আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা এবং ড. ইউনূস সরকার

ইফতেখারুল ইসলাম

গণঅভ্যুত্থানের বৈধতা এবং ড. ইউনূস সরকার
ফাইল ছবি

যুগ যুগ ধরে নির্বাচন ও গণতন্ত্রের ফাঁকা বুলির মধ্যে আমাদের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা আটকে রয়েছে। গণঅভ্যুত্থান, অন্তর্বর্তী সরকার, সংবিধানসহ বহু রাজনৈতিক ধারণাগুলোর ব্যাপারে জ্ঞানগতভাবে আমরা এক কদমও এগোতে পারছি না।

ফলে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারের সঙ্গে নির্বাচন ও জনগণের ম্যান্ডেটের যে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে, তাও আমরা উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হচ্ছি। খেয়াল করা দরকার, ঐতিহাসিকভাবে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি ‘অরাজনৈতিক’ বলে বহুল প্রচলিত থাকায় এবারের অভ্যুত্থানের সরকারকেও সেই একই তকমা দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এই দৃষ্টিভঙ্গি গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তিতে গঠিত সরকারের এখতিয়ার ও ক্ষমতা খাটো করে দেখার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। এতে রাজনীতিশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ ধারণাগুলো নিয়ে আমাদের মূলধারার বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্বলতাও উদোম হয়ে পড়ে।

‘নির্বাচনের অপর নাম গণঅভ্যুত্থান’। অর্থাৎ একটি জনগোষ্ঠী যখন কোনো সরকার উৎখাতের মধ্য দিয়ে নতুন কোনো সরকার গঠন করে, তখন সেই সরকারের মধ্যেই নির্বাচনের রায় হাজির থাকে। এটাই গণঅভ্যুত্থানের মোজেজা! দেশের প্রচলিত পদ্ধতিতে নির্বাচনের মধ্য দিয়ে একটি সরকার পাঁচ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকে।

গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত সরকারও একই এখতিয়ার রাখে। কারণ, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ওই জনগোষ্ঠীর ম্যান্ডেট নিয়ে সরকার গঠিত হয়। এ ধরনের প্রক্রিয়ায় সবার ঊর্ধ্বে থাকে জনগণের ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা। এমনকি সংবিধানের ওপরেও জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে। এ কারণে গণঅভ্যুত্থান বা বিপ্লবী সরকার সংবিধান অগ্রাহ্য করে সরকার গঠনের বহু উদাহরণ রয়েছে।

জ্ঞানগত দিক থেকে পুরোনো কাঠামোয় আমরা যেভাবে অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অরাজনৈতিক’ বিবেচনা করেছি, সেভাবেই এবারের গণঅভ্যুত্থানের সরকারকে বিচার করাটা গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্য ও মর্মার্থবিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা। এই তৎপরতার অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের নাগরিক সমাজের রাজনৈতিক পাঠের ফাঁকফোকর।

জনগণের রায় বিভিন্নভাবে প্রতিফলিত হতে পারে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সাধারণত আমরা জনগণের রায়ের প্রতিফলনের সঙ্গে পরিচিত। কিন্তু একটি জনগোষ্ঠী যখন গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সরকার গঠন করে, সেখানেও জনগণের ম্যান্ডেট তথা রায় বিদ্যমান থাকে। এ রায় নির্বাচনের সঙ্গে তুলনীয়। এ কারণে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকার জনগণের রায়ের প্রতিফলন। গণঅভ্যুত্থানে জনগণের ম্যান্ডেট বিদ্যমান থাকে।

ম্যান্ডেট থাকে বলেই একটা সরকার গঠিত হয়। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সৃষ্ট ম্যান্ডেট এবং স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতা পালাবদলে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ম্যান্ডেট একই বস্তু নয়। গণঅভ্যুত্থানের কারণে ড. ইউনূস নেতৃত্বাধীন সরকারে জনগণের ম্যান্ডেট বিদ্যমান। ফলে, আমাদের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী, ড. ইউনূসের সরকারও অন্তত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার এখতিয়ার রাখে। আমরা এ ব্যাপারগুলো যথাযথভাবে হৃদয়ঙ্গম করতে পারলে সংস্কারের পথ অনেক সহজ হতো এবং আমূল সংস্কারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে আরো কার্যকরভাবে বোঝানো যেত।

গণঅভ্যুত্থান নিয়ে এ ব্যাখ্যা অনেকেই মেনে নিতে নারাজ হবেন। এর প্রধান কারণ, ঐতিহাসিকভাবে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি ‘অরাজনৈতিক’ বলে মূলধারার রাজনৈতিক ডিসকোর্সে প্রচার পেয়েছে। নব্বইয়ের দশকে সামরিক শাসনের পর প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হয়।

প্রায় এক দশক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার পর দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় তৎপরতায় এরশাদের পতন ঘটেছিল। এরপর যথাযথ প্রক্রিয়ায় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের জন্য একটি নিরপেক্ষ প্রতিষ্ঠান বা প্রতিনিধি কমিটির দরকার পড়ে। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠা পায়। এরশাদের পতনের পর সামরিক বলয় থেকে ক্ষমতা রাজনীতিবিদদের হাতে ফিরিয়ে দিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাজ করেছে।

সেই থেকে মূলধারায় রাজনৈতিক পাঠে অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণাটি ‘অরাজনৈতিক’ হিসেবে নাগরিক সমাজ প্রচার চালিয়েছে। এমন দুর্বল দৃষ্টিভঙ্গির কারণে বর্তমানে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সরকারকেও ‘নিরপেক্ষ’ ও ‘অরাজনৈতিক’ বলে দাবি করছেন।

এতে রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রধান দাবিÑ পুরোনো বন্দোবস্ত উপড়ে ফেলা ও গৌণ করে দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। অর্থাৎ তারা দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় মৌলিক পরিবর্তনবিরোধী তৎপরতায় সক্রিয় হতে পেরেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের পরিবর্তে বিপ্লবী সরকার নাম দিলেই ড. ইউনূসের সরকারকে রাজনৈতিক বলে দেখা হতো। কিন্তু মূল কথা হলো, গণঅভ্যুত্থানের ভিত্তিতে গঠিত সরকার মাত্রই রাজনৈতিক।

রাজনৈতিক ডিসকোর্সে অন্তর্বর্তী সরকারকে ‘অরাজনৈতিক’ বলে দেখার ঐতিহাসিক কারণে গণঅভ্যুত্থানের সরকারকেও সেভাবে বিচার করা হচ্ছে। বিশেষত রাজনৈতিক দলগুলো কথিত ‘অরাজনৈতিক’ ডিসকোর্সে দাঁড়িয়ে শিগগিরই নির্বাচনের দাবি তুলেছে।

এর মূল উদ্দেশ্য আমূল সংস্কারের পথ বন্ধ করে দেওয়া এবং গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী তরুণদের নেতৃত্বে যে রাজনৈতিক সম্ভাবনার দেখা যাচ্ছে, তা কঠিন করে তোলা। অন্তর্বর্তী সরকারের ব্যাপারে নাগরিক সমাজের পাঠ পুরোনো কাঠামোয় সীমাবদ্ধ না থাকলে রাজনৈতিক দলগুলো এই সুবিধা নিতে পারত না। সুতরাং, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পরও রাজনীতিবিষয়ক মূলধারার জ্ঞানগত পাটাতন একই পুরোনো ধারায় খাবি খাচ্ছে।

স্রেফ ক্ষমতার হাতবদলের জন্য বিশেষ প্রতিনিধি বাছাই করে সরকার গঠন করা এবং গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত সরকারের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য বিদ্যমান। সুতরাং গণঅভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এবারের অন্তর্বর্তী সরকারের ধারণা আমাদের পূর্ববর্তী অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন। অন্তত জ্ঞান ও তত্ত্বীয় জায়গা থেকে বিষয়টি আমাদের পরিষ্কার থাকতে হবে। তাহলে মাঠের রাজনীতিতে কর্মসূচি গ্রহণ এবং জাতীয় ঐক্যে বিতর্কগুলো কিছুটা গুছিয়ে সমাধান করা সম্ভব।

এ সরকার ‘ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সরকার’। এখানে জনগণের চূড়ান্ত অভিপ্রায় ছিল বলেই ক্ষমতাসীন সরকারের পতন ঘটেছে। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে গঠিত বলেই এ সরকারে জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটেছে।

এ কারণে অন্তর্বর্তী সরকারে প্রচলিত নির্বাচনী ম্যান্ডেটের স্পিরিট বিদ্যমান। ফলে নির্বাচিত সরকারের মতোই অন্তর্বর্তী সরকার অন্তত পাঁচ বছর ক্ষমতায় থাকার এখতিয়ার রাখেন। এর বিরুদ্ধে যেকোনো রাজনৈতিক দলের অবস্থান জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পরিপন্থী।

লেখক : লেখক ও গবেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন