কলকাতায় হিন্দুত্ববাদ

মাসকাওয়াথ আহসান

কলকাতায় হিন্দুত্ববাদ

ভারতে হিন্দুত্ববাদ রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে ২০১৪ সালে। প্রায় এক যুগ পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গে হিন্দুত্ববাদ রাজ্যক্ষমতায় এলো। বাংলাদেশ রাষ্ট্রটিকে ঘিরে ভারতের যে ত্রিপুরা, আসাম ও পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য-সব কটিই এখন হিন্দুত্ববাদের শক্ত ঘাঁটি।

এতে বাংলাদেশের নাগরিকদের বিচলিত হওয়ার কোনো কারণ আছে বলে মনে হয় না। ভারতের রাষ্ট্রক্ষমতায় কংগ্রেস থাকুক আর বিজেপি থাকুক; দিল্লির বাংলাদেশ নীতি মোটামুটি একই রকম।

বিজ্ঞাপন

ব্রিটিশ আমলে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মধ্য দিয়ে যে লব্ধ প্রতিষ্ঠ মুনশি, পেশকার, সেরেস্তাদার শ্রেণিটি রাতারাতি জমিদার সেজে বসেছিল পূর্ববঙ্গে; ভারতের বাংলাদেশ নীতি সেই জমিদার মানসের ওপর প্রতিষ্ঠিত।

কংগ্রেস নেতা প্রণব মুখার্জি বাংলাদেশের সেনাসমর্থিত এক-এগারো সরকারকে দিয়ে শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রক্ষমতার যে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত দিয়েছিলেন; তা ছিল ইতিহাসের সেই জমিদারকলার একবিংশের রূপ। প্রণব মুখার্জির বাংলাদেশ বিষয়ে যে সেন্স অব এনটাইটেলমেন্ট বা প্রাধিকার বোধ; জুলাই বিপ্লবে হাসিনার পতনের পর ভারতের সাবেক রাষ্ট্রদূত বীণা সিক্রি, হর্ষবর্ধন শ্রিংলা, পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শংকর, পশ্চিমবঙ্গের সদ্য বিজয়ী বিজেপি নেতা শুভেন্দু; এমনকি নর্থ ইস্ট নিউজের ইনফরমেশন হিটম্যান চন্দন নন্দীর কণ্ঠে সেই একই প্রাধিকার বোধ উচ্চারিত হয়েছে।

ব্রিটিশ আমলে কলকাতার বেঙ্গল রেনেসাঁর বঙ্কিমচন্দ্রের পূর্ববঙ্গ সম্পর্কে যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশিত হয়েছিল; সেটাই আজ পর্যন্ত ভারতের বাংলাদেশ সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি।

kolkata

পূর্ববঙ্গের সুলতানি, মোগল ও নবাবি আমলের অর্থনৈতিক সামর্থ্য, সাংস্কৃতিক বোধ ও আভিজাত্যকে পলাশীর যুদ্ধের মাধ্যমে কেড়ে নিয়ে; যুদ্ধ-পরবর্তী বিশৃঙ্খলার সময় হঠাৎ ধনী হয়ে ওঠা ব্রিটিশের ছোট কর্মচারীরা রাতারাতি জমিদারির আভিজাত্য কাঠামো তৈরির সময়টায় গড়ে ওঠে ওই বঙ্কিম মানস।

ব্রিটিশের সংস্পর্শে থেকে দেশীয় এই ব্রাউন ফিলিস্তিনিদের যে আর্য কল্পনা; কলকাতা সেই ভ্রান্ত অধ্যাসের কলকাকলী বিশেষ। মধ্য এশিয়া থেকে আসা যে কথিত আর্যরা উত্তর ভারতে উচ্চবর্গের কাল্পনিক আসন দখল করেছিল; তারা আবার পশ্চিমবঙ্গের আর্য কল্পনাকে নাকচ করে দেয়। এই যে বেঙ্গল রেনেসাঁর সূত্র ধরে; দুই কাঁধে ১০ কেজি ওজনের সংস্কৃতিচর্চার ভারী পাথর বেঁধে দেওয়া হয়েছিল কলকাতার কাঁধে; তা নিয়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতের কথিত আর্য মহলে বেশ হাসাহাসি রয়েছে।

আজকের পৃথিবীতে একি কল্পনা করা যায় যে, কলকাতায় জাত-পাত মেনে কিছু লোক উচ্চবর্গ সেজে থাকে। বেঙ্গল রেনেসাঁর আলোকিত সমাজের এই লোকজ অহমের বিপরীতে দেখুন ইউরোপের রেনেসাঁর প্রভাবে সেখানে সাম্য মানসের সমাজ তৈরি হয়েছে। এটাই হচ্ছে ভারতবর্ষের গ্রাম্য আলোকিত সমাজের সঙ্গে ইউরোপের শহুরে এনলাইটেনমেন্টের পার্থক্য।

যখনই জাত-পাত-ধর্ম-গোত্র-রাজনৈতিক আদর্শের ভিত্তিতে সমাজে কাস্ট সিস্টেম দেখা যায়; তখনই বোঝা যায়; সমাজটি কসমোপলিটান হতে পারেনি। বাংলাদেশ একভাষী দেশ হওয়ায় বাংলার পাশাপাশি ইংরেজিতে দক্ষতা-পঠন-পাঠন পিছিয়ে পড়ায়; একশ্রেণির মানুষ ‘কলকাতা’ থেকে আধুনিকতা শিখতে গিয়ে কালচারের নামে হিন্দু ধর্মের রিচুয়ালে জড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের যারা ব্রিটিশ আমল থেকেই ইংরেজি পঠন-পাঠন শিখে ফেলেছে; তারা ইউরোপের রেনেসাঁ থেকে কিছু শিক্ষা নিতে পেরেছে। ফলে তারা কলকাতার হিন্দু ধর্মকেন্দ্রিক ‘আলোকিত’ সমাজের কালচার না শিখে; ইউরোপের এনলাইটেনমেন্টের খোঁজ পেয়েছে।

ঢাকায় একশ্রেণির লোক কলকাতার রেনেসাঁ দিয়ে ‘অসাম্প্রদায়িকতার’ দীক্ষা দিতে গিয়ে আসলে হিন্দুত্ববাদে দীক্ষিত করেছে বিপুলসংখ্যক মানুষকে। ফলে ‘আওয়ামী লীগ’কে হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প হিসেবে প্রণব মুখার্জি ২০০৯ সালেই প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। প্রণব প্রথমে বামপন্থি ছিলেন, এরপর কংগ্রেসে যোগ দিয়ে মন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। কিন্তু সবশেষে শিবসেনার মন্দিরে গিয়ে আলুথালু হয়ে নিজের মেয়েকে বিজেপির সাংসদ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। মেয়ে অবশ্য ইউরোপের এনলাইটেনমেন্টের খোঁজখবর রাখায়; সে প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন।

সেই বেঙ্গল রেনেসাঁর পণ্ডিত যদুনাথ সরকার; পশ্চিমবঙ্গকে জায়নিস্ট মডেলে গড়ে তোলার আশা পোষণ করেছিলেন। হিন্দুত্ববাদী প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ইসরাইলকে ফাদারল্যান্ড হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে; ভারতকে মাদারল্যান্ড সাজিয়েছেন। মাদারল্যান্ড হিসেবে ফাদারল্যান্ডের নীতি অনুসরণ করে মোদি অবশ্য ২০০২ সালেই গুজরাটে ‘প্যালেস্টাইন ল্যাবরেটরি’ বানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর কাশ্মীর, উত্তর ভারত, আসাম হয়ে এবার পশ্চিমবঙ্গ। মুসলমানদের এথনিং ক্লিনসিংয়ে হত্যা, নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া, আসামে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রাখা, উত্তর প্রদেশে বুলডোজার দিয়ে মসজিদ ও মুসলমানদের বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া; সবশেষে পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকা থেকে লাখ লাখ মুসলমানকে বাদ দেওয়া। ডেমোগ্রাফিক এই ইঞ্জিনিয়ারিং করে ভোটে জিতে বিজেপি নেতা শুভেন্দু সদর্পে ঘোষণা করলেন, মুসলমানরা মমতাকে আর হিন্দুরা আমাকে ভোট দিয়েছে।

ভারতের এই গরিবের জায়নিজম শুরু হয়েছিল বাবরি মসজিদের নিচে মন্দিরের খোঁজ পাওয়ার মধ্য দিয়ে। সেই থেকে প্রায় নিয়মিত রাতের ও দিনের স্বপ্নে বিভিন্ন প্রাচীন মসজিদের নিচে মন্দিরের খোঁজ করে সেগুলো ভাঙাভাঙি চলছে। ইতিহাসের দিল্লি সালতানাত ও মোগল আমলের ওপর প্রতিশোধ নিতে মসজিদ ভাঙা ও মোগল শাসকদের খলনায়ক দেখিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ; নরেন্দ্র মোদি বেশ শখ মিটিয়ে মুসলিমবিদ্বেষ চরিতার্থ করেছেন।

এই যে এক যুগের মধ্যে ভারত হিন্দুত্ববাদী রাষ্ট্র হয়ে ওঠা; এটা কি কোনো মেটামরফসিস! মোটেও তা নয়। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু ইউরোপের এনলাইটেনমেন্টের প্রভাবে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ থকথকে ভারতের শরীরে অসাম্প্রদায়িকতার রেশমি চাদর পরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু তার দলেই প্রণব মুখার্জির মতো ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা ছিলেন। সাম্প্রদায়িকতা রোগের চিকিৎসা না করে তা রেশমি বস্ত্রে ঢেকে রাখায়; ২০১৪ সালে সে চর্মরোগ প্রকট আকারে দৃশ্যমান হয়েছে।

পৃথিবীর ইতিহাসে নাতসিবাদ, জায়নবাদের মতো যে নরভোজি ইজমগুলো আমাদের চোখে ধরা পড়ে; সেগুলো ছাড়িয়ে যাবে ভারতের হিন্দুত্ববাদ। আশঙ্কার কথা হচ্ছে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগকে যেভাবে গ্রুমিং করা হয়েছে; একইভাবে আফগানিস্তানের তালেবানদের গ্রুমিং করছে দিল্লি। ভারতের কিছু মীরজাফর ঘরানারা মুসলিম রাজনৈতিক দল হিন্দুত্ববাদী প্রকল্পের সহগামী হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে জেতাতে তাদের ভূমিকা আছে। বাংলাদেশেও ওই হিন্দুত্ববাদী ইসলামপন্থি দলের শাখা আছে। ফলে দাড়ি-টুপি পরে মুখে ‘ইসলাম খাতরে মে হ্যায়’ বলে অপকর্ম করে হিন্দুত্ববাদের জন্য গেরুয়া চাদর বিছিয়ে দেওয়ার কাজগুলো এরা করে চলেছে। শেখ হাসিনার সময়ে এরা রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেয়েছে। দিল্লির প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশে ইসলামোফোবিয়া বাস্তবায়নে হাসিনার যে আন্তরিকতা; তারই পুরস্কার হিসেবে হাসিনা এখন দিল্লিতে রাষ্ট্রীয় অতিথিশালায় বসবাস করছেন। আর হাসিনার মানবতাবিরোধী অপরাধের আওয়ামী দোসররা কলকাতায় ফুল নিয়ে শুভেন্দুকে শুভেচ্ছা জানাতে গেছেন।

বেঙ্গল রেনেসাঁর মোড়কে যে হিন্দুত্ববাদ কলকাতাতেই যাত্রা শুরু করেছিল; আবার তা সেখানেই ফিরে এসেছে। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হচ্ছে ভারতের ধর্মীয় বিদ্বেষের অভিঘাতে কোনো ধরনের ধর্মীয় বিদ্বেষকে প্রশ্রয় না দেওয়া। একটা সমাজ হচ্ছে বিচিত্র মানুষের সমাহার। এখানে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ে উচ্ছ্বাসিত হিন্দুত্ববাদী ও গেরুয়া প্রগতিশীল রয়েছে। ফেসবুকে তাদের দেখাও মিলছে। এই মানুষ তাদের ‘অখণ্ড ভারত’-এর কল্পনা নিয়ে খোয়াড়ি করুক। কিন্তু কক্ষনো তাদের উসকানিতে পা দেওয়া যাবে না।

বেঙ্গল রেনেসাঁর মোড়কে ঢাকার আলোকিত সমাজ মাইনপাতা ভূমির মতো; সে সারা দিন কুঁচ কুঁচ করে; সাধারণ মানুষের মধ্যে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা করবে। সে তার ভারতস্বামীর হিন্দুত্বায়নকে জাস্টিফিকেশন দিতে ‘পশ্চিমবঙ্গে মমতা হারার পাঁচটি কারণ’ বর্ণনা করবে; আসল কারণ বাদ দিয়ে; আর দাড়ি-টুপিওয়ালা লোকের পান থেকে চুন খসলে তাকে উগ্রবাদী ডেকে, আলো আমার আলো’; গান গাইবে।

বিশ্বকাপ ফুটবলে ফুটবলার মাতারাজ্জি, ফুটবলার জিনেদিন জিদানকে তার বোন তুলে গালি দিলে জিদান উত্তেজিত হয়। ফল লালকার্ড নিয়ে জিদানেরই মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়া। গেরুয়া প্রগতিশীলরা হচ্ছে; মাতারাজ্জি; এর স্বভাবই কুঁচ কুঁচ করে মুসলিমবিদ্বেষ প্রকাশ। এই উসকানিকে পাত্তা না দিলেই দেখবেন; ধীরে ধীরে নতুন প্রজন্মের কাছে অপ্রাসঙ্গিক, আনসফিস্টিকিটেড প্রপঞ্চ হিসেবে এদের চিন্তা-বার্ধক্যের বলিরেখার মতো দেখাবে।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন