আমার দেশ জনপ্রিয় বাংলা নিউজ পেপার

ফ্যাসিবাদী শাসনের দানবীয় রুপ

ড. মো. কামরুজ্জামান

ফ্যাসিবাদী শাসনের দানবীয় রুপ

১৯৪৯ সালের ২৩ জুন আওয়ামী লীগের জন্ম হয়। শুরুতে দলটির নাম ছিল আওয়ামী মুসলিম লীগ। পরে এর নাম হয় নিখিল পাকিস্তান আওয়ামী লীগ। ১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ আওয়ামী নাম নিয়ে দলটি তার যাত্রা অব্যাহত রাখে। এই ভূখণ্ডের একটি পুরোনো দল হিসেবে স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরের মধ্যে প্রায় তিন দশক এ দেশ শাসন করেছে আওয়ামী লীগ।

বিজ্ঞাপন

মোটা দাগে বলতে গেলে, এই ৫৪ বছরে বাংলাদেশকে শাসন করেছে মূলত তিনটি দলÑআওয়ামী লীগ, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগের শাসনামল ছিল ২৬ বছরের মতো। বিএনপির শাসনামলের সময়সীমা ছিল ১৫ বছর। এরশাদের জাতীয় পার্টির শাসনকাল ছিল ছয় বছর। তবে সাড়ে ১৫ বছর ধরে জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের সহযোগী শক্তি হিসেবে ক্ষমতার অংশীদার ছিল। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির সঙ্গে ক্ষমতার অংশীদার ছিল।

এটা অস্বীকার করা যায় না, দেশের স্বাধীনতা লাভের আন্দোলনে আওয়ামী লীগের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তবে স্বাধীনতার ক্ষমতায় গিয়ে আওয়ামী লীগ সব সময়ই স্বৈরাচারের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বিগত ১৬ বছরের কথাই ধরা যাক। এ সময়জুড়ে আওয়ামী লীগ স্বৈরতন্ত্র কায়েম করেছিল। তারা ২০১৪ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়াই জোর করে ক্ষমতা আঁকড়ে রেখেছিল।

তাদের এই ক্ষমতার লোভ দেশের গণতান্ত্রিক সবে প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করেছে। বিচার ও শাসনব্যবস্থার কবর রচনা করেছিল দলটি। উন্নয়নের ফানুস দেখিয়ে দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছিল। পাচার করা টাকা দিয়ে আওয়ামী লীগ নেতারা বিদেশে বেগমপাড়া তৈরি করেছিল। এক কথায়, একটি দেশের যাবতীয় আর্থিক, বিচারিক, প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রশাসনিক ও শিক্ষাব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার কথাবার্তায় তাকে একটি গ্রাম্য মূর্খ ঝগড়াটে নারী বলেই মনে হতো। তার বাচনভঙ্গিতে প্রতিশোধের আগুনের ফুলকি বের হতো, যা তাকে ভয়ংকর এক ফ্যাসিবাদী দানবে পরিণত করেছিল।

প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসে বিরোধী দলকে নির্মূল করার প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা! তিনি দেশবাসীকে ভারতীয় দাস বানানোর সর্বাত্মক চেষ্টা করেছিলেন। তার এই চেষ্টা সফল করতে প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল ও প্রতিবাদী জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সব যন্ত্র ব্যবহার করে গুম-খুন-হত্যাসহ সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিলেন, যাতে ভারতবিরোধী প্রতিবাদী কোনো শক্তি দেশে না থাকে। কেউ বিরোধিতা করলে তাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো দিয়ে গুম-খুনের মতো ঘটনা অহরহ ঘটানো হয়েছে। তৈরি করা হয়েছিল কুখ্যাত ও ভয়ংকর টর্চার সেল আয়নাঘর । এটি ছিল বিভীষিকাময় দুনিয়াবি জাহান্নাম। আওয়ামী লীগ ও ভারতবিরোধী ব্যক্তিদের এই জাহান্নামে ঢুকিয়ে অনেককে বছরের পর বছর আটকে রেখে নির্যাতন করা হতো। এদের অনেককেই হত্যা করে লাশ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়েছে।

শেখ হাসিনা দেশে তার বশংবদ মিডিয়া সিন্ডিকেট তৈরি করেছিলেন, যাদের কাজ ছিল ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার সরকার ও তাদের প্রভু ভারতের আধিপত্যবাদের পক্ষে সাফাই গাওয়া। এর বিনিময়ে তেলবাজ সম্পাদক ও সাংবাদিকরা সরকারের কাছ থেকে বিপুল অর্থ, রাজউকের প্লট এবং ফ্ল্যাটসহ নানা সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নিয়েছেন।

বলা বাহুল্য, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ ছিল ভারতের বিশ্বস্ত অনুচর। ভারতের এজেন্ডাই ছিল শেখ হাসিনার এজেন্ডা। আর এ এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেন সাংবাদিক নামের পোষা এই গোলামরা। এসব পোষা গোলাম অবশ্য ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’র এজেন্ট হিসেবেই কাজ করতেন। ‘র’র নেতৃত্বে বাংলাদেশে মাঝেমধ্যেই জঙ্গি নাটক মঞ্চস্থ হতো। ভারত ও আওয়ামী লীগের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে মাঝেমধ্যেই তারা এ নাটক মঞ্চায়ন করত। আর এ নাটকের পরিচালক ও প্রযোজক ছিল শেখ হাসিনা। অভিনেতা হিসেবে অভিনয় করতেন সাংবাদিক, পুলিশ ও র‍্যাবসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা।

দেশের পুলিশ, বিজিবি, র‍্যাব এবং আনসার বাহিনীকে শেখ হাসিনা দলীয় বাহিনীতে পরিণত করেছিলেন। দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনীকে তারা আওয়ামী বাহিনী বানানোর সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়েছিল। ভারতবিরোধী সেনা কর্মকর্তাদের নির্মূল করতে ঘটানো হয় পিলখানা হত্যাকাণ্ড। সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্বের কবর রচনা করেছিলেন শেখ হাসিনা। পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীতে গোপালগঞ্জসহ বৃহত্তর ফরিদপুরের লোকজন দিয়ে ভরে ফেলা হয়েছিল। সিভিল প্রশাসনকেও একইভাবে সাজানো হয়েছিল।

এভাবেই শেখ হাসিনা গত দেড় দশকে বাংলাদেশে ভয়ংকর ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছিলেন। তার এই ফ্যাসিবাদী শাসন অব্যাহত রাখতে সামনে রাখা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নামের এক বয়ান, যার জাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছিল বাংলাদেশের মানুষ। দেশের যেকোনো ঘটনায় শেখ হাসিনা ৭১-কে সামনে নিয়ে আসতেন। ৭১-কে পুঁজি করেই তারা নিজেদের প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতেন। বিরোধী দলের ওপর দমন-পীড়ন চালাতেন।

এভাবেই দেশে বিভক্তির বীজ বপন করেছিল আওয়ামী লীগ। রাজাকার, যুদ্ধাপরাধী ও জঙ্গি ধুয়া তুলে দেশকে তারা দুই ভাগে বিভক্ত করেছিল। দেশের সবচেয়ে বড় গণতান্ত্রিক দল বিএনপিকেও তারা স্বাধীনতাবিরোধী তকমা দিয়ে সীমাহীন অত্যাচার করেছে। মিথ্যা অভিযোগে জামায়াতে ইসলামীর ওপর তারা অমানবিক ক্রাকডাউন চালিয়েছে। এ দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিচারের নামে জুডিশিয়াল কিলিং করেছে। আলেমদের তারা জেলে ঢুকিয়েছে। শাপলা চত্বরে হেফাজতের সমাবেশে রাতের অন্ধকারে ক্রাকডাউন চালিয়ে শত শত নিরীহ আলেমকে হত্যা করে লাশ পুড়িয়ে দিয়েছে।

এত কিছুর পরও আওয়ামী লীগ নেতাদের চাপাবাজি ও গলাবাজি বন্ধ ছিল না। এ চাপাবাজির মূল লক্ষ্য ছিল তাদের অপরাধকে আড়াল করা। তারা মিথ্যা জঙ্গি নাটক মঞ্চস্থ করে দেশবাসীকে সেদিকে ব্যস্ত রাখত। আর নিজেরা লুটপাট করে দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করত।

এত কিছু করেও শেখ হাসিনার শেষ রক্ষা হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ৫ আগস্ট ভারতে পালিয়ে নিজের জীবন বাঁচিয়েছেন তিনি। ৫ তারিখ সকালেও কেউ অনুমান করতে পারেনি, হাসিনার মতো স্বৈরাচার এভাবে পালিয়ে যাবে। বর্তমানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা আত্মগোপনে রয়েছেন। অনেককে গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারের পর একে একে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে তাদের লুটপাটের ফিরিস্তি।

আগামী নির্বাচনের মাধ্যমে যারা ক্ষমতায় আসবে, তাদের শেখ হাসিনা করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিতে হবে। মনে রাখতে হবে, স্বৈরশাসন শেষ পর্যন্ত টেকসই হয় না। শেখ হাসিনা সারাজীবন ক্ষমতায় থাকতে চেয়েছিলেন। বিরোধীদের দমনে হাতিয়ার হিসেবে সন্ত্রাসের পথ বেছে নিয়েছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু তাতে শেষ রক্ষা হয়নি হাসিনা ও আওয়ামী লীগের।

নিরস্ত্র কিশোর-কিশোরী ও তরুণদের হাতেই লজ্জাজনকভাবে ধরাশায়ী হতে হয়েছে শেখ হাসিনাকে। সময়ের অভাবে দুপুরের জন্য রান্না করা খাবারও হাসিনা খেয়ে যেতে পারেননি। পরিশেষে বলা যায়, যাদের কোনো নীতি-আদর্শ নেই, তাদের ক্ষমতায় টিকে থাকার একমাত্র অবলম্বন হলো সন্ত্রাস এবং অপপ্রচার। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা টেকসই হয় না। শেখ হাসিনার করুণ পরিণতি সেই শিক্ষাই দেয় আমাদের।

লেখক : অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া

Email: dr.knzaman@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন