ভারতের জেন-জি আন্দোলন এবং চব্বিশের বিপ্লব

কাকন রেজা

ভারতের জেন-জি আন্দোলন এবং চব্বিশের বিপ্লব
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের জেন-জি আন্দোলনের সঙ্গে আমাদের জুলাই বিপ্লবের মিল খুঁজে পেয়েছেন অনেকেই। পুলিশের প্রিজন-ভ্যানের সামনে দাঁড়িয়ে যাওয়া রিয়ার সঙ্গে আমাদের ‍নুসরাতের মিল খুঁজে পাওয়া গেছে। এমন অনেক মিলই রয়েছে চব্বিশের বাংলাদেশ আর ছাব্বিশের ভারতের সঙ্গে। কিন্তু অমিল যেটা রয়েছে, সেটি নিয়ে কথা বলা হয়নি খুব একটা। না, আমাদের দেশে, না ভারতে।

কী অমিল ছিল? অমিল ছিল রাজনৈতিক শিক্ষার। আমাদের চব্বিশ থেকে ভারত শিক্ষা নিয়েছে, কিন্তু আমরা নিজেরাই খোদ শিক্ষা নিতে ব্যর্থ হয়েছি। কী শিক্ষা নিয়েছে ভারত, সেটা বলতে গেলে, প্রথমেই চলে আসে এত বড় আন্দোলনে পুলিশের গুলিতে একজন শিক্ষার্থীরও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। পুলিশকে বাংলাদেশের মতো ব্রুটাল হতে দেখা যায়নি। যার ফলেই শিক্ষার্থীর আন্দোলন অনেক চিল মুডে ছিল। রিলস হয়েছে, মিম হয়েছে, গান-বাজনা হয়েছে। মূলকথা বিনোদনের ঘাটতি ছিল না কোথাও। কিন্তু আমাদের চব্বিশের বিপ্লবকালীন সময়ে এমন চিল করার চিন্তাও অসম্ভব ছিল। গুলির ভয়, গ্রেপ্তার আতঙ্ক, গুমের ভয়াবহতা সব মিলিয়ে এক অসহনীয় পরিস্থিতি। প্রতিটা মুহূর্তে জীবনের শঙ্কা। ভারতে তা ছিল না। কারণ মোদি সরকার বাংলাদেশের চব্বিশ থেকে শিক্ষা নিয়েছিলেন। যার ফলেই পুলিশের বাড়াবাড়ি ছিল না। পুলিশের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলতে পেরেছে সেখানকার জেন-জিরা। পুলিশের সঙ্গে ঠাট্টা-মশকরাও করেছে তারা। মোদি সরকার বুঝেছিল যে, একটা মৃত্যুর ঘটনা ঘটলেই ক্ষমতার গণেশ উল্টে যেতে পারে। সরকার রক্ষা করতে মোদি তাদের অন্যতম প্রধান নেতা শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করেছেন। তারা জানত ধর্মেন্দ্রকে রক্ষা করতে গেলে আন্দোলনে চলে যাবে নো রিটার্নে এবং বাংলাদেশের মতো একদফায়। মোদির পতন ছাড়া তখন জেন-জিদের সম্মুখে বিকল্প কিছু থাকবে না। পরিস্থিতিকে সেই নো রিটার্নে যেতে দেয়নি মোদি সরকার। কারণ তারা বাংলাদেশের চব্বিশ থেকে শিক্ষা নিয়েছিল। ফলে তারা এখন পর্যন্ত টিকে আছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের চব্বিশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতা নাহিদ, সারজিস, হাসনাতরা কোটা বিষয়ে যে দাবি তুলেছিলেন, তা মেনে নিলেই চব্বিশের আন্দোলন সেখানেই থেমে যেত। সরকারের গোঁয়ার্তুমি, হিংস্রতা, প্রতিশোধপরায়ণতা—সব মিলে কোটাবিরোধী আন্দোলনকে বিপ্লবে পরিণত করেছিল। ভারতের মোদি সরকার তাদের জেন-জিদের বাংলাদেশ স্টাইলে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়নি। ফলেই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগেই আন্দোলন থেমে গেছে। আন্দোলনকে বিপ্লবে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। যে যে কথাই বলুন, সত্য স্বীকার করতে হবে যে, মোদি সরকার বাংলাদেশ থেকে রাজনৈতিক শিক্ষাটা গ্রহণ করেছেন।

কেন করেছেন, তার কারণ হলো, ভারতের দীর্ঘদিন ধরে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। তারা জানেন, তাদের ভোটের মাধ্যমেই ক্ষমতায় আসতে হবে। ভোট কিছুটা রিগ করা যাবে, হয়তো কিছুটা অনিয়মও করা যাবে, কিন্তু তারপরও ফিরতে হবে ভোটারদের কাছেই। ভোটারদের উল্লেখযোগ্য অংশ তরুণদের ক্ষেপিয়ে আর যাই হোক ক্ষমতায় ফেরা কঠিন হবে।

কিন্তু আমরা চব্বিশের বিপ্লব থেকে কী শিক্ষা নিয়েছি! কদিন আগে একজন কলিগ বলেছিলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেন থেকে যারা শিক্ষা নেয়নি, সেই নেতারা চব্বিশ থেকে কী শিক্ষা নেবে!’ কথা কি মিথ্যা? না, বৃদ্ধ নেতারা চব্বিশের বিপ্লবের স্টেকহোল্ডার নন। তারা নিরাপদ দূরত্বে ছিলেন। মূলত তরুণরা ঘটিয়েছে এই বিপ্লব। সাধারণ শিক্ষার্থীরা, রাজনৈতিক দলের তরুণরা, এমনকি শ্রমজীবী তরুণরাও ছিলেন এই বিপ্লবের মূল ফোর্স। ৫ আগস্ট, অর্থাৎ ছত্রিশে জুলাইয়েও অনেক বৃদ্ধ নেতার মুখে শুনেছি ১৭ বছরে তাদের ব্যর্থতার বয়ান করে নিরাশার কথা বলতে। বলতে শুনেছি, ‘১৭ বছরে আমরাই পারিনি, ছেলেপিলেরা আর কী করতে পারবে’—এমন কথা। এই বৃদ্ধের অনেকেই এখনো চব্বিশের জুলাই বিপ্লবকে অনুধাবন করতে পারেননি। পালস বুঝতে পারেননি তরুণদের। সঙ্গে ওয়ান-ইলেভেনে তারা যে নিগ্রহের শিকার হয়েছিলেন, তাও ভুলতে বসেছেন। চব্বিশ-পরবর্তী সময়ে জুলাই বিপ্লবকে আন্ডারমাইন করার চেষ্টা করেছেন এই বৃদ্ধ নেতৃত্বই। সেই বৃদ্ধদের সঙ্গে যোগ হয়েছে সাম্প্রতিক সময়ে কিছু দুরাচারী স্বার্থবাদী। যাদের কেউ কেউ হয়তো চব্বিশের বিপ্লবেও ছিলেন। তেমনি ছিলেন, যেমন একাত্তরে জেল ভেঙে ডাকাতরাও যুদ্ধে যোগ দিয়েছিল, তাদের আর কোনো উপায় ছিল না বলে। পরে তারাই মহান মুক্তিযুদ্ধকে কলঙ্কিত করেছে নানা অপকর্ম করে।

বৃদ্ধদের হীনম্মন্যতার জায়গাটা আমরা বুঝি। জুলাইয়ের যতগুলো ভিডিও ডকুমেন্ট রয়েছে, তাতে কোথাও তাদের মুখাবয়ব দেখা যায় না। কোথাও তাদের ঢঙি বক্তৃতার আলাপ নেই, ফুটেজ নেই। সব জায়গাতেই তরুণরা, তরুণদের মধ্যে থেকে উঠে আসা নেতৃত্বের মুখ। আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি নির্ধারণ করেছে সেই তরুণরাই। কোথাও তারা নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা আছেন, শিল্পীরা আছেন, সাংবাদিকরা রয়েছেন, খেলোয়াড়রা পথে নেমেছেন, কিন্তু বৃদ্ধ নেতারা কোথাও নেই। দাবি করার মতো কৃতিত্ব তাদের নেই। যদিও কৌশলের কথা বলে তারা তাদের অসমর্থতা এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু দিবালোকের মতো এটাই সত্যি, বৃদ্ধ নেতাদের কোনো কৌশল তো দূর কা বাত কোনো অংশগ্রহণই ছিল না চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে। এই ব্যর্থ বৃদ্ধরাই আজকে জুলাই বিপ্লবকে আড়েআড়ালে অস্বীকার করার চেষ্টা করেন। প্রশ্ন তোলেন জুলাই আন্দোলন সংগঠিত করা, অংশগ্রহণকারী তরুণদের প্রতি। তাদের প্রতি পদে পদে ছোট করার চেষ্টা করেন। তাদের এই চেষ্টা তরুণরা খেয়াল করছেন, মনে রাখছেন। তাদের ক্ষোভ বাড়ছে। একসময় ঠিক এই ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটবে। বৃদ্ধদের এই দ্বিচারিতা ব্যাকফায়ার করবে।

বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের দেড় দশক ধরে লিখে এসেছি। দেশ-বিদেশের কাগজে লিখেছি। বলেছি বিভিন্ন সময়ে, আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছি ভুলগুলো, যাতে তারা শোধরাতে পারে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয়নি। সম্ভবত আল্লাহতায়ালা তাদের অন্ধ ও বধির করে দিয়েছিলেন। আল্লাহতায়ালা হয়তো চব্বিশের বিপ্লব তথা নজির সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, যাতে অন্যরা বুঝতে পারে। দুঃখের বিষয় হলো আমাদের বিপ্লব থেকে পাশের দেশের সরকার বুঝলেন, নজিরটা ধরতে পারলেন, কিন্তু আমরা বৃদ্ধরা ধরি ধরি করেও ধরতে পারলাম না। এই না ধরার বিষয়টি আমাদের ভবিষ্যতের জন্য অশনিসংকেত। সেই অশনিকে টলাতে আমাদের চব্বিশের বিপ্লবের পালসটা বুঝতে হবে এবং না বোঝার কোনো বিকল্প নেই। সত্যি নেই।

লেখক : সাহিত্যিক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন