ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা

মারুফ কামাল খান

ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা

এডওয়ার্ড আর মারোর একটা কথা দিয়েই শুরু করি। ভদ্রলোক ছিলেন আমেরিকার ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী, কিংবদন্তিতুল্য ব্রডকাস্ট সাংবাদিক ও যুদ্ধ সংবাদদাতা। তাকে আধুনিক সাংবাদিকতার একজন পথিকৃৎ বলে মনে করা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় লন্ডনে বসে সরাসরি বোমা হামলার মুখে তার করা রেডিও লাইভ রিপোর্টিং ‘দিস ইজ লন্ডন’ তাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তোলে।

গত শতকের পঞ্চাশের দশকে যখন আমেরিকার সিনেটর জোসেফ ম্যাককার্থি ক্ষমতার অপব্যবহার করে কমিউনিস্ট সন্দেহে বহু নির্দোষ মানুষের ক্যারিয়ার ধ্বংস করছিলেন, তখন মারো তার টেলিভিশন শো ‘সি ইট নাও’-এ তথ্য-প্রমাণসহ ম্যাককার্থির ভয়ংকর রূপ জনসমক্ষে তুলে ধরেন। এটি আমেরিকার রাজনীতি ও সাংবাদিকতার ইতিহাসে একটি অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিজ্ঞাপন

সেই মারো সাহেবের দুটো কোটেশন বলি।

একটি হলোÑ‘আমরা যদি নিজেদের মধ্যে ভয়ের সংস্কৃতি লালন করি, তবে আমরা এমন একটি অসভ্য যুগে প্রবেশ করব, যেখানে সততা কোনো কাজে আসবে না।’

দারুণ সত্যি কথা। এই দেশে আমরা ইতিহাসের নানা কালপর্বে স্বৈরশাসন ও ফ্যাসিবাদের ক্রূর অভিজ্ঞতা অতিক্রম করে এসেছি। অসভ্য ও বর্বর সেই শাসনকে কিন্তু কেবল ব্যক্তিগত ও পেশাগত সততা দিয়ে মোকাবিলা করা সম্ভব হয়নি। এর জন্য সম্মিলিত যে সাহসের প্রয়োজন ছিল আমরা তা দেখাতে পারিনি। এই ভয়ের সংস্কৃতির পাশাপাশি লোভের, স্বার্থের, কদমবুসির সংস্কৃতিও ফ্যাসিবাদকে বদ্ধমূল হতে মদত জুগিয়েছে। আমাদের এই নতজানুতার সূত্রপাত হয়েছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার সূচনালগ্নেই। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে সদ্যোজাত বাংলাদেশের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান থেকে লন্ডন হয়ে যেদিন দেশে ফেরেন, সেদিন ঢাকায় বিমানবন্দরে সবচেয়ে গর্হিত কাজটি করেছিলেন জাতীয় দৈনিকের একজন সম্পাদক। তিনি মাথা নুয়ে শেখ সাহেবকে পা ছুঁয়ে সালাম করেন। সাংবাদিক সমাজে তিনি ‘কদমবুসি সম্পাদক’ হিসেবে চিত্রিত হয়েছিলেন। তার সেই চরণছোঁয়া প্রণতি অন্যদের মধ্যে সংক্রমিত হওয়ার পাশাপাশি নতুন শাসকদের মানসপটে যে গরিমা সঞ্চারিত করে, তার পরিণতি অনিবার্যভাবেই হয়েছিল স্বৈরশাসনের দিকে যাত্রা। আমরা পরবর্তীকালেও দেখেছি আত্মমর্যাদাহীন এই বশংবদ সংস্কৃতি কীভাবে ফ্যাসিবাদের লালন ও বিকাশে ভূমিকা রেখেছে। ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট ভোগের উৎকট বাসনায় আমাদের সমপেশার বন্ধুরাই কীভাবে শয়তানের কাছে তাদের আত্মাকে বন্ধক রেখেছেন।

এডওয়ার্ড আর মারোর আরেকটি কথা বলে নিই। তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা অনেকেই হয়তো মনে করি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ছাড়া আমরা নিজেরা মুক্ত থাকতে পারব না। আর তাই আমরা সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ব্যাকুল হয়ে চাই।’ এ উক্তির ব্যাখ্যা দরকার নেই। সোজাসাপটা কথা হচ্ছে, আমাদের নিজেদের অধিকার ও লিবার্টি বজায় রাখতে হলে ফ্রিডম অব প্রেস থাকতে হবে অবশ্যম্ভাবীভাবেই।

গণতন্ত্র, মুক্তবুদ্ধি এবং মানবিক মর্যাদার অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হলো সংবাদপত্রের স্বাধীনতা। আর এ নিয়ে কথা বলতে গেলে অপরিহার্যভাবে এসে যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং তৃতীয় রাষ্ট্রপতি টমাস জেফারসনের একটি কালজয়ী মন্তব্য। সংবাদপত্রের গুরুত্ব বোঝাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, ‘যদি আমাকে সিদ্ধান্ত নিতে বলা হয় যে, আমাদের কি সংবাদপত্রহীন সরকার থাকা উচিত, নাকি সরকারহীন সংবাদপত্র থাকা উচিত; তবে আমি দ্বিতীয়টি বেছে নিতে দ্বিধা করব না।’

জেফারসনের এই দর্শনের অন্তর্নিহিত সত্য হলো—সরকার বা রাষ্ট্রব্যবস্থা ভুল করতে পারে, স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে পারে; কিন্তু জাগ্রত, মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে পারে। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকারের চেয়েও ক্ষমতার যে ভারসাম্য এবং জবাবদিহিতা বেশি জরুরি, সংবাদপত্র হলো সেই জবাবদিহিতার প্রধান হাতিয়ার। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী, যখনই কোনো ভূখণ্ডে ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসেছে, তারা সবার আগে জেফারসনের এই দর্শনের ওপর আঘাত হেনেছে।

ফ্যাসিবাদ ও মিডিয়া : একটি মিথস্ক্রিয়া

ফ্যাসিবাদ কী? ফ্যাসিবাদ হলো এমন এক চরম কর্তৃত্ববাদী রাজনৈতিক আদর্শ, যা রাষ্ট্রক্ষমতাকে একক ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত করে। এটি ভিন্নমতকে নির্মমভাবে দমন করে, আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখায় এবং একটি কাল্পনিক ‘শত্রু’ বা ‘জাতীয় সংকট’ তৈরি করে জনগণের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে।

মিডিয়া ও ফ্যাসিবাদের সম্পর্ক

তাত্ত্বিকভাবে মিডিয়া হলো ফ্যাসিবাদের চিরশত্রু। কারণ মিডিয়ার কাজ সত্য উন্মোচন করা, আর ফ্যাসিবাদের ভিত্তি দাঁড়িয়ে থাকে মিথ্যার ওপর।

মিডিয়া কি ফ্যাসিবাদ রুখতে পারে? উত্তর হলো—হ্যাঁ, পারে। যদি মিডিয়া সাহসিকতার সঙ্গে ‘ফোর্থ এস্টেট’ বা রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে নিজের ভূমিকা পালন করে। কিন্তু যখন মিডিয়া ভয়, প্রলোভন কিংবা আদর্শিক দেউলিয়াত্বের কারণে আপস করে, তখন সে ফ্যাসিবাদ রুখতে তো পারেই না, উল্টো ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় প্রচারযন্ত্র বা প্রোপাগান্ডা মেশিনে পরিণত হয়।

সমাজতন্ত্রের আড়ালে ফ্যাসিবাদ : বৈশ্বিক ও দেশীয় প্রেক্ষাপট

বিশ শতকের তিরিশের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত বিশ্বরাজনীতিতে একটি কুৎসিত প্রবণতা দেখা গেছে। পৃথিবীর বহু স্বৈরাচার ও ফ্যাসিস্ট শাসক নিজেদের ক্ষমতা আঁকড়ে রাখতে পপুলিস্ট ‘সমাজতন্ত্রী’র মুখোশ পরতেন। বেনিটো মুসোলিনি থেকে শুরু করে পূর্ব ইউরোপের বহু শাসকই এই মডেল ব্যবহার করেছেন, যেখানে জনকল্যাণের রোমান্টিক স্লোগান দিয়ে আসলে সমস্ত নাগরিক অধিকার হরণ করা হতো।

১৯৭২-৭৫ সালের বাংলাদেশের ইতিহাসও এই বৈশ্বিক প্রবণতার বাইরে ছিল না। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ব্যর্থতা, দুর্ভিক্ষ, চরম অব্যবস্থাপনা এবং লুণ্ঠনের ফলে যখন তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার চরম অজনপ্রিয় হয়ে পড়ে, তখন শেখ মুজিবুর রহমানও সেই চেনা ‘স্বদেশি মডেলের সমাজতন্ত্রী’র রূপ ধারণ করেন। তিনি নিজের নামে ‘মুজিববাদ’ থিওরি চালু করেন, যার পোশাকি নাম দেওয়া হয়েছিল ‘শোষিতের গণতন্ত্র’।

এই ‘শোষিতের গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার নামে ১৯৭৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি এক অধ্যাদেশের মাধ্যমে সমস্ত রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে ‘বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ’ (বাকশাল) নামক একক দল গঠন করা হয়।

১৬ জুন : সাংবাদিকতার অপমৃত্যু ও সংবাদপত্রের কালো দিবস

বাকশালি ব্যবস্থার চূড়ান্ত ও নির্মম আঘাতটি আসে গণমাধ্যমের ওপর। ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন তৎকালীন সরকার দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক বাংলা, বাংলাদেশ অবজারভার এবং বাংলাদেশ টাইমস—মাত্র এই চারটি পত্রিকা সরকারি ব্যবস্থাপনায় চালু রেখে দেশের বাকি সব সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বা নিবন্ধন বাতিল করে দেয়। ১৬ জুনের এই কালো দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘সংবাদপত্রের কালো দিবস’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে। এই একটি সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবাদিকতা পেশার অপমৃত্যু ঘটানো হয়। মুক্ত সাংবাদিকতার মৃত্যু ঘটিয়ে সাংবাদিকদের অধঃপতিত করা হয় স্রেফ সরকারি প্রেসনোট বা তথ্যবিবরণী লেখকের স্তরে।

বেকারত্ব ও হাহাকার

বাকশালে যোগ দিতে অস্বীকারকারী শত শত সাংবাদিক রাতারাতি বেকার হয়ে পড়েন। জীবিকার তাগিদে সাংবাদিকদের ফুটপাতে ফলের দোকান খুলতে হয়েছিল, যা সে সময়ের চরম নির্মমতার এক ঐতিহাসিক প্রতীক। অনেক সাংবাদিক বাধ্য হয়ে বাকশালে যোগ দিলেও তারা আর স্বাধীন সাংবাদিক থাকতে পারেননি। তাদের অনেককে অন্য সরকারি চাকরিতে পুনর্বাসন করা হয়, কিংবা নামমাত্র ‘বেকার ভাতা’ দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়।

এর আগেও দৈনিক গণকণ্ঠ, হক কথা, হলিডে, গণশক্তি, লাল পতাকা, মুখপত্র, বাংলার মুখসহ অনেক পত্রিকা বন্ধ করা হয়। কবি আল মাহমুদ, এজেডএম এনায়েতুল্লাহ্‌ খান, সৈয়দ ইরফানুল বারীসহ অনেক সম্পাদক ও সাংবাদিককে কারারুদ্ধ করা হয়েছিল।

এই দমবন্ধ পরিস্থিতি থেকে জাতিকে মুক্ত করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। ১৯৭৫ সালের পটপরিবর্তনের পর তিনি বাকশালি ব্যবস্থার অবসান ঘটান, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করেন এবং সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও বাতিল হওয়া পত্রিকাগুলোর ডিক্লারেশন ফিরিয়ে দিয়ে মুক্ত গণমাধ্যমের দুয়ার আবার উন্মোচন করেন। জিয়াউর রহমান নিজে সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে একাত্মবোধ করতেন। ছোটবেলায় মাতৃহারা জিয়াউর রহমানকে মাতৃস্নেহে তার এক চাচি লালন করেছিলেন। সেই চাচির সন্তান সাংবাদিকদের কাছে ‘তারা ভাই’ বলে খ্যাত ফওজুল করিম ছিলেন দৈনিক বাংলার বার্তা সম্পাদক। জিয়াউর রহমান তাকে সহোদর বড় ভাইয়ের মতো সম্মান করতেন। তার কারণেই জিয়াউর রহমান সময়-সুযোগ পেলেই দৈনিক বাংলা-টাইমস ভবনে ছুটে আসতেন সময় কাটাতে। এর মাধ্যমে সাংবাদিকদের সঙ্গে গড়ে উঠেছিল জিয়াউর রহমানের নিবিড় ঘনিষ্ঠতা। তিনি যখন বিভিন্ন অঞ্চলে সফরে যেতেন, তখন একদল কৃতী সাংবাদিক হতেন তার সফরসঙ্গী। রাষ্ট্রপতির জন্য নির্ধারিত হেলিকপ্টারে মন্ত্রী, দলের নেতা ও অতি প্রয়োজনীয় কয়েকজন অফিস স্টাফ ও নিরাপত্তারক্ষী দল থাকত। কিন্তু রাষ্ট্রপতি জিয়া বেশিরভাগ সময়ে উঠে বসতেন মিডিয়ার হেলিকপ্টারে। সেই হেলিকপ্টারে বসেই তিনি অনেক সাংবাদিককে সাক্ষাৎকারও দিতেন। তার আমল ছিল সাংবাদিকতার স্বাধীনতার স্বর্ণযুগ। সাংবাদিকদের আবাসের ব্যবস্থা, জাতীয় প্রেস ক্লাব ভবন তৈরি, প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) প্রতিষ্ঠা, প্রেস কাউন্সিল গঠন এবং সংবাদপত্রসেবীদের জন্য প্রথম বেতন বোর্ড রোয়েদাদ ঘোষণা রাষ্ট্রপতি জিয়াই করেছিলেন। তার শাহাদাতের পর বাংলাদেশে এরশাদের সামরিক স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার পটভূমিতে সাংবাদিকতা ফের শেকলবন্দি হয়েছিল।

বাংলাদেশের সাংবাদিকদের একটি গৌরবোজ্জ্বল অতীত রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে সাংবাদিক সমাজ রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত এই গৌরবময় ঐতিহ্য থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিক সমাজ শেখ মুজিব এবং পরবর্তী সময়ে তার কন্যা শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

বিশেষ করে শেখ হাসিনার বিগত ১৫ বছরেরও বেশি সময়ের শাসনামলে ফ্যাসিবাদ এক নতুন ও নিষ্ঠুরতম রূপ ধারণ করে। এ সময়ে গণমাধ্যমের ওপর যে নিপীড়ন চলেছে, তা এককথায় নজিরবিহীন।

মিডিয়া বন্ধের উৎসব

দৈনিক আমার দেশ, দৈনিক দিনকাল, চ্যানেল ওয়ান, দিগন্ত টিভি, ইসলামিক টিভিসহ ভিন্নমতের অনেক সংবাদপত্র ও টেলিভিশন চ্যানেল গায়ের জোরে বন্ধ করে দেওয়া হয়।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের নিষ্ঠুরতা

কালো আইনের বেড়াজালে বন্দি করে সত্য প্রকাশের অপরাধে সাংবাদিকদের জেলে পোরা হয়। যায়যায়দিন সম্পাদক শফিক রেহমান, আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন নেতা রুহুল আমিন গাজী, সাংবাদিক অলিউল্লাহ্‌ নোমান, কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোরসহ অনেককে মিথ্যা মামলায় জেলে ভরা হয়। কিশোরের সহবন্দি মুশতাক আহমেদ কারাগারে রহস্যজনকভাবে মারা যান। আটক অবস্থায় মাহমুদুর রহমানের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। তিনি মামলায় হাজিরা দিতে আদালতে গেলে সরকার-সমর্থক গুন্ডারা হামলা চালিয়ে তাকে রক্তাক্ত করে। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী রেজিম-সমর্থকরা দৈনিক সংগ্রাম অফিসে ঢুকে বয়োবৃদ্ধ সম্পাদক আবুল আসাদকে দৈহিকভাবে নিগৃহীত করে এবং তাকে পুলিশে সোপর্দ করে। বিনা দোষে তাকে দীর্ঘকাল জেল খাটতে হয়। সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির পৈশাচিক হত্যাকাণ্ডের বিচার এক যুগেও না করে বিচারহীনতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা হয়। ফটো সাংবাদিক শফিকুল ইসলাম কাজলকে ধরে নিয়ে গিয়ে ৫৩ দিন গুম করে রেখে নির্যাতন চালানো হয়। বিজ্ঞাপন বন্ধ ও সারা দেশে শত শত মামলা দায়েরের মাধ্যমে অনেক পত্রিকার সাংবাদিকদের ভীতসন্ত্রস্ত করে রাখা হয়। মিডিয়ায় গোয়েন্দা সংস্থার খবরদারি ও ভীতিপ্রদর্শন ছিল নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। তালিকা দীর্ঘ না করে শুধু এটুকু বলব, হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিম নির্যাতন চালিয়ে এবং লোভটোপ দিয়ে ও সুবিধা বিলিয়ে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রায় সম্পূর্ণ হরণ করে নিয়েছিল। অনেক সাংবাদিক নির্যাতন এড়াতে বিদেশে পালালে দেশে তাদের স্বজনেরা ফ্যাসিবাদী নিগ্রহের শিকার হয়েছেন। সোশ্যাল মিডিয়ার ভিন্নমতও দমন করা হতো নিষ্ঠুর পন্থায়। ‘স্টিক অ্যান্ড ক্যারট’ কৌশলে হাসিনা রেজিম গণমাধ্যমকে পঙ্গু ও ক্লীবে পরিণত করে। একদল সাংবাদিকও তখন নির্লজ্জ ও ন্যক্কারজনকভাবে ফ্যাসিবাদের জুলুম-অপকর্মের বৈধতা উৎপাদনে লিপ্ত হয়। ফ্যাসিবাদের পতনের পর তাদের আয়ের সঙ্গে সংগতিহীন বিপুল সম্পদের সন্ধান থেকে বোঝা যায়, অবৈধ শাসকদের সঙ্গে যোগসাজশ করেই তারা প্রশ্নবিদ্ধ সম্পদ করায়ত্ত করেছিলেন।

স্তাবক গোষ্ঠীর উত্থান

হাসিনার ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল মিডিয়াকে দমন করার চেয়েও মিডিয়াকে ‘কিনে নেওয়ায়’। করপোরেট সুবিধা এবং ক্ষমতার উচ্ছিষ্ট বিলিয়ে গণমাধ্যমের ভেতরেই এক বিশাল ‘স্তাবক ও চাটুকার গোষ্ঠী’ গড়ে তোলা হয়। টকশো, সম্পাদকীয় এবং সংবাদে ফ্যাসিবাদের পক্ষে সাফাই গাওয়া সাংবাদিকতার মূল স্রোতে পরিণত হয়েছিল। ফলে সাংবাদিক সমাজ সম্মিলিতভাবে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে ব্যর্থ হয়।

বর্তমান প্রেক্ষাপট

বিপুল ত্যাগ ও আত্মদানের রক্তসিক্ত পথ বেয়ে রাজনৈতিক আন্দোলনের উত্থান-পতন এবং অবশেষে ছাত্র-তরুণদের ক্ষোভের স্ফুলিঙ্গ থেকে সৃষ্ট গণঅভ্যুত্থানের দাবানলে দেশ ফ্যাসিবাদের কবল থেকে মুক্ত হয়েছে। গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত একটি সরকার এখন রাষ্ট্র পরিচালনা করছে। এখন শুরু হয়েছে আমাদের জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় জীবনের গঠন কিংবা পুনর্গঠন পর্ব। ভেঙে তছনছ হয়ে যাওয়া সব প্রথা-প্রতিষ্ঠান ফের নতুন করে গড়তে হবে। বাকশালি ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তূপে জিয়াউর রহমানকে এই গঠন পর্বে নেতৃত্ব দিতে হয়েছে। এরশাদের স্বৈরাচারী শাসনাবসানে বেগম খালেদা জিয়াকে নেতৃত্ব দিতে হয়েছিল গণতান্ত্রিক পুনর্গঠন পর্বে। এখন তাদের উত্তরসূরি হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ওপর ফের গঠন পর্বের নেতৃত্ব দেওয়ার ঐতিহাসিক কর্তব্য ন্যস্ত করেছে সময়। এই কর্তব্য ঐক্যবদ্ধ জাতি গঠনের। এই কর্তব্য রাষ্ট্রীয় সব প্রথা-প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার। এই কর্তব্য লুণ্ঠিত অর্থনীতি পুনর্নির্মাণের। পুলিশ, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা, প্রতিরক্ষা শক্তি সক্রিয় করা ও জাতীয় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা সেই কর্তব্যের অংশ। আমরা এই গঠন পর্বে গণমাধ্যম পুনর্গঠনের কাজে গণতান্ত্রিক সরকারের সারথি ও সহযোগী হতে চাই। সেই প্রাথমিক লক্ষ্য নিয়েই ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিলের অভ্যুদয়। ফোর্থ এস্টেট সুগঠিত না হলে গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়বে, মানুষ স্বাধীনতা হারাবে, ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার ঝুঁকি বাড়বে। ফ্যাসিবাদ সাংবাদিকতা পেশার অপব্যবহার করেছে, এই পেশার সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্রীড়নক বানিয়েছে, সম্পাদকদের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ এবং তাদের বিভক্ত করেছে। এই ক্লেদাক্ত অতীত মুছে দিয়ে আজ সাংবাদিকতা পেশা এবং এই পেশায় নিয়োজিত পেশাজীবীদের শুদ্ধ ও ঐক্যবদ্ধ করতে হবে। আমরা সব পেশাজীবী সম্পাদককে এক পাটাতনে দাঁড় করাতে ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে যাত্রা শুরু করেছি। আমরা এ ক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতা চাই। তারা যেন বিভক্তিকামিতাকে কোনোভাবেই সহায়তা না করেন। আমরা মনে করিয়ে দিতে চাই, ফ্যাসিবাদ-উত্তর বাংলাদেশে মিডিয়া ও রাষ্ট্রব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রয়োজন, যেন আর কোনোদিন কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম হতে না পারে।

মিডিয়া পুনর্গঠনে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন অপরিহার্য। এ ক্ষেত্রে সময়ক্ষেপণ না করাই ভালো। এই কমিশন মিডিয়ার প্রতিটি ক্ষেত্রের বিরাজমান সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের পথ বাতলাবে। তারা নীতি, আইন ও কাঠামো প্রণয়ন করবে। মিডিয়ার ও সাংবাদিকদের বিপথগামিতা এবং অপসাংবাদিকতার পথ বন্ধ করবে। পেশাগত ও বাণিজ্যিক উভয় দিক দিয়ে মিডিয়া বিকাশের ব্যবস্থা দেখাবে। পেশাগত উৎকর্ষ ও এথিক্যাল জার্নালিজমকে এগিয়ে দেবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সক্রিয় ও শক্তিশালী করবে। সর্বোপরি রাষ্ট্রের গণমাধ্যম-সংক্রান্ত নীতিকৌশল নির্ণয় করবে।

আপনারা জানেন, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও খ্যাতনামা রাজনৈতিক নেতা আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে প্রেস কমিশন গঠন করেছিলেন। সেই কমিশনের রিপোর্ট ও সুপারিশ কখনো আলোর মুখ দেখেনি। তবে ওই উদাহরণ মাথায় রেখেই সাবেক একজন বিজ্ঞ প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গণমাধ্যম কমিশন গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি। কমিশনে তথ্য ও আইন মন্ত্রণালয়, ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল, সংবাদপত্রসেবীদের বিভিন্ন ট্রেড ইউনিয়ন ও জাতীয় প্রেস ক্লাবের প্রতিনিধি থাকতে পারেন।

ফ্যাসিবাদী আমলে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধের দায়ে যেসব সাংবাদিক অভিযুক্ত ও আটক হয়েছেন, তাদের মামলাগুলো পর্যালোচনা করে করণীয় সুপারিশ করতে তথ্য, আইন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং সম্পাদক, সাংবাদিক ও সুপ্রিম কোর্ট বার সমিতির উপযুক্ত প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের আহ্বান জানাচ্ছি। নাহলে সরকার দ্রুতই আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে পড়ে যাবে এবং প্রশ্নের মুখে পড়বে।

শেখ হাসিনা প্রেস ট্রাস্ট বিলুপ্ত ও ট্রাস্ট পরিচালিত ঐতিহ্যবাহী পত্রিকাগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলেন। সাংবাদিকতা পেশার স্বার্থে প্রেস ট্রাস্ট পুনরুজ্জীবন ও স্বাধীনভাবে পুনর্গঠনের মাধ্যমে ট্রাস্ট পত্রিকাগুলো পুনঃপ্রকাশ এবং লাভজনকভাবে পরিচালনার কথা ভাবার জন্য গণতান্ত্রিক সরকারের প্রতি অনুরোধ জানাচ্ছি।

সম্পাদকদের মর্যাদা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, মিডিয়ায় সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর কমানোর ব্যাপারে দ্রুত সুবিবেচনাপ্রসূত সিদ্ধান্ত ও উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আজকের সভার প্রধান অতিথি তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

সরকার ও জনগণের মধ্যে সেতুবন্ধ রচনা করতে প্রতি মাসে সরকারপ্রধানের সঙ্গে সম্পাদকদের বৈঠক হওয়া উচিত এবং এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও তথ্য মন্ত্রণালয় যথাযথ উদ্যোগ নেবে বলে আশা করি।

বিপুল শোণিতপাতে আমরা বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্র অর্জন করেছি। গণতন্ত্র, মানবতা, মানবাধিকার, সাম্য, শান্তি, নাগরিক অধিকার, মতপ্রকাশের অবারিত স্বাধীনতা—এগুলো আমাদের রাষ্ট্র ও জাতিসত্তার ‘কোর ভ্যালুজ’। ইতিহাসের মোড়ে মোড়ে রক্তসিঞ্চিত দীর্ঘ সংগ্রামে আমরা এসব মূল্যবোধ অর্জন করেছি। এগুলো রক্ষা ও বিকশিত করতে হবে। আমাদের মিডিয়ার পুনর্গঠনও সেই লক্ষ্যাভিসারী হওয়া উচিত বলেই মনে করি।

সব শেষে বলব, কারো প্রতি অনুরাগ-বিরাগের বশে নয়, সংবাদপত্রের কালো দিবস পালনের মাধ্যমে আমরা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সমুন্নত রাখতে চাই। আমরা এই অঙ্গীকারে দীপ্ত হতে চাই—আমরা ঐক্যবদ্ধ থাকব, সোচ্চার থাকব, সাহসী ও সক্রিয় থাকব, যেন আর কোনোদিন ফ্যাসিবাদ না ফেরে; যেন গণতন্ত্র অটুট থাকে।

লেখক : সম্পাদক, প্রতিদিনের বাংলাদেশ

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন