জুলাই শক্তির সংঘাতে কার কী অর্জন-বিসর্জন

জুলাই শক্তির সংঘাতে কার কী অর্জন-বিসর্জন

আজ ২ আগস্ট। এটি সাড়া জাগানো ‘দ্রোহযাত্রা’র দিন। চব্বিশের এ দিন শুক্রবার ছিল। আবু সাঈদ থেকে শুরু করে নির্বিচারে গণহত্যার বিচারের পাশাপাশি আটক সব শিক্ষার্থী ও সাধারণ নাগরিককে ছেড়ে দিতে ‘দ্রোহযাত্রা’ কর্মসূচিতে জড়ো হন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। জাতীয় প্রেস ক্লাব ঘিরে বিক্ষুব্ধ জনতার ঢল নামে। এদিন সারা দেশে জুমার নামাজ শেষে দোয়া ও কবর জিয়ারতের আহ্বান জানিয়েছিল বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। জুমার নামাজ শেষে ছাত্র-জনতার মিছিলের কর্মসূচিও ছিল সেদিন। এই কর্মসূচি ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের পাঁচ জেলায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর, সংঘাত ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এ দিনই উচ্চকিত কণ্ঠে শেখ হাসিনার পদত্যাগের এক দফার ঘোষণা উচ্চারিত হয়। আন্দোলনে যোগ হয় নতুন মাত্রা । ১৬ জুলাই আবু সাঈদ শহীদের মধ্য দিয়ে স্ফুলিঙ্গ থেকে যে গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল, তা কারফিউতে কিছুটা স্তিমিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার পতনের আরেকটি ‘টার্নিং ডে’ বলা যেতে পারে আজকের দিনটিকে।

ডিবি কার্যালয় থেকে ১ আগস্ট ছাড়া পাওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সম্মুখসারির ছয় সমন্বয়ক নাহিদ ইসলাম, সারজিস আলম, হাসনাত আবদুল্লাহ, আসিফ মাহমুদ, আবু বাকের মজুমদার ও নুসরাত তাবাসসুম আজকের দিনে (২ আগস্ট) গণমাধ্যমে একটি যৌথ বিবৃতি পাঠান। তাতে বলা হয়, আন্দোলন প্রত্যাহারের ঘোষণা-সংক্রান্ত ডিবি কার্যালয় থেকে প্রচারিত ভিডিও বিবৃতিটি তারা স্বেচ্ছায় দেননি, জবরদস্তি করে দেওয়ানো হয়েছে। পাশাপাশি বিএনপি-জামায়াতসহ সব রাজনৈতিক দল রাজধানী ঘিরে চূড়ান্ত আঘাত হানে। তিন দিনের মাথায় কাচের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে দেড় দশকের নিষ্ঠুর ও ফ্যাসিবাদী শাসনের মসনদ।

বিজ্ঞাপন

রক্তস্নাত জুলাই অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এসে অনেক হতাশাজনক চিত্র দেখতে হচ্ছে। হত্যাযজ্ঞের বিচার নিয়ে চলছে টালবাহানা। মানবতাবিরোধী অপরাধ ট্রাইব্যুনালে পতিত ফ্যাসিস্ট শাসক শেখ হাসিনার দু-একটি মামলায় নিষ্পত্তি, সাজা হলেও রাজধানীসহ সারা দেশে খুনিদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলার তদন্ত ও বিচার এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ক্ষমাহীন অবহেলা এবং নির্লিপ্ততা দেখা যাচ্ছে। শহীদ পরিবারগুলো দুবছর পরও বিচারের জন্য আহাজারি করে যাচ্ছে। জুলাই ফিরে এলেই তাদের অশ্রুধারা প্রবল হচ্ছে।

শনিবার একটি সহযোগী দৈনিকের শীর্ষ সংবাদ থেকে দেখা যাচ্ছে*জুলাই আন্দোলন-সংশ্লিষ্ট ১ হাজার ৮৬৫ মামলার মধ্যে হত্যা মামলা ৮০১টি। হত্যাচেষ্টাসহ অন্যান্য অভিযোগে মামলা ১ হাজার ৬৪টি। এসব মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ১ লাখ ৫৪ হাজার ৩৩১ জন। গত ১৩ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১০১টি হত্যা মামলার তদন্ত শেষ করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। শতকরা হিসাবে যা মাত্র ১৪ শতাংশ। আবার তদন্ত শেষ হওয়া মামলাগুলোর মধ্যে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দেওয়া হয়েছে মাত্র ৬৩টি মামলায় এবং ৩৮টিতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) দেওয়া হয়। ৬৩টি হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে আসামি ৫ হাজার ৬৪৭ জন। হত্যাচেষ্টাসহ বিভিন্ন অভিযোগে করা ১৫৮টি মামলার তদন্ত শেষ হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে ১৪০টিতে অভিযোগপত্র এবং ১৮টির চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে আদালতে। অভিযোগপত্রে আসামি ১০ হাজার ৬৬১ জন।

প্রতিবেদনে উঠে আসা তথ্য বলছে, গণঅভ্যুত্থানে হতাহতের ঘটনায় বেশি মামলা হয়েছে ঢাকা মহানগর এলাকায়। মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ৫০ থানায় ৭৮৯টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ৪৭৯টি এবং অন্যান্য অভিযোগে মামলা ৩১০টি। হত্যাসহ বিভিন্ন অভিযোগে ৩৫৪টি মামলায় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ছাড়াও পুলিশের ৪১২ সদস্যকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন, এ কে এম শহীদুল হক এবং সাবেক ডিএমপি কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়াসহ ২৩ পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পুলিশ সদস্য ছাড়া গ্রেপ্তার করা হয়েছে ২ হাজার ১৪১ জনকে। ডিএমপি সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মোট ৭৮৯ মামলার মধ্যে বিগত ২১ জুলাই-২০২৬ পর্যন্ত ৩৭টি মামলার তদন্ত শেষে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা ২৮টি।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে অকাতরে জীবন দানকারী শহীদের মায়েরা এখনও সন্তানের স্মৃতি হাতড়ে নিয়মিত অশ্রু ঝরান। বিধবা পত্নীরা স্বামীর শূন্যতা অনুভব করে গুমরে মরেন। পিতৃ-মাতৃহীন সন্তানের খুঁজে বেড়ান মাথার ওপর থেকে সরে যাওয়া বটবৃক্ষের ছায়া। কিন্তু যারা এই অভ্যুত্থানের বেনিফিশিয়ারি তাদের অনুভবে, আচরণে নেই জুলাই। স্বজনরা বিচারের আশায় বুক বেঁধে প্রতীক্ষায় থাকলেও খুনিদের বিচারের মুখোমুখি করা যাদের দায়িত্ব, তাদের তৎপরতা একেবারে দায়সারা।

চব্বিশের অবিস্মরণীয় অভ্যুত্থান ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই বাংলাদেশের জন্য একটি অনন্য ও ঐতিহাসিক গণবিপ্লব হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। পলিমাটির এই ভূখণ্ডের জাতীয় রাজনীতিতে গভীরভাবে গেড়ে বসা ফ্যাসিবাদী শাসনের অবসান ঘটিয়েছে ৩৬ দিনের রক্তাক্ত অভ্যুত্থান। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার নিয়ে শুরু হওয়া আন্দোলন পর্যায়ক্রমে দল-মত-জাতি-শ্রেণি-লিঙ্গনির্বিশেষে আপামর জনতার অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। হাসিনার দীর্ঘ স্বৈরশাসনে নাগরিকরা গুম, খুন, মামলা, হামলাসহ যে দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিলেন; তা থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় অভূতপূর্ব গণবিস্ফোরণ ঘটেছিল।

খুব স্বাভাবিকভাবেই স্বৈরাচারী হাসিনা সরকার তার পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও দলীয় লোকদের দিয়ে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ ও দমন-পীড়ন চালিয়ে আন্দোলন দমন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্রদের বুকে সরাসরি গুলি করে যখন হত্যা করা হয়েছে, তখন সর্বস্তরের নাগরিকরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় নেমে আসেন। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তরের (ওএইচসিএইচআর) প্রতিবেদন বলছে, গণঅভ্যুত্থান পূর্বাপর সময়ে ১ হাজার ৪০০-এর বেশি মানুষ জীবন দিয়েছেন। আহত মানুষের সংখ্যা ১৩ হাজারের বেশি।

ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার জন্য বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্বিচার মারণাস্ত্র দিয়ে গুলি, গ্রেপ্তার, নির্যাতন, চিকিৎসা পেতে বাধা দেওয়ার মতো যেসব গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন করেছেন, শেখ হাসিনা ও তার সহযোগীরা, তার বিচারপ্রক্রিয়ার গতি মোটেই সন্তোষজনক নয়। দুই বছরান্তে বিচারের যে অগ্রগতি, তা খুবই হতাশাজনক বললে বোধকরি বাড়িয়ে বলা হবে না। চাক্ষুষ ও প্রযুক্তিগত এত এত প্রমাণ থাকার পরও কেন মামলাগুলোর তদন্ত এত শ্লথ এবং অপরাধীদের চিহ্নিত করতে গড়িমসি, তা বোধগম্য নয়। পুলিশে এখনো ফ্যাসিস্টদের অনুগতরা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাদের কারসাজিতে মামলার তদন্ত ও খুনি চিহ্নিত করা এবং আইনের আওতায় আনার ক্ষেত্রে বিঘ্ন ঘটছে কি না, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। পতিত শক্তির হাতে লুটের বিপুল অর্থ রয়েছে। তার ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে। দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রতিটি হত্যার জন্য দায়ীদের যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই শুধু জুলাই অভ্যুত্থানের হতাহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো যেতে পারে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান স্বতঃস্ফূর্ত হওয়ায় এটি ঘিরে যে জন-আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে, তা ছিল যেমন ব্যাপক, আবার বহুমাত্রিকও। দুবছর পর এসে অনেক ক্ষেত্রেই সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বিস্তর অমিল থাকাটা পরিতাপের। বেদনাদায়কও বটে। বিশেষ করে, প্রথমদিকে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজের কথা ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও সময় যত গড়িয়েছে, জুলাইয়ের পক্ষের শক্তির মধ্যে বিরোধ-বিভাজন চাঙা হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুই বছরেও স্বাভাবিক অবস্থায় না ফেরা এবং অপরাধ বেড়ে যাওয়াটাও মানুষের অস্বস্তির বড় কারণ।

দুই বছরে জনমানসে যে বড় পরিবর্তন এসেছে, সেটিই এই অভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় অর্জন। ফ্যাসিবাদী শাসনে ডিজিটাল সিকিউরিটি বা সাইবার নিরাপত্তা আইনের মতো নিপীড়নমূলক আইনের কারণে মতপ্রকাশ ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ব্যাপকভাবে সংকুচিত হয়ে পড়েছিল এবং সব পর্যায়ে ভয়ের সংস্কৃতি জেঁকে বসেছিল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে ডিজিটাল ও বাস্তব*দুই পরিসরেই তর্কবিতর্ক ও কথা বলার সুযোগ বেড়েছে। কিছু ক্ষেত্রে বাধা থাকলেও সমাজের গণতান্ত্রিক উত্তরণের জন্য এ চর্চা অত্যন্ত ইতিবাচক।

কয়েক দিনে হবিগঞ্জ, সিলেট, কুড়িগ্রাম ও বগুড়ায় যা ঘটেছে, তা জুলাইয়ের চেতনার সুস্পষ্ট পরিপন্থী। এনসিপি নেতা নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর বক্তব্য ঘিরে সরকারি দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে যে অসহিষ্ণু আচরণ দেখা যাচ্ছে, তা গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য নয়। নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর অসংযত ও লাগামহীন বক্তব্য যেমন সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশের অন্তরায়, তেমনি কথার জবাব লাঠি, রামদার ভাষায় কিংবা পেশিশক্তির প্রদর্শনের মাধ্যমে দেওয়া ফ্যাসিস্ট শাসনের চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সম্প্রতি সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সংবাদ মাধ্যমে তার সমালোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, তিনি সহ্য ক্ষমতা বাড়াতে চামড়া মোটা করে নিয়েছেন। এর আগে শিশিরের ব্যঙ্গ কার্টুনকে তিনি স্বাগত জানিয়েছেন। ভিন্নমত হজমের কথা তিনি বিভিন্ন সময়ে বলেছেন। কিন্তু মাঠের নেতাকর্মীরা হাঁটছেন উল্টো পথে।

এনসিপির যেমন উচিত নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে থামানো, তেমনি বিএনপি ও সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের কর্তব্য বক্তব্যের জবাব হামলা, রক্তাক্ত করা কিংবা চোখ বিনষ্ট করার মাধ্যমে দেওয়ার প্রবণতায় যারা জড়িত, তাদের এখনই সামলানো। কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য রাজনৈতিক শিষ্টাচার পরিপন্থী আর ক্ষমতার ছায়ায় কথায় কথায় হামলে পড়া সুস্পষ্ট ফৌজদারি অপরাধ ও স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্রের প্রকাশ। কালবিলম্ব না করে এখনই এ ধরনের প্রবণতা রোধ না করা গেলে পতিত শক্তি ঘোলা পানিতে বড় ধরনের শিকার করে বসতে পারে।

অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সারা দেশে এনসিপির ওপর হামলা আরো বাড়বে। বিএনপি তো বটেই সাধারণের একটি অংশও সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে হামলাকে মৌন সমর্থন দিচ্ছে। আওয়ামী লেসপেন্সার ও সমর্থকরা উদ্‌যাপন করার পাশাপাশি এনসিপি নেতাকর্মীদের হত্যাযোগ্য করে তুলতে চাইছে সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে। বুঝে না বুঝে বিএনপির অনেক নেতাকর্মীও বলছেন, পাটওয়ারীদের কটূক্তি ও নোংরা বক্তব্যের জবাব মাইরের মাধ্যমে দেওয়া ঠিকই আছে। কিন্তু তারা ভুলে যাচ্ছেন, এটি আওয়ামী স্টাইল। জনমতের বিপরীতে। এনসিপি নবগঠিত দল হয়েও সংসদের তৃতীয় বৃহৎ দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে এভাবেই। তারা যদি ‘সহানুভূতি কার্ড’ নিয়ে রাজনীতিতে এগোনোর কৌশল নিয়েও থাকে, তাতে সহায়ক ভূমিকায় রয়েছে বিএনপির।

এনসিপিকে বড় দল বানানোর দায়িত্ব বিএনপি বা অন্য কোনো গোষ্ঠী নিয়ে থাকলে সেটি আলাদা কথা। গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারিতে থাকা ছাত্রনেতাদের এ দল এবারের জুলাইয়ে কর্মসূচি নিয়ে মাঠে থাকলেও দু-একটি ছাড়া কোনো মিডিয়া তেমন স্থান দেয়নি। কিন্তু হবিগঞ্জে তাদের ওপর হামলার পর থেকে পুরো ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার রাজনৈতিক সংবাদ তাদের দখলে চলে গেছে। সপ্তাহজুড়ে টকশোগুলো একচেটিয়া এনসিপি ইস্যু লিড পাচ্ছে। সংবাদপত্রগুলো ভেতরের পাতার সিঙ্গেল কলাম থেকে প্রথম পৃষ্ঠায় দু-তিন কলামে তুলে আনতে বাধ্য হয়েছে।

হবিগঞ্জে দুদিনের সহিংস ঘটনার পর সিলেটে এনসিপির পদযাত্রার সমাবেশে লোকসমাগম কয়েক গুণ বেড়ে যেতে দেখা গেছে। সরকারের রাজনৈতিক উপদেষ্টারা এসব কীভাবে বিশ্লেষণ করবেন, সেটি তাদের বিবেচনা। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছেন, গত এক সপ্তাহে এনসিপির অর্জনে বিপরীতে সরকারি দলের রয়েছে বিসর্জন। আন্তর্জাতিকভাবে আগামী দিনে যে রিপোর্ট তৈরি হবে, তাতে হবিগঞ্জে ট্রাক দিয়ে রাজনৈতিক কর্মসূচির পথরোধ এবং হামলা, রক্তাক্ত করা ও একজনের চোখ বিনষ্ট করার বিষয়টি নির্ঘাত উঠে আসবে এবং মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের সূচকে তার প্রভাব দেখা যাবে। সরকারের জন্য যেটি মোটেই সুখকর হবে না।

সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকলেও এমন তথ্যও আসছে, এনসিপির কর্মসূচির বিপরীতে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠন যখন মাঠে নামছে, তাদের সঙ্গে পরিকল্পনামাফিক আওয়ামী লীগের অচেনা অনেক মুখ যোগ দিয়ে এনসিপির ওপর হামলায় অংশ নিচ্ছে। এটি সিলেটের হবিগঞ্জে যেমন ঘটেছে, তেমনি কুড়িগ্রামের হামলায়ও সম্পৃক্ততা মিলেছে। আওয়ামী লীগের উচ্চপর্যায় থেকে সে ধরনের নির্দেশনার তথ্যও আসছে। ফলে এনসিপির ওপর হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও শারীরিক আঘাতের মধ্যে সীমিত না থেকে প্রাণহানির পর্যায়ে গড়ালে আমি অন্তত অবাক হব না। বিএনপির ঘাড়ে বন্দুক রেখে শিকার করতে পারলে আওয়ামী লীগের লাভ দ্বিমুখী। শরিফ ওসমান হাদীর মতো কোনো মর্মান্তিক ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে এবার পুরো দায় বর্তাবে ক্ষমতাসীন সরকার ও দলের ওপর। পরিস্থিতি নাজুক পর্যায়ে গেলে সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়তে পারে।

রাজনীতিতে আর যেন পেশিশক্তির দাপট ও স্বৈরতন্ত্র ফিরে না আসে, সেজন্য রাষ্ট্র, সরকার ও শাসনকাঠামোয় সংস্কারের একটি বড় আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছে চব্বিশের জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের। এটি সত্য যে, আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর যে চর্চা ও বাস্তবতা, তাতে ছয় মাসে বা দুবছরে সব সংস্কার হয়ে যাবে, এমন আশাবাদ বাস্তবসম্মত নয়। জুলাই সনদে বর্ণিত সংস্কার বাস্তবায়নে ধীরে চলো নীতিও সমর্থনযোগ্য নয়। যেসব সংস্কার প্রশ্নে ঐকমত্য হয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নের গতি-প্রকৃতিতে আশাবাদী হওয়ার মতো সুযোগ নেই। ঐকমত্য কমিশনে রাজনৈতিক দলগুলো দিনের পর দিন একসঙ্গে বসে দেশের ভবিষ্যৎ প্রশ্নে যে আলোচনা করেছে, মতৈক্যে পৌঁছেছে, দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে তা ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কিন্তু নির্বাচিত সরকারের প্রায় ছয় মাস অতিক্রান্ত হলেও সেসব বাস্তবায়নে সরকার ও বিরোধী শিবিরের পারস্পরিক বিরোধ দুর্ভাগ্যজনক। সংসদে দুপক্ষের মধ্যে মোটামুটি বোঝাপড়া দেখা গেছে। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, ততই রাজপথে উত্তাপ বাড়ছে। এখনই পারস্পরিক বিরোধ কতদূর নিয়ে যাবে, সে ব্যাপারে গণঅভ্যুত্থানের পক্ষের শক্তিগুলোর গভীরভাবে ভাবা উচিত। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায়িত্বটা অবশ্যই বেশি। যেকোনো ‘প্ল্যান’ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যাবশ্যক। দেশ অস্থিতিশীল হলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ইতিবাচক পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন যেমন গতি হারাবে, তেমনি ফ্যাসিবাদ নতুন করে মাথাছাড়া দেবে। সহনশীল রাজনীতির জয় হোক।

লেখক : যুগ্ম সম্পাদক, আমার দেশ ও রাজনীতি বিশ্লেষক

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন