নারী শ্রমের অবমূল্যায়ন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

আমার দেশ অনলাইন

নারী শ্রমের অবমূল্যায়ন: বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট

মহান মে দিবস বা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস, যা ১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটে দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে আন্দোলনরত শ্রমিকদের ওপর পুলিশের গুলিবর্ষণ এবং আত্মত্যাগের স্মরণীয় ঘটনা। এই রক্তাক্ত সংঘাতের পর শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে বিশ্বজুড়ে দিনটিকে স্মরণ করতে ১৮৮৯ সালে প্যারিসে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক শ্রমিক সমাবেশে “আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি দিবস” হিসেবে স্বিকৃতি দেয়া হয়। এরপর থেকে ১৮৯০ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়ে আসছে। বাংলাদেশেও ১৯৭২ সালে দিনটি জাতীয় ছুটির দিন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এই দিনে শ্রমিকরা মিছিল-সমাবেশ করে তাদের ন্যায্য অধিকারের দাবি জানিয়ে দিনটিকে স্মরণ করে। তবে মে দিবস, শুধু কর্মজীবী শ্রমিকদের সংগ্রামের স্মৃতিচিহ্ন নয়, এটি সকল শ্রমের স্বীকৃতি এবং ন্যায়বিচারের দাবির দিন।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, পৃথিবীর সমস্ত উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পেছনে শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও রক্ত মিশে আছে। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে দিনটি উদযাপন করতে গেলে কঠিন সত্যের মুখোমুখি হতে হয়, যেখানে এক গভীর বৈষম্যের চিত্র ফুটে ওঠেছে - অর্থাৎ নারী শ্রমের অবমূল্যায়ন। নারী, তিনি কর্মজীবী নারী হোক কিংবা গৃহিণী—উভয়েরই শ্রম আমাদের জাতীয় অর্থনীতির ভিত্তি হলেও, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রে তার যথার্থ মূল্যায়ন আজও অধরা। এই লেখায় আমরা বাংলাদেশের নারী শ্রমের এই অদৃশ্য অবিচারের গভীরতা অনুসন্ধান করব এবং সমাধানের পথ খুঁজব।

বিজ্ঞাপন

অদৃশ্য অর্থনীতির মেরুদণ্ড: গৃহস্থালি শ্রম

বাংলাদেশের নারী শ্রমের সবচেয়ে বড় সত্যটি আজও 'অদৃশ্য' রয়ে গেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এবং ইউএন উইমেনের সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশের নারীরা যে অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজ করেছেন, তার আর্থিক মূল্য প্রায় ৬.৭ ট্রিলিয়ন টাকা। এই বিশাল অঙ্ক আমাদের দেশের মোট জিডিপির প্রায় ১৮.৯ শতাংশের সমান। রান্না, ঘর-বাড়ি পরিষ্কার, সন্তানধারণ থেকে জন্মদান, লালন-পালন ও বয়োজ্যেষ্ঠদের যত্ন নেওয়া—এই কাজগুলোকে সমাজ নিছক ‘নারীর কর্তব্য’ বা ‘পারিবারিক দায়িত্ব’ হিসেবে গণ্ডিবদ্ধ করে রেখেছে ,যা নারী শ্রমশক্তির সঙ্কোচন ঘটাচ্ছে। অক্সফামের এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের সাধারন এক গৃহিণীর দৈনিক শ্রমের মূল্য ৫,০০০-৭,০০০ টাকা, যা জিডিপির ৩০% এরও বেশি। কিন্তু এই শ্রম অ-প্রতিফলিত, অ-স্বীকৃত। অথচ এই শ্রম ছাড়া বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনীতি সচল রাখাই অসম্ভব।

কর্মজীবী নারীর দ্বিমুখী লড়াই

নারী শ্রম বাংলাদেশের অগ্রগতির চালিকাশক্তি। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে ৪০ লাখ শ্রমিকের ৬০% নারী, যারা আমাদের রপ্তানি আয়ের মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু তারা পুরুষদের তুলনায় ২১-৩২% কম বেতন পান। আবার কর্মক্ষেত্রে তারা লিঙ্গভিত্তিক বেতন বৈষম্য, নিরাপত্তাহীনতা, মাতৃত্বকালীন সমস্যা এবং প্রতিকূল পরিবেশের শিকার হন। অথচ শ্রম আইনে সমান মজুরির বিধান থাকলেও বাস্তবে বৈষম্য রয়েছে। কর্মজীবী নারীদের লড়াই শুধু অফিসের আট ঘণ্টার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; কর্মক্ষেত্র থেকে ফেরার পর তাদের ঘরের হাজারো কাজের দায়িত্ব নিতে হয়। সমাজবিজ্ঞানীরা একে ‘ডাবল বার্ডেন’ বা ‘দ্বৈত চাপ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন, যা একজন নারীর শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। মে দিবসে এই শ্রমের যথার্থ মূল্যায়ন না করলে শ্রম আন্দোলন অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। শ্রমজীবী নারীদের প্রতি এই উপেক্ষা অর্থনীতির পথে বড় বাধা।

কৃষিতে অংশগ্রহণ ও স্বীকৃতির অভাব

বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিতে নারীদের অবদান অনস্বীকার্য । তবু সমাজে তাদের শ্রমকে 'সাময়িক' বা 'পারিবারিক সহায়ক' হিসেবে দেখা হয়। গ্রামাঞ্চলে এই অবমূল্যায়ন আরও তীব্র। কৃষিকাজে নারীরা প্রায় ৬০ শতাংশ শ্রম দিলেও, জমির মালিকানা বা সিদ্ধান্তের ক্ষমতায় তাদের অংশগ্রহণ নগণ্য। বীজ সংরক্ষণ থেকে ফসল সংগ্রহ, গবাদি পশুর যত্ন—সবকিছুতে তাদের ভূমিকা অপরিসীম, কিন্তু পুরুষকেন্দ্রিক সমাজে এর মূল্যায়ন অস্বীকৃত। কৃষিতে নারীর এই শ্রম যদি জাতীয় আয়ে সঠিকভাবে গণনা করা হতো, তবে জিডিপিতে কৃষির প্রকৃত অবদান অনেক বেশি দৃশ্যমান হতো। গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত সহায়তা ও স্বীকৃতি পেলে কৃষিতে নারীর অবদান ২.৫ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি করা সম্ভব।

অবমূল্যায়নের কারণসমূহ

বাংলাদেশের কর্মজীবী এবং গৃহিণী নারীদের শ্রমের অবমূল্যায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কর্মজীবী নারীরা কর্মক্ষেত্র ও ঘরের কাজের সাথে দ্বৈত দায়িত্ব বহন করলেও পারিবারিক ও সামাজিক মানসিকতা, শ্রেণি বৈষম্য এবং নীতিগত ঘাটতি নারী শ্রমকে অবমূল্যায়িত করছে। মে দিবসে শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দাবি তোলা হলেও নারীদের শ্রম প্রায়শই অদৃশ্য এবং অস্বীকৃত। এই অবমূল্যায়নের মূলে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব, লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য এবং নীতিগত অসচেতনতাই দায়ী। সরকারি নীতিতে নারী শ্রমিকদের জন্য মাতৃত্বকালীন দীর্ঘ ছুটি, দুধদোহন কেন্দ্র থাকলেও বাস্তবে তার বাস্তবায়ন খুবই দুর্বল।

মে দিবসের অঙ্গীকার: স্বীকৃতির দাবি

মে দিবস কেবল প্ল্যাকার্ডে ছবি তুলে অধিকার আদায়ের স্লোগান দেওয়ার দিন নয়, এটি পরিবর্তনের অঙ্গীকার নেওয়ার দিন। তাই নারী শ্রমের যথার্থ মূল্যায়নের জন্য নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো দৃশ্যমান করতে জোড়ালো দাবি জানাচ্ছি-

  • কর্মক্ষেত্রে সমান কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করতে হবে এবং নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটিসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষা আইনিউপায়ে কঠোরভাবে পালন করতে হবে।
  • অবৈতনিক গৃহস্থালি ও সেবা-যত্ন মূলক কাজকে জাতীয় জিডিপির পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করতে হবে।
  • গৃহস্থালি কাজকে ‘নারীর কাজ’ হিসেবে চিহ্নিত না করে একে ‘যৌথ দায়িত্ব’ হিসেবে মেনে নেয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
  • কৃষি ও শিল্প খাতে কর্মরত নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ পর্যায়ে যুক্ত করতে হবে।
  • নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • গৃহিণী শ্রমকে জিডিপি তে অন্তর্ভুক্ত করে স্বীকৃতি দিতে হবে।
  • প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, শিক্ষা ও সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালাতে হবে।
  • লিঙ্গ সমতার নীতি বাস্তবায়ন করতে হবে।
  • নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
  • শ্রম আইন কঠোরভাবে কার্যকর করে নারীবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে।

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসে আমাদের নারীদেরকেই এই দাবি পূরনে সচেষ্ট হতে হবে এবং কণ্ঠস্বরকে উচ্চ করতে হবে। আসুন, এই দিনটিকে নারীশ্রম মূল্যায়নের বিজয় দিবস হিসেবে রূপান্তরে সঙ্গবদ্ধ হই।

পরিশেষে

মে দিবসে আমাদের প্রত্যাশা—নারী শ্রম যেন আর ‘অদৃশ্য’ বা ‘অবমূল্যায়িত’ না থাকে। যতক্ষণ পর্যন্ত ঘরে ও বাইরে নারীর শ্রমের মর্যাদা পূর্ণমাত্রায় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, ততক্ষণ মে দিবসের প্রকৃত সার্থকতা অপূর্ণই থেকে যাবে। আসুন, আমরা এমন এক সমাজ গড়ি যেখানে শ্রমের লিঙ্গভেদে কোনো বিভাজন থাকবে না, বরং নারী–পুরুষ প্রতিটি শ্রমিকের কাজই হবে মূল্যায়িত ও সমাদৃত।

লেখক: খাদিজা পারভীন, প্রভাষক তথ্যবিজ্ঞান ও গ্রন্থাগার ব্যবস্থাপনা বিভাগ এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন