তখন আলিম পরীক্ষা চলছিল। পরীক্ষার হল থেকে বেরিয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। হঠাৎ কেউ একজন বলে উঠল কোটা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী বেরোবির শিক্ষার্থী আবু সাঈদ পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে আমরা একে-অন্যকে বলাবলি করছিলাম। রাতে এক বিজ্ঞপ্তি দেখে দেশের চলমান পরিস্থিতি কিছুটা আঁচ করলাম। শিক্ষা বোর্ডের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হলো, ‘আগামী ১৮ জুলাই সকল শিক্ষা বোর্ডের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত’। বলছিলাম ১৬ জুলাইয়ের কথা। কিন্তু আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় কোটা আন্দোলনের গতিপথ যে এভাবে পরিবর্তন হবে, তা ভাবতে পারিনি। ১৮ জুলাই সারা দেশে ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সেই কর্মসূচিতে অংশ নিতে এবং কোটাবৈষম্যের প্রতিবাদস্বরূপ ১৮ তারিখ সকাল ৯টার দিকে উপস্থিত হই উত্তরা বিএনএস সেন্টারে। শুরুতে আমি, আমার বন্ধু-বান্ধব আরো অনেকে একসঙ্গেই রাজউক উত্তরা মডেল কলেজের সামনে শান্তিপূর্ণভাবেই অবস্থান করছিলাম। আচমকা গোলাগুলির আওয়াজে আমরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যাই। পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ শুরু করে; শিক্ষার্থীরা দিগবিদিক ছোটাছুটি করে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুরু হয় নিরস্ত্র শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশের তাণ্ডব। সেদিন রণাঙ্গনে সম্মুখসারি থেকে আমি দেখেছি অসংখ্য শিক্ষার্থীর গুলি খাওয়ার দৃশ্য! আমরা অনেকে পূর্বপরিচিত ছিলাম না, তবে সেদিন আমাদের বন্ধন ছিল ইস্পাত-দৃঢ়। একটু আগেও যার হাত ধরে একসঙ্গেই মিছিলে আগাচ্ছিলাম, স্লোগানে স্লোগানে আমাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছিলাম, চোখের সামনেই সে গুলিবিদ্ধ হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েছে। সেদিন পুলিশের নির্বিচার হত্যায় সহযোগী ছিল র্যাব। তারা শুধু রাবার বুলেটই ছুড়েনি, প্রাণঘাতী বুলেটও ছুড়েছিল। কেউ চোখে, কেউ পায়ে আবার কেউ বুকে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। আমি তখন সেই বিভীষিকাময় দৃশ্যের প্রত্যক্ষ সাক্ষী! দুপুরে তা’মীরুল মিল্লাত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি এম এম আল মিনহাজ ভাই চোখে গুলিবিদ্ধ হন, ওনাকে নিয়ে যাওয়া হয় প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য। দুপুরের খানিকটা পরের ঘটনা, কয়েকজন পুলিশ সদস্য হ্যান্ডমাইক ব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের কিছু কথা বলার জন্য কাছে ডাকছে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে কয়েকজন তাদের ডাকে সাড়া দিতে এগিয়ে যেতেই পুলিশ নির্দয়ভাবে আবার গুলি চালায়।
কয়েকজন দৌড়ে বিচ্ছিন্ন হতে পারলেও একজন সেখানে গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই শহীদ হন। এই প্রতারণার দৃশ্য কখনো ভুলে যাওয়ার নয়। ঘণ্টাখানেক পর আন্দোলন আর স্লোগানে আমরা যখন পুলিশের খুব কাছে অবস্থান করছিলাম, তারা টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। বিস্ফোরণের আতঙ্কে আমি সেই টিয়ার গ্যাস হাতে তুলে পুলিশের দিকেই আবার নিক্ষেপ করি, আমার হাত পুড়ে যায়। অনেক খোঁজ করেও কোথাও একটু পানি মিলছিল না। হঠাৎ কেউ একজন ঠান্ডা পানি কিনে আমার হাতে ঢালতে শুরু করে, ফলে একটু স্বস্তি পাই। হাতের এই অবস্থা নিয়েই আন্দোলনে সরব ছিলাম বিকাল হওয়া পর্যন্ত; বিকালে একটি রাবার বুলেট আমার পিঠে লাগে। আমার এক সহপাঠী নাহিদকে দেখি তার পিঠজুড়ে রাবার বুলেটে জর্জরিত। বিকালে দেখি চোখে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় কোনোমতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে আমাদের ভিপি আবার আমাদের মধ্যে ফিরে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন, সেদিন তার দায়িত্ববোধের সর্বোচ্চটা দেখেছি। সন্ধ্যার আগে যখন ক্যাম্পাসের দিকে ফিরছিলাম, তখন টঙ্গীর দিকে ছাত্রলীগের ক্যাডাররা যাকে-তাকে আন্দোলনকারী সন্দেহে পেটাচ্ছে। অনেক কৌশল অবলম্বন করে তাদের এড়িয়ে ক্যাম্পাসে পৌঁছে শুনি মিল্লাতের সাবেক শিক্ষার্থী শাকিল পারভেজ ভাই শহীদ হয়েছেন। অন্যদিকে প্রশাসন শিক্ষার্থীদের জরুরি হল ছাড়তে নির্দেশ দেয়। আর সে রাতেই শহীদ শাকিল পারভেজ ভাইয়ের জানাজা শেষে হল ছাড়তে বাধ্য হয়ে মৌচাকে মামার বাসায় পৌঁছাই।
এই আন্দোলনে আমি ও আমার অনেক সহপাঠী আহত হয়েছি। সেদিন উত্তরার সাধারণ মানুষ নিজেদের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে শিক্ষার্থীদের পাশে থেকেছেন, যার জন্য আমরা তাদের কাছে চিরঋণী। পানি, খাবার স্যালাইন, বার্গার, বিস্কুট আর কেক নিয়ে নিজেদের সাধ্যমতো এগিয়ে এসেছেন ও আমাদের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সম্মিলিত এই প্রচেষ্টা ভুলে যাওয়ার নয়।
আমাদের বোনরাও এই আন্দোলনে তাদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন, সাহায্য করেছেন। ১৮ জুলাই আমার জীবনে ঘটে যাওয়া একটি জীবন্ত ইতিহাসের নাম, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাসে অবিস্মরণীয় একটি অধ্যায়!
লেখক : শিক্ষার্থী, আল-কোরআন অ্যান্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় তা’মীরুল মিল্লাত কামিল মাদরাসা, টঙ্গী
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন


