প্রতিদিনই হোক মা দিবস

বিউটি হাসু

প্রতিদিনই হোক মা দিবস

‘মা’ ছোট্ট একটি মধুর শব্দ। এর মর্মার্থ বিশাল এবং তাৎপর্য ব্যাপক। এই একটি শব্দের মধ্যেই লুক্কায়িত জগতের তাবৎ সুখ। মায়ের স্নেহের আঁচল সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়। মা দিবসের ভাবনা, মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক, মায়ের ত্যাগ এবং সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য—এসব নিয়ে আজকের মা দিবসের লেখাটি।

বিজ্ঞাপন

‘মা’ একটি মাত্র অক্ষর, একটি বর্ণ, একটি শব্দ; কিন্তু ‘মা’ মানে একটি পুরো পৃথিবী, সারা বিশ্ব। কেননা জন্মের আগে একটি শিশুর বসবাস, বেড়ে ওঠা—সে তো মায়ের জঠরেই। ‘মা’—এই ছোট্ট শব্দটির মধ্যে পৃথিবীর সব সুখ, সব আনন্দ লুক্কায়িত। মায়ের শীতল স্পর্শেই যত শান্তি ও স্বর্গের সুধা। মায়ের জাদুস্পর্শে নিমিষেই সব কষ্ট-যন্ত্রণা উধাও হয়ে যায়। তার মমতামাখা আঁচল সন্তানের নিরাপদ আবাসভূমি। তাই তো ‘মা’ শব্দটিতে এত আকুলতা, এত আবেগ! আত্মার এমন নিবিড় টান!

মা দিবসের ভাবনা

মাকে ভালোবাসার জন্য কোনো নির্দিষ্ট দিনক্ষণের প্রয়োজন হয় না। প্রতিদিন প্রতিটি ক্ষণই মাকে ভালোবাসা উচিত। তবুও মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর মে মাসের দ্বিতীয় রোববার মা দিবস পালন করা হয়। সে ধারাবাহিকতায় এ বছর আজ ১০ মে মা দিবস।

ইতিহাস বলে, ১৯০৭ সালের ১২ মে প্রথমবার আমেরিকার ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ার গ্রাফটন শহরে ‘মাদার্স ডে’ বা মা দিবস পালিত হয়। প্রতিবছর মায়েদের সম্মানে মে মাসের দ্বিতীয় রোববার বিশ্বব্যাপী এ দিনটি পালিত হয়। দেশ ও অঞ্চলভেদে কোথাও কোথাও অবশ্য মা দিবসের তারিখ ভিন্ন হয়ে থাকে।

ভালোবাসা প্রকাশের উপলক্ষ ‘মা দিবস’

মাকে ভালোবাসতে বিশেষ কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। তবে বিশেষ এ দিবসটির পালনের উদ্দেশ্য হলো, মা ও মাতৃত্বের সর্বজনীন রূপটির প্রতি সবার শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা। এদিন মায়ের জন্য বিশেষভাবে কিছু করা, শুধু মায়ের জন্যই কোনো আয়োজন করা। দিনটি উপলক্ষে মাকে নিয়ে কোথাও বেড়াতে পারেন, মায়ের প্রিয় কোনো খাবার নিজের হাতে তৈরি করতে পারেন। মায়ের জন্য শাড়ি, ভালো বই, প্রিয় সুগন্ধি বা বিশেষ মেসেজ লেখা চায়ের মগ কিনতে পারেন। তবে উপহারের চেয়ে মায়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হলো তাকে সময় দেয়া আর যত্ন নেওয়া। শত ব্যস্ততার মধ্যেও কিছুটা সময় শুধু মায়ের জন্য রাখাই হলো তার জন্য সেরা উপহার।

মা-দিবস-2

মায়ের সঙ্গে সন্তানের সম্পর্ক

‘মা’—এই ছোট্ট একটি শব্দের মধ্যেই যেন পৃথিবীর তাবৎ সুখ। একটি নির্লোভ, নির্ভেজাল ও নিরাপদ আশ্রয়ের নাম ‘মা’। অব্যক্ত যন্ত্রণা সহ্য করে মা নিজের রক্তবিন্দু দিয়ে তিল তিল করে সন্তানকে বড় করেন। সন্তানের সঙ্গে মায়ের নাড়ির সম্পর্ক। মায়ের নাড়িছেঁড়া ধন বলেই তো সন্তানের কোনো বিপদ-আপদ হলে মা সবার আগে জানতে পারেন। তাই তো মায়ের সঙ্গে সন্তানের গভীরতম সম্পর্কের কাছে সব সম্পর্কই গৌণ, যে সম্পর্কের সঙ্গে আর কোনো তুলনা হয় না। মায়ের তুলনা মা নিজেই। মায়ের মতো এমন নিঃস্বার্থভাবে কেউ ভালোবাসে না। নিজেকে নিঃস্ব করে মা শুধু সন্তানকে দিয়েই যান, কখনো প্রতিদানের আশা করেন না।

মায়ের মমত্ববোধ ও নিঃস্বার্থ ভালোবাসার সঙ্গে পৃথিবীর অন্য কোনো কিছুর তুলনা হয় না। একজন সন্তানের জন্য মা-ই হলেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বন্ধু এবং জীবনের প্রথম ও প্রধান অবলম্বন। প্রতিটি সন্তানের কাছে মা মহান স্রষ্টার দেওয়া সবচেয়ে বড় উপহার।

মায়ের ত্যাগ

চীনের পৌরাণিক একটা গল্প আছে। গল্পটা হলো – ‘এক প্রেমিকা তার প্রেমিককে পরীক্ষা করার জন্য বলল, তোমার ভালোবাসার পরীক্ষা নিতে চাই আমি! প্রেমিক বলল, কী পরীক্ষা নিতে চাও, বল? আমি সব পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত। প্রেমিকা বলল, তোমার মায়ের হৃৎপিণ্ডটা নিয়ে আসো…! প্রেমে অন্ধ ছেলেটি ছুটল মায়ের কাছে। মাকে হত্যা করলো! তারপর তার হৃৎপিণ্ড নিয়ে ছুটল প্রেমিকার কাছে, ভালোবাসার পরীক্ষায় পাস করতে…! প্রেমিক ছেলেটি পথে হঠাৎ আছড়ে পড়ল। ছেলেটির হাত থেকে মায়ের তাজা হৃৎপিণ্ডটা ফসকে পড়ে গেল ! ছেলেটি খুঁজে পেয়ে মায়ের হৃৎপিণ্ড আবার হাতে তুলে নিল। তখনো ধক ধক করছে মায়ের হৃৎপিণ্ড। হাতে নিতেই তা বলে উঠল, ব্যথা পেলি খোকা?’

যদিও এটি নিছকই গল্প। তারপরও মায়ের মন এমনই হয়।

এবার আমাদের বাস্তব জীবনে ফিরে আসি।

এ বছর ২৫ মার্চ ঈদের ছুটি শেষে রাজবাড়ী থেকে বাসে চড়ে মায়ের সঙ্গে ঢাকা ফিরছিল শিশু আলিফ। বাসটি দৌলতদিয়া পৌঁছালে ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। ওই সময় আলিফের মা ছেলেকে বাসের জানালা দিয়ে বের করে দিতে পারলেও নিজে বেঁচে ফিরতে পারেননি। মা চেয়েছিলেন যেভাবেই হোক নিজের সন্তানকে বাঁচাতে। সন্তানের জন্য এমন আত্মত্যাগ শুধু মায়েরাই করতে পারেন।

যুক্তরাষ্ট্রের ফিলাডেলফিয়ায় এ ঘটনাটি ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে ঘটে । বাড়িতে আগুন লাগার পর মাকে উদ্ধার করেছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। কিন্তু ছোট ছেলেটি তখনো রয়েছে বাড়ির ভেতর।ছেলের জীবন রক্ষার্থে মায়ের কাছে নিজের জীবন ছিল তুচ্ছ। তাইতো নিরাপত্তাকর্মী, ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের বাধা ডিঙ্গিয়ে ছেলেকে বাঁচাতে সেই মমতাময়ী মা আগুনে ঝাঁপ দিয়েছেন। আগুনের ফুলকি ও ধোঁয়ার কারণে তারা বাইরে বের হতে পারেননি। ছেলের সঙ্গেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা গেলেন সেই মা।

মায়ের প্রতি সন্তানের দায়িত্ব-কর্তব্য ও বার্ধক্যে যত্ন

মা-বাবা যে কত মূল্যবান তা কোরআন এবং হাদিসে স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে।

পবিত্র মহাগ্রন্থ আল কোরআনের আয়াতে মা-বাবা সম্পর্কে বলা হয়েছে, তাদের (জীবদ্দশায়) একজন বা উভয়েই বার্ধক্যে উপনীত হলে তুমি তাদের উদ্দেশে বিরক্তিসূচক ‘উহ্‌’-ও বলো না এবং তাদের বকাঝকা করো না। বরং তাদের সঙ্গে সদা বিনম্র ও সম্মানসূচক কথা বলো। আর তুমি মমতাভরে তাদের উভয়ের ওপর বিনয়ের বাহু মেলে ধর। আর দোয়ার সময় বলবে, হে আমার প্রভু-প্রতিপালক! তুমি তাদের প্রতি সেভাবে দয়া করো যেভাবে শৈশবে তারা আমায় লালন-পালন করেছন।’ (সুরা বনি ইসরাইল : আয়াত ২৩-২৪)

মা অতুলনীয়। মহান আল্লাহ পাক মাকে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মর্যাদা প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘মা হচ্ছেন সমগ্র জাহানের শ্রেষ্ঠ সম্মানীয় নিয়ামত। মাকে কখনো কষ্ট দেওয়া যাবে না, অসম্মান করা যাবে না।’ তিনি আরো বলেছেন, ‘পৃথিবীর সবচেয়ে নিকৃষ্ট ও পাপিষ্ঠ সে ব্যক্তি, যে তার মাকে কষ্ট দেয়, মাকে অসম্মান করে; সে অবশ্যই অভিশপ্ত।’

যে মা সারাজীবন তার সন্তানদের প্রতিটি প্রয়োজনের খেয়াল রাখেন, বার্ধক্যে এসে তিনিই হয়ে ওঠেন কিছুটা নির্ভরশীল। শারীরিক দুর্বলতা, একাকিত্ব কিংবা মানসিক পরিবর্তন—সবকিছু মিলিয়ে এ সময়টা মায়েদের জন্য সবচেয়ে সংবেদনশীল। এই সময় সন্তানের দায়িত্ব শুধু চিকিৎসা বা আর্থিক সহায়তা নয়; বরং দরকার মানসিক সঙ্গ দেওয়া। তাদের সঙ্গে সময় কাটানো, তাদের কথা মন দিয়ে শোনা এবং ছোট ছোট আনন্দের ব্যবস্থা করা মায়ের বার্ধক্যকে সুখময় করে তুলতে পারে।

পৃথিবীর কোনো কিছুর সঙ্গে মায়ের মায়া-মমতার তুলনা হয় না। অর্থাৎ মহামহিম আল্লাহ ও রাসুলে পাকের পরেই মায়ের স্থান। হাদিসে আছে, ‘মায়ের পদতলেই সন্তানের বেহেশত।’ অতএব মর্যাদাগতভাবে দুনিয়া-জাহানে মায়ের সমকক্ষ আর কেউ নয়। মায়ের তুলনা মা-ই। পৃথিবীর আদিকাল থেকে মা তার ভালোবাসা, স্নেহ আর মায়া-মমতা দিয়ে সন্তানকে গড়ে তোলেন। কি শহরে কি গ্রামে কি বিদেশে—সবখানেই মায়ের শাশ্বত রূপ সদাই যেন একই রকম। মাকে ঘিরেই সন্তানের শৈশব-কৈশোর আবর্তিত হয়ে থাকে। মা সন্তানের পথপ্রদর্শক ও প্রেরণার উৎস হিসেবে সন্তানের পাশে চাদরের মতো জড়িয়ে থাকেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এই অবদান অসামান্য ও অপরিশোধ্য এবং সর্বজনস্বীকৃত।

পৃথিবীর কোনো কিছুর সঙ্গে মায়ের মায়া-মমতার তুলনা হয় না। অর্থাৎ মহামহিম আল্লাহ ও রাসুলে পাকের পরেই মায়ের স্থান। হাদিসে আছে, ‘মায়ের পদতলেই সন্তানের বেহেশত।’ অতএব মর্যাদাগতভাবে দুনিয়া-জাহানে মায়ের সমকক্ষ আর কেউ নয়। কি শহরে কি গ্রামে কি বিদেশে—সবখানেই মায়ের শাশ্বত রূপ সদাই যেন একই রকম। মাকে ঘিরেই সন্তানের শৈশব-কৈশোর আবর্তিত হয়ে থাকে। মা সন্তানের পথপ্রদর্শক ও প্রেরণার উৎস হিসেবে সন্তানের পাশে চাদরের মতো জড়িয়ে থাকেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত। এই অবদান অসামান্য ও অপরিশোধ্য এবং সর্বজনস্বীকৃত। শুধু বিশেষ দিবসে মা-বাবার জন্য ফেসবুকের দেয়ালে দামি দামি কথা পোস্ট নয়। মা-বাবার জন্য ভালোবাসা প্রকাশ হোক বাস্তবে জীবনে কথায়, কাজে ও তাদের সঙ্গে নম্র আচার-আচরণে।

জীবনের প্রতিটি দিনই সন্তানের জন্য মা দিবস, প্রতিটি ক্ষণই সন্তানের জন্য মা দিবস। বাবা-মায়ের সেবাযত্ন ও খোঁজখবর শুধু এক দিনের জন্য নয়, বরং সারা জীবনভর সেবা করার আদেশ আল্লাহ পাক আমাদের দিয়েছেন। কোনো মা-বাবাকে শেষ বয়সে যেন বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নিতে না হয়। পরম মমতায় সন্তানের সান্নিধ্যেই থাকতে পারেন।

পৃথিবীর সব মা সন্তানদের ভালোবাসায় ও প্রার্থনায় সযত্নে থাকুক। পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও অনিঃশেষ ভালোবাসা। কাছে-দূরে যে যেখানেই থাকেন, সব মা-ই যেন খুব ভালো থাকেন।

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন