সংস্কার না আত্মসমর্পণ

ইসলামী ব্যাংককে বাঁচাতে এখনই যে সিদ্ধান্ত দরকার

এম. কবির হাসান

ইসলামী ব্যাংককে বাঁচাতে এখনই যে সিদ্ধান্ত দরকার
এম. কবির হাসান

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসির সাম্প্রতিক নিয়োগ কেলেঙ্কারি আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি বাস্তবতা তুলে ধরেছে—সমস্যাটি শুধু অনিয়মিত নিয়োগ নয়, বরং গভীর শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ব্যাংকটি ১০ হাজার ৮০০-এর বেশি কর্মী নিয়োগ দেয়, যার প্রায় ৭৫ শতাংশই কোনো প্রকাশ্য বিজ্ঞাপন ছাড়াই। কর্মীর সংখ্যা ১৩ হাজার ৫০০ থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ২১ হাজার ৭০০-তে এবং নিয়োগের সিংহভাগ কেন্দ্রীভূত হয় চট্টগ্রামের একটি নির্দিষ্ট উপজেলায়।

এই চিত্র শুধু অদক্ষতা বা স্বজনপ্রীতির উদাহরণ নয়—এটি একটি বৃহত্তর আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকটের লক্ষণ। একসময় দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম সফল ইসলামী ব্যাংক হিসেবে পরিচিত প্রতিষ্ঠানটি আজ কার্যত দেউলিয়াত্বের দ্বারপ্রান্তে। এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কি এই ব্যাংককে পুনরুদ্ধার করব, নাকি ধ্বংসের দায়ীদেরই আবার ক্ষমতায় ফিরতে দেব?

বিজ্ঞাপন

সমস্যার গভীরতা : নিয়োগ থেকে ঋণ কেলেঙ্কারি

অডিট রিপোর্ট এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে উঠে এসেছে চমকপ্রদ তথ্য। মানবসম্পদ নীতিমালা এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়, যাতে প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগ প্রক্রিয়া পুরোপুরি পাশ কাটানো যায়। খোলা পরীক্ষার পরিবর্তে ব্যক্তিগতভাবে সিভি সংগ্রহ করা হয়, এমনকি লিখিত পরীক্ষার পাস নম্বর কমিয়ে অযোগ্য প্রার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়।

তবে এই নিয়োগ কেলেঙ্কারি বৃহত্তর আর্থিক অনিয়মের অংশমাত্র। তদন্তে দেখা গেছে, এস আলম গ্রুপ হাজার হাজার কোটি টাকা অনিয়মিত ঋণের মাধ্যমে বের করে নিয়েছে—নতুন গঠিত কোম্পানির নামে জামানত ছাড়াই ঋণ দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকও ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিপুল তারল্য সহায়তা দিতে বাধ্য হয়েছে। ফলে ব্যাংক খাতে তৈরি হয়েছে বিশাল মূলধন ঘাটতি, যা সামাল দিতে সরকার ইতোমধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঢেলেছে।

প্রথম করণীয় : জনবল পুনর্বিন্যাস

সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হলো অতিরিক্ত জনবল হ্রাস করা। বর্তমানে প্রায় ২ হাজার ৯০০ অতিরিক্ত কর্মীর জন্য বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে—এটি কোনোভাবেই টেকসই নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ কর্তৃক পরিচালিত দক্ষতা মূল্যায়ন এই প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা। অনিয়মিতভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মীদের মধ্যে যারা পরীক্ষায় অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে, তাদের অপসারণ একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত। এই সিদ্ধান্ত আদালতে টিকিয়ে রাখতে হবে এবং কোনোভাবেই তা থেকে সরে আসা যাবে না।

একই সঙ্গে শাখাভিত্তিক জনবল পুনর্বিন্যাস জরুরি। একটি অঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে কর্মী কেন্দ্রীভূত হওয়া ব্যাংকের কার্যকারিতা ও সুশাসনের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

দ্বিতীয় করণীয় : খারাপ সম্পদ আলাদা করা

ব্যাংকটির আর্থিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি মৌলিক পদক্ষেপ হলো খারাপ ঋণগুলোকে মূল ব্যাংক থেকে আলাদা করা। একটি স্বতন্ত্র অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি (এএমসি) গঠন করে এসব অনিয়মিত ঋণ সেখানে স্থানান্তর করা যেতে পারে। এর ফলে মূল ব্যাংকটি তার নিয়মিত কার্যক্রমে মনোযোগ দিতে পারবে আর এএমসি আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঋণ পুনরুদ্ধার করবে। এই মডেল আন্তর্জাতিকভাবে সফল—বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়ার ১৯৯৭-পরবর্তী ব্যাংক পুনর্গঠনে। পরে সরকার-সমর্থিত সুকুক ইস্যু এবং কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে ব্যাংকটির মূলধন পুনর্গঠন করা সম্ভব।

তৃতীয় করণীয় : সুশাসনের কাঠামোগত সংস্কার

এ সংকটের মূল কারণগুলোর একটি হলো দুর্বল সুশাসন কাঠামো। একটি করপোরেট গোষ্ঠী কীভাবে একটি ব্যাংকের বোর্ড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে—এটি তারই উদাহরণ।

এখানে তিনটি জরুরি সংস্কার প্রয়োজন—

  • জরুরি নিয়োগের অপব্যবহার বন্ধ করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা।
  • কোনো একক গোষ্ঠীর মালিকানা ১০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা।
  • বোর্ডে স্বাধীন পরিচালকদের প্রকৃত সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করা।

চতুর্থ করণীয় : আমানতকারীর আস্থা রক্ষা

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আস্থা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। সাম্প্রতিক সময়ে আমানত বৃদ্ধির যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে এই আস্থা অত্যন্ত ভঙ্গুর। যদি আগের নিয়ন্ত্রণকারী গোষ্ঠী আবার মালিকানা ফিরে পাওয়ার সুযোগ পায়, তাহলে এই আস্থা মুহূর্তেই ধ্বংস হয়ে যাবে। ব্যাংক রেজল্যুশন আইন ২০২৬-এর এমন কোনো বিধান থাকা উচিত নয়, যা দায়ীদের পুনর্বাসনের সুযোগ দেয়।

পঞ্চম করণীয় : ইসলামী ব্যাংকিং কাঠামো শক্তিশালী করা

ইসলামী ব্যাংকিংয়ের একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো নৈতিকতা ও শরিয়াহসম্মত কার্যক্রম। কিন্তু বর্তমান সংকট দেখিয়েছে, বাংলাদেশে এই খাতের জন্য একটি শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাব রয়েছে। মালয়েশিয়ার মতো একটি কেন্দ্রীয় শরিয়াহ তদারকি বোর্ড গঠন করা জরুরি, যার আইনি ক্ষমতা থাকবে এবং যা সব ইসলামী ব্যাংকের কার্যক্রম তদারকি করবে।

শেষ কথা : এখন সিদ্ধান্তের সময়

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ একসময় আস্থার প্রতীক ছিল। এর পতন কোনো দুর্ঘটনা নয়—এটি ছিল পরিকল্পিত শোষণ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতার ফল।

পুনরুদ্ধারের পথ কঠিন, কিন্তু পরিষ্কার। জনবল পুনর্বিন্যাস, খারাপ সম্পদ আলাদা করা, মূলধন পুনর্গঠন, সুশাসন নিশ্চিত করা এবং আমানতকারীর আস্থা রক্ষা—এই পাঁচটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করলেই একটি বিশ্বাসযোগ্য পুনরুদ্ধার সম্ভব। কিন্তু যদি আমরা এ সংকটের জন্য দায়ীদেরই আবার ক্ষমতায় ফিরিয়ে দিই, তাহলে সেটি কোনো সংস্কার হবে না—সেটি হবে সরাসরি আত্মসমর্পণ।

লেখক : নিউ অরলিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্সের অধ্যাপক ও মফেট চেয়ার; ২০১৬ সালে ইসলামিক ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্সে আইএসডিবি পুরস্কারপ্রাপ্ত; এএওআইএফআইয়ের নৈতিকতা ও গভর্ন্যান্স বোর্ডের সদস্য এবং এএওআইএফআই শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন