আয়ারল্যান্ডের সাবেক প্রেসিডেন্ট মেরি রবিনসনের নিবন্ধ

প্রকৃতি রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ জরুরি, যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষার সুযোগ নেই

প্রকৃতি রক্ষায় এখনই পদক্ষেপ জরুরি, যুদ্ধ শেষ হওয়ার অপেক্ষার সুযোগ নেই

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা এবং অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও প্রকৃতি সংরক্ষণকে পিছিয়ে রাখার সুযোগ নেই। কারণ বিশ্ব অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের জীবন-জীবিকা সরাসরি প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল।

বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ, ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা ও সরকারি ব্যয় সংকোচনের এই সময়ে প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টিকে আপাতত কম জরুরি বলে মনে হতে পারে। অনেকের ধারণা, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে মনোযোগ দেওয়া যাবে। কিন্তু এমন ভাবনা বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ বছর শরৎকালে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক সম্মেলনে বিশ্বনেতাদের এক বিষয় মনে রাখা জরুরি—বিশ্বের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অর্ধেকেরও বেশি প্রকৃতি ও এর দেওয়া বিভিন্ন সেবার ওপর নির্ভরশীল। উর্বর মাটি ৯ লাখ ৫০ হাজার কোটি ডলারের বৈশ্বিক খাদ্যশিল্পের ভিত্তি।

অন্যদিকে, বিশ্বের প্রায় ১৫০ কোটি মানুষের জীবিকা বনভূমির ওপর নির্ভরশীল। সুস্থ নদী বন্যার পানি ধারণে সহায়তা করে এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগব্যবস্থা সচল রাখে। অর্থাৎ, প্রকৃতি বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি। তাই এটি রক্ষা করা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।

মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ শেষ হওয়ার জন্য প্রকৃতিসংশ্লিষ্ট সংকট অপেক্ষা করবে না। চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপে তীব্র খরার কারণে কৃষিতে ২০০ থেকে ৩০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সারের দাম ৭১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার পর কৃষকদের জন্য এটি ছিল আরেকটি বড় ধাক্কা। যুদ্ধ ও চরম আবহাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে বিশ্ববাজারে খাদ্যের দাম ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিজ্ঞানীদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বাস্তুতন্ত্রের আংশিক বিপর্যয়ের কারণে প্রতিবছর বৈশ্বিক অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ ২ লাখ ৭০ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে। ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা যত তীব্রই হোক না কেন, অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য প্রাকৃতিক ব্যবস্থাকে দুর্বল করার সুযোগ নেই। ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের স্থলভাগ ও সমুদ্রের অন্তত ৩০ শতাংশ সংরক্ষণের বৈশ্বিক লক্ষ্য—যা ‘৩০x৩০’ নামে পরিচিত—এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রকৃতি সংরক্ষণ মূলত ভবিষ্যতের ঝুঁকি মোকাবিলা ও পারস্পরিক সংহতি জোরদারের বিনিয়োগ। এটি খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ায়। একই সঙ্গে মানুষের জীবিকা, জনস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ২০২২ সালে সরকারগুলোর গৃহীত ঐতিহাসিক কুনমিং-মন্ট্রিল বৈশ্বিক জীববৈচিত্র্য কাঠামোর আওতায় ‘৩০x৩০’ লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। এতে স্বীকার করা হয়েছে, প্রকৃতি সংরক্ষণ জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট নানা সুবিধা নিশ্চিত করার অন্যতম ভিত্তি।

এর বাস্তব উদাহরণও রয়েছে। কেল্প বন, ম্যানগ্রোভ ও জলাভূমি বায়ুমণ্ডল থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে। প্রবালপ্রাচীর ঝড়ের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সহায়তা করে এবং বিশ্বের সবচেয়ে বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রগুলোর কয়েকটির প্রাকৃতিক আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। স্থলভাগের বন বৃষ্টিপাতের ধরন নিয়ন্ত্রণ করে এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকা টিকিয়ে রাখে। অন্যদিকে, সুস্থ মাটি পানি ও পুষ্টি উপাদান ধরে রাখে, যা বৈশ্বিক খাদ্যনিরাপত্তা ও বন্যা প্রতিরোধের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

‘৩০x৩০’ লক্ষ্য ঘোষণার চার বছর পর এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। ‘ক্যাম্পেইন ফর নেচার’-এর নতুন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, বিশ্বের স্থলভাগ ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের ২০ শতাংশ এখন সংরক্ষিত বা সংরক্ষণাধীন এলাকা হিসেবে চিহ্নিত। বিদ্যমান অঙ্গীকারগুলো পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার প্রায় ২৭ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে নির্ধারিত লক্ষ্যের বাকি অংশের বড় একটি ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে।

তবে সমুদ্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে অগ্রগতি অনেক ধীর। সমুদ্রের মাত্র ১০ শতাংশ আনুষ্ঠানিকভাবে সংরক্ষিত এলাকা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। বিদ্যমান অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলেও ২০৩০ সালের মধ্যে এ হার বেড়ে মাত্র ১২ শতাংশে পৌঁছাবে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, ‘টুগেদার ফর দ্য ওশান’-এর সর্বশেষ ‘ওশান প্রোটেকশন গ্যাপ রিপোর্ট’ অনুযায়ী, সমুদ্রের মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ কার্যকরভাবে সংরক্ষিত বলে মূল্যায়ন করা হয়েছে। সংরক্ষিত হিসেবে চিহ্নিত অনেক এলাকাতেও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে।

লক্ষ্য পূরণের জন্য হাতে সময় আছে মাত্র চার বছর। তারপরও এই দশকের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক অঙ্গীকার ‘৩০x৩০’ বাস্তবায়নের সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে পিছিয়ে পড়া সময়ের ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

প্রথমত, প্রকৃতি সংরক্ষণে সরকারগুলোকে অর্থায়ন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে হবে। ‘৩০x৩০’ লক্ষ্য বাস্তবায়নে বছরে আনুমানিক ১০ হাজার থেকে ১৮ হাজার কোটি ডলার প্রয়োজন হবে। অথচ বর্তমানে এ খাতে বার্ষিক ব্যয় মাত্র ২ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এই লক্ষ্য অর্জন করা গেলে ২০৫০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক জিডিপিতে প্রতিবছর অতিরিক্ত ৪৫ হাজার কোটি ডলার যুক্ত হতে পারে। পাশাপাশি ৪০ থেকে ৭০ লাখ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দ্বিতীয়ত, নীতিনির্ধারকদের শুধু সমাধানের কথা বললে চলবে না, দ্রুত তা বাস্তবায়ন করতে হবে। মে মাস পর্যন্ত ১১৬টি দেশ স্থলভাগ ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের সর্বোচ্চ ২৭ শতাংশ সংরক্ষণের অঙ্গীকার জমা দিয়েছে। কিন্তু অনেক দেশ এখনো এসব অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য সুনির্দিষ্ট মানচিত্র, ব্যয়ের হিসাব ও অর্থায়নসহ পরিকল্পনা তৈরি করেনি। শুধু অঙ্গীকার করলেই প্রকৃতি সংরক্ষিত হবে না।

এ ছাড়া পৃথিবীর আরও বেশি এলাকা সংরক্ষিত ঘোষণা করাই একমাত্র চ্যালেঞ্জ নয়। সরকারগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে, সংরক্ষিত এলাকাগুলো যথাযথভাবে পরিচালিত হচ্ছে, সেখান থেকে বাস্তব সুফল পাওয়া যাচ্ছে এবং জীববৈচিত্র্য কার্যকরভাবে রক্ষা পাচ্ছে। এ জন্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়নব্যবস্থা প্রয়োজন, যা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের মধ্যেও টিকে থাকতে পারবে।

বিশ্ব পরিস্থিতি যে অনিশ্চিত, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। মধ্যপ্রাচ্য ও ইউক্রেনের যুদ্ধ সরকারগুলোকে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়াতে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে বেশি মনোযোগ দিতে বাধ্য করছে। কিন্তু এ কারণে প্রকৃতি সংরক্ষণকে পেছনে ঠেলে দেওয়া হবে বড় ভুল। প্রকৃতি রক্ষার বিষয়টি শুধু মৌমাছি বা বন্য প্রাণীর স্বার্থের সঙ্গে জড়িত নয়। প্রকৃতির ভবিষ্যতে বিনিয়োগ করা মানে নিজেদের ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করা।

লেখক: জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘ মহাসচিবের সাবেক বিশেষ দূত

সূত্র: ব্যাংকক পোস্ট

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন