মারুফ কামাল খান

ইতিহাস এক অদ্ভুত চক্রের মতো। সময়ের পরিক্রমায় এর পুনরাবৃত্তি ঘটে, কখনো ভিন্ন আবরণে, কখনোবা একই রূপে।

বিশ শতকের গোড়ার দিকে হিরাম জনসন ছিলেন আমেরিকার বিখ্যাত একজন রাজনীতিবিদ ও আইনজীবী। তিনি ১৯১১ থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত ক্যালিফোর্নিয়ার ২৩তম গভর্নর এবং ১৯১৭ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন সিনেটে ক্যালিফোর্নিয়ার সিনেটর ছিলেন।

বাংলাদেশে এখন সংস্কারের একটি জোরালো হাওয়া বইছে। অর্থনীতি থেকে শুরু করে প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা—সর্বত্রই যেন এক পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা দৃশ্যমান। নানা মহলে রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও আইনি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, যা নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

এ যুদ্ধ তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরিণত হওয়ার আশঙ্কাও করছেন অনেকেই। এ যুদ্ধে প্রাণহানি ও ধ্বংসলীলা ছাড়াও জীবাশ্ম জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ব অর্থনীতিতে গুরুতর প্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার অবশ্যম্ভাবী আশঙ্কা রয়ে গেছে। তবে চলমান এ সংঘাতের হাল অবস্থায় এর প্রভাব, প্রতিক্রিয়া ও ফলাফল সম্পর্কে কোনো উপসংহারে পৌঁছা সম্ভব

সেই বালকবেলায় একুশে ফেব্রুয়ারির প্রত্যুষে ফুল হাতে নগ্নপায়ে ভাষাশহীদদের উদ্দেশে নিবেদিত কোরাস গানে গলা মিলিয়ে প্রভাতফেরিতে শামিল হওয়ার মধ্য দিয়ে কবে

১৯৮১ সালের ৩০ মের গভীর রাতে বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়। চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে বিপথগামী একদল সেনা অফিসারের নির্মম বুলেটে স্তব্ধ হয়ে যায় বাংলাদেশের এক স্বপ্নদ্রষ্টা আপসহীন রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমানের জীবন

এই বাংলাদেশ-ভারত-পাকিস্তান উপমহাদেশে দুটি নাম বোধ করি স্বাধীনতাকামী প্রতিটি মানুষের কাছে সবচেয়ে ঘৃণিত। এর একটি নামের মানুষের লোভ ও বিশ্বাসঘাতকতায় আঠারো শতকে বাংলা-বিহার-ওড়িশার স্বাধীনতা সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার থেকে আসা ব্রিটিশ বেনিয়াদের করতলগত হয়।

খুব অস্থির হয়ে আছি। শুধু আমি নই। দেশে, সমাজে, একালে যারা বাস করছেন তারা সবাই অধীর। পরিস্থিতি অস্থির। সময় অধীর। কী হয়, কী হয় শঙ্কা চারদিকে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার এক ঝড়ো অভ্যুত্থানে হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিম পড়ে যায়। কিন্তু সে অভ্যুত্থান ছিল এক অসমাপ্ত বিপ্লব।

দিল্লির লালকেল্লায় ১৬৪৮ খ্রিষ্টাব্দে মোগল সম্রাট শাহ্জাহান তার কাছে আসা গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বদের দেখা দিতে এবং অভ্যর্থনা জানাতে একটি বিশেষ মহল নির্মাণ করেন। এর নাম দেন দেওয়ান-ই-খাস।

সারা বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল ১৯৭৭ সালে একটি দাবিতে—‘বাংলাদেশে পিস কোর আসতে দেব না।’ আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে বামপন্থি ও ইসলামিস্ট পর্যন্ত সবাই একাট্টা। চারদিকে মিটিং, মিছিল ও বিক্ষোভ। অভিযোগ, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের তল্পিবাহক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সরকার পিস কোর আনছে, দেশটা আমেরিকার হাতে তুলে

পেছনের কথা বাদ, আমরা ২০০৮ সাল থেকে ধরি। আওয়ামী লীগের ‘দিনবদলের সনদ’, ‘রূপকল্প-২০৪১’, ‘ডিজিটাল বাংলাদেশ’, ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’- এ রকম গালভরা হরেক রকম নামের অঙ্গীকারনামার কথা মনে আছে? কী ছিল না তাতে? ওইসব অঙ্গীকার বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ অনেক আগেই এক মহাউন্নত আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হতো।


বাংলাদেশ এখনো নানান অস্থিরতায় ভুগছে। প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলিম শরণার্থী আমাদের জন্য বোঝার ওপর শাকের আঁটি হয়ে আছে। আরেক অতিকায় প্রতিবেশী ভারতের অধিকৃত কাশ্মীরে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমান নাগরিকরা জিন্দানবাসী হয়ে আছেন দীর্ঘকাল ধরে।

সুইডিশ সাংবাদিক বার্টিল লিন্টনারের কথা মনে আছে? বেচারা এখন বুড়ো হয়েছেন। সত্তরের বেশি বয়স হবে। হয়তো এখন কোথাও অবসরজীবন কাটাচ্ছেন। ২৩-২৪ বছর আগে ২০০২ সালে তার এক লেখায় বাংলাদেশে ভূমিকম্পের মতো অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল। তখন তার বয়স পঞ্চাশের কোঠায়।

সপ্তাহে এক দিন কলাম লিখি দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায়। অতি ঘটনাবহুল সময়ে হররোজ কত ঘটনা, রটনা, প্রসঙ্গ ও ইস্যু এসে যায়। তার কটা নিয়েই বা লেখা যায়! এর মধ্যে বাংলাদেশের বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়েছেন। সে ভাষণ পর্যালোচনার সময় সুযোগ হয়নি।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলকে (বিএনপি) ধন্যবাদ। বিশেষ করে ধন্যবাদ দলটির বর্তমান কার্যত শীর্ষনেতা তারেক রহমানকে। কেন ধন্যবাদ তা খুলে বলছি। যারা আমার লেখা পড়েন তারা জানেন, এই কলামেই গত ৭ মার্চ ‘রাজার দল নাকি দলের রাজা’ শিরোনামে লিখেছিলাম

আমার এই লেখা যেদিন দৈনিক আমার দেশ-এ ছাপা হবে তার আগের দিন অর্থাৎ ১৩ মার্চ জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের বাংলাদেশে এসে পৌঁছানোর কথা চার দিনের সফরে। আমাদের স্বাধীনতার মাসে ও পবিত্র রমজানে এদেশের বেশিরভাগ মানুষের ধর্মানুভূতির প্রতি সম্মান দেখাতে তিনি নাকি একদিন রোজা রাখবেন বলেও কথা রটেছে।

বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা তাদের নতুন রাজনৈতিক দল বানিয়েছেন। এ দলের নাম জাতীয় নাগরিক পার্টি। ইংরেজিতে ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি; সংক্ষেপে ‘এনসিপি’। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে জাতীয় নাগরিক কমিটি নামের রাজনৈতিক প্ল্যাটফরম গঠন করে এই শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতিপর্ব সম্পন্ন করেছেন।

সেনাবাহিনীপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের তোলপাড় করা বক্তৃতার কথাই ধরি। ২৫ ফেব্রুয়ারি ছিল ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’। এবারই প্রথম পালিত হচ্ছে এ দিবস। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার ২৫ জানুয়ারি রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জাতীয় শহীদ সেনা দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

ছাত্র গণঅভ্যুত্থানে হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিম পতনের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে লিখতে গেলেই আমি ঘুরেফিরে বারবার এই ‘প্রেডিকশন’ করে চলেছি যে, আগামী সাধারণ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে জিতে সরকার গঠন করবে।

বাংলাদেশে বাহাত্তুরে সংবিধান নিয়ে অনেক আবেগী ব্যাখ্যান সেই মুজিবামল থেকে হরহামেশাই শুনে আসছি। সেই কথকতা নিয়ে কিছু বলার আগে বাহাত্তুরে সংবিধান প্রণয়নের সময়কাল সম্পর্কে কিছু কথা বলে নিতে চাই। সেটা ছিল দুনিয়াজোড়া সোশ্যালিজম বা সমাজতন্ত্রের লোকপ্রিয়তার কাল।

এই লেখা পিছিয়ে দিয়ে হাসিনার ভাষণ শুনছিলাম বুধবার রাতে। কে এই হাসিনা? ছাত্রগণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে পড়শি দেশে আশ্রয় নেওয়া ক্রোধোন্মত্ত ও অনুশোচনাহীন এক বৃদ্ধা নারী। সেটা এমনই এক পড়শি দেশ, যে দেশকে হাসিনা ক্ষমতায় থাকার সময় কেবল দিয়েছেন আর দিয়েছেন।

হাসিনা যখন এই তল্লাটে দোর্দণ্ড প্রতাপে রাজ্যপাট চালাতেন, তখনকার কত সহস্র দুঃসহ স্মৃতি শাসিত, শোষিত, নিপীড়িত মানুষের মাথায়, মনে কিলবিল করে। হয়তো আরো অনেককালই করবে।

বাংলাদেশের একমাত্র নোবেল বিজয়ী প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগের কোনো কমতি নেই। আমরা অভিযোগপ্রবণ জাতি। আমি নিজেও চাইলে এক শ একটা অভিযোগ তুলতে পারি। আমরা তাদের কাছে আশা করেছিলাম অনেক বেশি।

লর্ড অ্যাক্টন ছিলেন উনিশ শতকের একজন ব্রিটিশ ইতিহাসবেত্তা। লর্ড খেতাবে ভূষিত এই ভদ্রলোক বিংশ শতাব্দীর শুরুতেই মারা যান। তার পুরো নাম ছিল জন এমেরিক এডওয়ার্ড ডলবার্গ অ্যাক্টন। তিনি ছিলেন তার সমকালের অন্যতম বিশিষ্ট পণ্ডিত।

আমার ধারণা দিনকে দিন দেশবাসী নির্বাচনের ব্যাপারে উন্মুখ হয়ে উঠতে থাকবে। কাজেই তার আগে কিছু অতি প্রয়োজনীয় সংস্কার ছাড়া আর তেমন কিছু করা সম্ভব হবে না। এই সংস্কারগুলো এখন না করলে রাজনৈতিক সরকার এসে করবে না।

বিদায় নিয়ে যাওয়া বছরটি অনেক হতাশা নিয়ে শুরু হলেও তৃতীয় প্রান্তিকে এসে অলৌকিক এক বিজয় উপহার দেয়। বাংলাদেশ হাসিনার ফ্যাসিস্ট রেজিমের কবলমুক্ত হয়। অবশ্য কুঞ্ঝটিকার রহস্যপর্দা এখনো পুরোপুরি ভেদ করা যায়নি।

এই গাঙ্গেয় ব-দ্বীপের মানুষ ভারী দুর্ভাগা। বারবার এত অপরিমেয় ত্যাগ ও রক্তপাতের নজির বিশ্বের আর কোনো ভূখণ্ডেই নেই। যুধ্যমান ও স্বাধীনতার জন্য লড়াইরত মানুষদের কথা বলছি না। স্বাধীনতা পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে মানুষের মুক্তি ও উন্নয়ন ঊষালোক ছড়িয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকায়, ভিয়েতনামে এমনকি আফগানিস্তানের গিরিকন্দরেও