আষাঢ়ের মেঘে ঢাকা আকাশ, রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে অবিরাম বারিধারা আর নদ-নদীর স্ফীতিতে প্লাবিত জনপদ—এ যেন চিরায়ত বাংলার চিরচেনা বর্ষার রূপ। অথচ এই একটানা বৃষ্টি আর বহুলাংশে কমে আসা তাপমাত্রার পরও বাতাসে বইছে তীব্র ভ্যাপসা গরমের দহন। বাইরে ঝুম বৃষ্টির গান, আর ঘরের ভেতর কিংবা বাইরে গাঢ় অস্বস্তি—প্রকৃতির এমন বিপরীত আচরণে হাঁপিয়ে উঠেছে সাধারণ মানুষ।
চলতি মৌসুমে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণে নদীতীরবর্তী অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম ও পাহাড়ি অঞ্চলের জলমগ্নতা কিছুটা কমে এলেও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিম্নাঞ্চলে নতুন করে স্বল্পমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, তাপমাত্রার পারদ নেমে যখন ২৯ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে থিতু হয়েছে, তখনো ভ্যাপসা গরমের তীব্রতা বিন্দুমাত্র কমেনি।
প্রকৃতির এই রূপান্তরের পেছনের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক জানান, ঋতুবৈচিত্র্যের ঐতিহ্যবাহী বাংলাদেশ আজ জলবায়ু পরিবর্তনের নিষ্ঠুর বাস্তবতায় উপনীত। প্রকৃতিতে এখন আর ষড়্ঋতুর সেই সুষম পরিক্রমা নেই; দেশ যেন মূলত দুই ঋতু—শীত ও গ্রীষ্ম-বর্ষার আবর্তে বন্দি। এই সময়ে সূর্যের খাড়া রশ্মিপাত এবং দিনের দীর্ঘ পরিধির কারণে বৃষ্টি হলেও মেঘমালা ভূপৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি অবস্থান করায় কাঙ্ক্ষিত শীতল পরশ মেলে না। বরং ঝরে পড়া বারিধারা উষ্ণতার চাদরে মোড়ানো থাকে।
আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন নেসার মতে, দক্ষিণ দিক থেকে বয়ে আসা মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে বায়ুমণ্ডলে জলীয় বাষ্প বা আর্দ্রতার আধিক্যই এই অস্বস্তির মূল অনুঘটক। বৃষ্টির ঠিক পরপরই তীব্র বাষ্পীভবন ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের সৃষ্টি হয়, যা তাপমাত্রার চেয়েও কয়েক ডিগ্রি বেশি গরম অনুভূতি জাগায়।
অন্যদিকে, জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ বজলুর রহমান গ্রীষ্ম ও বর্ষার বৃষ্টির পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, গ্রীষ্মের কালবৈশাখী বা প্রাক-মৌসুমি বৃষ্টি অনেক উঁচুতে, বায়ুমণ্ডলের শীতল স্তর থেকে তৈরি হয় বলে তা ঠান্ডা ও প্রগাঢ় হয়। পক্ষান্তরে বর্ষাকালের বৃষ্টি মাটির কাছাকাছি থাকা মেঘ থেকে সৃষ্টি হওয়ায় তা উষ্ণ থাকে। একে ‘উষ্ণবৃষ্টি’ বলা চলে, যার মাঝে শীত-ঝড়ের প্রাবল্য না থাকলেও আর্দ্রতার বাড়াবাড়ি থাকে। এছাড়া বিশ্বব্যাপী ‘এল নিনো’র প্রভাব এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক অভিঘাতে এখন সারা বছরই তাপমাত্রার পারদ ঊর্ধ্বমুখী থাকছে এবং ভ্যাপসা গরমও অনুভূত হচ্ছে বেশি।
প্রকৃতির এই চরম বৈরিতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লোডশেডিংয়ের রাক্ষুসে থাবা। তীব্র গরমে যখন মানুষ একটু স্বস্তির খোঁজে ফ্যানের নিচে আশ্রয় নিতে চায়, ঠিক তখনই ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ উধাও হয়ে যাওয়ায় জনজীবন হয়ে পড়েছে পুরোপুরি বিপর্যস্ত।
প্রসঙ্গত, চলতি মৌসুমের শুরুতে এপ্রিল ও মে মাসে স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক বৃষ্টিপাত হলেও জুনজুড়ে ছিল ৩০ শতাংশ কম বৃষ্টি। যদিও জুলাইয়ে স্বাভাবিক বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল, তবুও জলবায়ুর খামখেয়ালিপনায় উষ্ণতার আঁচ যে সহজে ফুরোবার নয়, তা এখন হাড়ে হাড়েই টের পাচ্ছে দেশবাসী।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

