেশগুলোর অর্থনীতি অনেক সময় কৃষি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বেশি নির্ভরশীল। ফলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টি বা দীর্ঘ খরা সরাসরি উৎপাদন ও আয়ে প্রভাব ফেলে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করবে বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলো। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৩ কোটি পর্যন্ত মানুষ চরম দারিদ্র্যের মধ্যে পড়তে পারে—যদি কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয়।
ছোট দ্বীপরাষ্ট্র
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো বিশেষভাবে ঝুঁকিতে। পর্যটন, মৎস্য, কৃষি ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো জাতীয় অর্থনীতিতেই বড় ধাক্কা লাগে।
ছোট দ্বীপরাষ্ট্রগুলো জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতির ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। আইপিসিসি(জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত আন্তঃসরকারি প্যানেল)-এর মতে, এসব দেশে চরম আবহাওয়ার ঘটনায় জিডিপির তুলনায় ক্ষতির মাত্রা অনেক বেশি হতে পারে এবং দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব সরকারি বাজেট ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষ
তাপমাত্রা বাড়লে বাইরে কাজ করা শ্রমিকদের কর্মক্ষমতা কমে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত গরম, খরা বা বন্যায় কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয়। ফলে আয় কমার পাশাপাশি খাদ্যের দামও বাড়তে পারে।
২০২৬ সালের সম্ভাব্য শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষি ও মৎস্য উৎপাদনে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় কফি উৎপাদন, পশ্চিম আফ্রিকায় কোকোয়া এবং দক্ষিণ আমেরিকায় ভুট্টা ও মৎস্য খাত ইতোমধ্যে আবহাওয়ার পরিবর্তনের চাপের মুখে রয়েছে।
নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী
একই দুর্যোগ সবার ওপর একই প্রভাব ফেলে না। দরিদ্র পরিবার, নারী-নেতৃত্বাধীন পরিবার, শিশু, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, অভিবাসী শ্রমিক ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর হাতে দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য সাধারণত কম সম্পদ থাকে। ফলে তারা চাকরি, সম্পদ, খাদ্য, পানি ও বাসস্থান হারানোর ঝুঁকিতে বেশি থাকে।
বাংলাদেশের জন্য সতর্কবার্তা
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ঝুঁকির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়ের কারণে বছরে গড়ে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের কৃষি জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত হারানোর ঝুঁকি রয়েছে। একই সময়ে ১ কোটি ৩০ লাখের বেশি মানুষ দেশের অভ্যন্তরে জলবায়ুজনিত কারণে স্থানান্তরিত হতে পারেন।
অর্থাৎ জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব শুধু উপকূলের মানুষের ঘরবাড়ি বা কৃষিজমিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। এটি কর্মসংস্থান, খাদ্যের দাম, নগরায়ণ, স্বাস্থ্য এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
জলবায়ু মোকাবিলার খরচও বিশাল
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি ঠেকাতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করতে হবে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনসিটিএডি)–এর হিসাব অনুযায়ী, ৪৮টি উন্নয়নশীল অর্থনীতির জলবায়ু পরিবর্তন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা ও দূষণ মোকাবিলায় ২০২৩ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত বছরে প্রায় ৫.৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। এই অর্থ তাদের সম্মিলিত মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ১৮ শতাংশের সমান।
এখানেই তৈরি হচ্ছে জলবায়ু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন—যেসব দেশ ও মানুষ ঐতিহাসিকভাবে তুলনামূলক কম গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ করেছে, তাদেরই কেন এত বড় অর্থনৈতিক মূল্য দিতে হবে?
সামনে কী?
জলবায়ু পরিবর্তনের অর্থনৈতিক ক্ষতি কমাতে শুধু দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্গঠন যথেষ্ট নয়। দরকার জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, কৃষিতে অভিযোজন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জন্য সামাজিক সুরক্ষা।
বিশ্বব্যাংকের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিনিয়োগ এখনই করা হলে ভবিষ্যতের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই জলবায়ু পরিবর্তনকে শুধু পরিবেশের সমস্যা হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি দারিদ্র্য, উন্নয়ন ও বৈশ্বিক অর্থনীতিরও সংকট।
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি পৃথিবীর সবার জন্য হলেও এর অর্থনৈতিক বোঝা সমান নয়। ধনী দেশগুলোর হাতে যেখানে অভিযোজনের জন্য বেশি অর্থ ও প্রযুক্তি রয়েছে, সেখানে দরিদ্র দেশ ও প্রান্তিক মানুষের হাতে সেই সুযোগ সীমিত। ফলে জলবায়ু সংকট ক্রমেই একটি প্রশ্নকে সামনে আনছে—যে সংকটে সবার ভূমিকা সমান নয়, তার ক্ষতির দায় কি সবার সমান হওয়া উচিত?
এসআর
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


