বিমানবন্দর, জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্রের নৈতিকতা

বিমানবন্দর, জবাবদিহিতা ও রাষ্ট্রের নৈতিকতা

লেখাটি লিখতে গিয়ে বিশ্ববিখ্যাত গ্রিক অন্ধ কবি হোমারের মহাকাব্য ‘The Odyssey’-এর কথা ইয়াদো এলো। সেখানে দেখানো হয় প্রোটাগনিস্ট বা কেন্দ্রীয় চরিত্র ওডিসিউস যুদ্ধ, সমুদ্র ও অগণিত বিপদ পেরিয়ে নিজের দেশ ইথাকায় ফেরেন। তেমনি প্রবাসীরা বিদেশের মাটিতে বছরের পর বছর শ্রম, বিচ্ছেদ ও ত্যাগের পর নিজের দেশের এয়ারপোর্টকে মনে করেন এক আধুনিক Odyssey, যেখানে বিদেশের ঝড় পেরিয়ে নিজের ঘরে ফিরেও তাকে লড়তে হয় ব্যুরোক্রেসি, অবহেলা ও অপমানের সঙ্গে। যাই হোক, এবার মূল আলাপে আসি।

বিজ্ঞাপন

ঢাকার বিমানবন্দর এখন আর কেবল যাত্রী ওঠানামার স্থাপনা নয়; এটি রাষ্ট্রের মুখে ধরা প্রথম আয়না—একটি বিশাল কাচের দরজা, যার ওপারে দেশের সভ্যতা, বিবেক ও ক্ষমতার প্রকৃত মুখ একসঙ্গে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তার ফেরার অপেক্ষায় মায়ের চোখে জমে থাকে দীর্ঘ নীল রাত। বিদেশ থেকে ফিরে একজন প্রবাসী যখন এই দরজা পেরোন, তখন তিনি শুধু নিজের ঘরে ফিরছেন না—ফিরছেন সেই দেশের কাছে, যে দেশের অর্থনীতি তার ঘামে ভেজা টাকায় টিকে আছে। অথচ নিজের মাটিতে ফিরে সেই মানুষটিই যেন অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক নন—তিনি যেন নিজের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা এক অনাহূত অতিথি; রাষ্ট্র তার পকেট থেকে রাজস্ব নেয়, কিন্তু তার চোখের জল, ক্লান্তি ও মর্যাদার দায় নেয় না।

প্রবাসীর রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির ধমনিতে প্রবাহিত রক্তের মতো। অর্থনীতিবিদ নোবেলজয়ী অমর্ত্য সেনের capability approach মনে করিয়ে দেয়—উন্নয়ন কেবল আয় বা বৈদেশিক মুদ্রার পরিমাণ নয়; মানুষের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও বাস্তব স্বাধীনতাও উন্নয়নের মাপকাঠি। মরুভূমির বুকে ঝরা তার ঘাম শুকিয়ে যায় বিদেশের মাটিতে, কিন্তু সেই ঘামের লবণেই দেশের বাজার, সংসার ও রাষ্ট্রীয় কোষাগার সজীব থাকে; সেই রক্তে বাজারের চাকা ঘোরে, ঘরের চুলায় আগুন জ্বলে। এই অর্থে সন্তানের স্কুলের ফি, মায়ের ওষুধ, ঘরের চাল, গ্রামের দোকান, শহরের নির্মাণ এবং জাতীয় বৈদেশিক মুদ্রার ভান্ডার—সবই সচল থাকে। অথচ বিমানবন্দরে সেই রেমিট্যান্সযোদ্ধার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় না সম্মানের ফুল; ধরিয়ে দেওয়া হয় অপেক্ষার টোকেন, অস্পষ্ট নির্দেশনা এবং দুর্ভোগের দীর্ঘ তালিকা। ট্রলির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়ানো, লাগেজের জন্য অন্ধকারের মতো অপেক্ষা করা, ক্লান্ত শিশু ও বৃদ্ধদের বসার জায়গা না পাওয়া—এসব বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এগুলো এমন এক প্রশাসনিক সংস্কৃতির চিহ্ন, যেখানে মানুষকে সেবা দেওয়ার বদলে তাকে সহ্য করতে শেখানো হয়।

লাগেজ হারানো যেন এখানে কোনো বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয়; এটি দুর্ভোগের অভিধানে লেখা এক নিয়মিত কালো অধ্যায়। লাগেজ থেকে জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাওয়া, ব্যাগ কেটে মালামাল বের করে নেওয়া, মূল্যবান সামগ্রী উধাও হওয়া—এসব ঘটনা প্রবাসীদের কাছে প্রায় স্বাভাবিক আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। বিদেশের মাটি থেকে যে ব্যাগে সন্তানের জন্য জামা, স্ত্রীর জন্য শাড়ি, মায়ের জন্য ওষুধ, বাবার জন্য পাঞ্জাবি এবং পরিবারের জন্য বহুদিনের জমিয়ে রাখা ছোট ছোট আনন্দ ভরে আনা হয়, বিমানবন্দরের অদৃশ্য হাত সেই ব্যাগকে কখনো কখনো লুণ্ঠনের বাক্সে পরিণত করে। ব্যাগের তালা ভাঙে, কিন্তু তার সঙ্গে ভেঙে চূর্ণ হয় একটি শিশুর বাবার আনা উপহারের অপেক্ষা, এক মায়ের ওষুধ পাওয়ার আশ্বাস, আর রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের শেষ ভরসাটুকুও। একটি শার্ট, একটি মোবাইল বা একটি ওষুধের প্যাকেট চুরি হওয়া কেবল বস্তুগত ক্ষতি নয়; চুরি হয়ে যায় একটি শিশুর আনন্দ, এক মায়ের বেঁচে থাকার আশ্বাস, আর প্রবাসীর এই বিশ্বাস যে নিজের দেশে অন্তত সে একা নয়।

জমজমের পানি নিয়ে দুর্ভোগ এই অব্যবস্থার আরো গভীর প্রতীক। একজন মুসল্লি পবিত্র স্থান থেকে যে পানি আনেন, তা কেবল বোতলভর্তি তরল নয়; তাতে থাকে ধর্মীয় অনুভূতি, পরিবারের জন্য ভালোবাসা এবং দীর্ঘ যাত্রার স্মৃতি। সেই পানি হারিয়ে গেলে বা অকারণে আটকে থাকলে ক্ষতিটা কেবল অর্থের নয়, অনুভূতিরও। কিন্তু কর্তৃপক্ষের আচরণে মনে হয়, যাত্রীর বিশ্বাস, ক্লান্তি কিংবা আবেগ কোনো প্রশাসনিক বিবেচনার বিষয় নয়। যেন মানুষ কেবল একটি পাসপোর্ট নম্বর, একটি ব্যাগেজ ট্যাগ এবং একটি রাজস্ব-ইউনিট।

ইমিগ্রেশন কাউন্টারে ভুল তথ্য, পুরোনো ডেটা, অকারণ জিজ্ঞাসাবাদ এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষাও একই অবমাননার অংশ। কম্পিউটারের ভুলকে মানুষের অপরাধ বানিয়ে ফেলা আধুনিক আমলাতন্ত্রের সবচেয়ে নিষ্ঠুর রূপ। যাত্রীর পাসপোর্ট হাতে নিয়ে কর্মকর্তা যদি তাকে অন্ধকারে দাঁড় করিয়ে রাখেন, কারণ না জানান, সমাধানের সময় না বলেন এবং এক ডেস্ক থেকে আরেক ডেস্কে ঘুরতে বাধ্য করেন, তাহলে প্রযুক্তি সেবা নয়—ক্ষমতার নতুন মুখোশ হয়ে ওঠে। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার বলেন, আমলাতন্ত্র নিয়ম ও যুক্তির ওপর দাঁড়ানোর কথা; কিন্তু নিয়ম যখন ব্যাখ্যাহীন, তথ্য যখন ভুল এবং সংশোধনের ক্ষমতা যখন রহস্যময়, তখন আমলাতন্ত্র নাগরিককে মানুষ নয়, ফাইল হিসেবে দেখে।

এই আচরণের শ্রেণিগত দিকও স্পষ্ট। দরিদ্র বা অল্পশিক্ষিত যাত্রী মাথার ওপর পাসপোর্ট তুলে দাঁড়িয়ে থাকেন, ধমক খান, এক কাউন্টার থেকে অন্য কাউন্টারে ঘোরেন। আর ইংরেজিতে সাবলীল, আত্মবিশ্বাসী বা সামাজিকভাবে প্রভাবশালী কেউ তুলনামূলকভাবে দ্রুত মনোযোগ পান। ফরাসি দার্শনিক, ইতিহাসবিদ ও ক্ষমতা-তাত্ত্বিক মিশেল ফুকো দেখিয়েছিলেন, ক্ষমতা শুধু কারাগার বা পুলিশের হাতে থাকে না; ক্ষমতা থাকে লাইনে কে আগে যাবে, কে কথা বলবে, কার কথা বিশ্বাস করা হবে—এই ক্ষুদ্র সিদ্ধান্তগুলোর মধ্যেও।

বিমানবন্দরের লাইনে তাই কেবল যাত্রীরা দাঁড়ান না; দাঁড়িয়ে থাকে শ্রেণি, ভাষা, পরিচয় এবং অসম মর্যাদার পুরো কাঠামো। ফরাসি সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দিয়োর ‘symbolic violence’ বা প্রতীকী সহিংসতার ধারণা এখানে বিশেষভাবে প্রযোজ্য। প্রতীকী সহিংসতা হলো এমন আধিপত্য, যা লাঠি না তুলেও মানুষকে নিজের নিম্ন অবস্থান মেনে নিতে বাধ্য করে। ধমক, অবজ্ঞার দৃষ্টি, ইংরেজি না বললে কম গুরুত্বপূর্ণ মনে করা, কিংবা দরিদ্র যাত্রীকে অনন্ত অপেক্ষায় রাখা—এসব আচরণ শরীরে আঘাত না করেও আত্মমর্যাদায় ক্ষত তৈরি করে।

প্রবাসীদের সঙ্গে এই আচরণ রাষ্ট্রের গভীর অকৃতজ্ঞতার প্রকাশ। যারা দূরদেশে শ্রম দিয়ে অর্থ পাঠান, তাদের দেশে ফেরার মুহূর্তে যদি চোরের মতো সন্দেহ করা হয়, ভিখারির মতো অপেক্ষা করানো হয়, অভিযুক্তের মতো জেরা করা হয় এবং অভিযোগ করলে উল্টো অপমান করা হয়, তবে রাষ্ট্র নিজের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ডকেই অপমান করে। রেমিট্যান্সকে স্বাগত জানিয়ে প্রবাসীকে অসম্মান করা এমন এক দ্বিচারিতা, যেন নদীর পানি নিয়ে বাঁধ শক্ত করা, কিন্তু নদীকেই পাথর ছুড়ে তাড়ানো। প্রবাসীর টাকা চাই, শ্রম চাই, বৈদেশিক মুদ্রা চাই—কিন্তু তার কণ্ঠ যেন নীরব থাকে, অধিকার যেন কাগজে শুকিয়ে যায়, আর সম্মান যেন বিমানবন্দরের দরজার বাইরে পড়ে থাকে।

এ কারণেই কোনো প্রবাসী বা নাগরিক ক্ষোভে বিস্ফোরিত হলে তাকে কেবল ভাষার কাঠগড়ায় দাঁড় করানো নৈতিকভাবে অসম্পূর্ণ। মেজর অবসরপ্রাপ্ত আখতারুজ্জামানের ভাষা কঠোর, আচরণ অশোভন বা হুমকিসূচক হয়ে থাকলে তার সমালোচনা অবশ্যই করা যায়। প্রতিবাদেরও শিষ্টাচার আছে, আইনের সীমা আছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি বছরের পর বছর যাত্রী হয়রানি, লাগেজ চুরি, মালামাল গায়েব, কর্মকর্তাদের অবহেলা এবং অভিযোগের প্রতি ঔদ্ধত্যকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে ক্ষোভের আগুন কোথা থেকে উঠছে সেই প্রশ্নও করতে হবে। শিখাকে গালি দিয়ে অগ্নিকাণ্ড থামে না; যে শুকনো কাঠ, জমে থাকা দাহ্য ক্ষোভ এবং প্রশাসনিক তেলের স্তর আগুনকে জন্ম দিয়েছে, রাষ্ট্রকে আগে সেগুলো সরাতে হবে।

রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়াও হতে হবে আনুপাতিক। একজন প্রতিবাদী ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার বা হাতকড়া পরানো সহজ; কিন্তু বিমানবন্দরের ব্যর্থতার জন্য কতজন কর্মকর্তা জবাবদিহির মুখোমুখি হয়েছেন? কতটি লাগেজ চুরির তদন্ত হয়েছে? যাত্রীকে আঘাত, অপমান বা অবৈধভাবে আটকে রাখার জন্য কতজন শাস্তি পেয়েছেন? যদি প্রতিবাদীর বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের হাত বজ্রের মতো নেমে আসে, কিন্তু প্রভাবশালী অপরাধীর সামনে সেই হাত তুলোর মতো নরম হয়ে যায়, তাহলে আইনের শাসনের পোশাকটি গায়ে থাকলেও ভেতরে থাকে ক্ষমতার খেয়ালখুশি; ন্যায়বিচার পরিণত হয় নির্বাচিত প্রয়োগের ছদ্মনামে।

রাড্ডা হাসপাতাল ধ্বংস, সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিও ভাঙচুর, মূল হামলাকারীদের আড়াল করা, ভুক্তভোগীর ব্যাংক হিসাব তলব করা—এসব ঘটনাও একই রাজনৈতিক অসুস্থতার লক্ষণ হিসেবে দেখা যায়। অপরাধীকে না ধরে ভুক্তভোগীকে চাপে রাখা, হামলাকারীকে রক্ষা করে প্রতিবাদীকে ভয় দেখানো এবং দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে ন্যায়বিচারের দরজা খোলা বা বন্ধ করা রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতার মৃত্যু। জার্মান-আমেরিকান রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ও দার্শনিক হান্না আরেন্টের ভাষায়, ক্ষমতা যখন সত্য ও দায়িত্বকে ধ্বংস করে, তখন প্রতিষ্ঠানগুলো বাহ্যিকভাবে দাঁড়িয়ে থেকেও ভেতর থেকে ফাঁপা হয়ে যায়।

ব্যাগ কেটে চুরি কি যাত্রী-অভিজ্ঞতার স্বাভাবিক অংশ? তিন ঘণ্টা লাগেজের অপেক্ষায় ক্লান্ত শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ মানুষ কি কর্মকর্তার সন্ধানে ঘুরে বেড়ান? উন্নত বিমানবন্দরের আইন প্রয়োগের কথা বললে তার সেবা-মান, অভিযোগ নিষ্পত্তি, ক্ষতিপূরণ এবং কর্মীদের জবাবদিহিতার কথাও বলতে হবে। শুধু শাস্তির অংশ আমদানি করে সেবার অংশ বাদ দিলে সেটি ন্যায়বিচার নয়; সেটি ক্ষমতার সুবিধাবাদী অনুবাদ।

প্রতিটি লাগেজের রিয়েল-টাইম ট্র্যাকিং, ব্যাগ খোলার নিরীক্ষাযোগ্য রেকর্ড, চুরির অভিযোগে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে তদন্ত, প্রমাণিত ক্ষতিতে বাধ্যতামূলক ক্ষতিপূরণ এবং দায়ী কর্মীর প্রকাশ্য শাস্তি প্রয়োজন। ব্যাগ কাটা বা মালামাল চুরিকে ছোটখাটো অনিয়ম হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি সম্পদ লুণ্ঠন এবং জনবিশ্বাসের বিরুদ্ধে অপরাধ। অভিযোগ ডেস্ককে দৃশ্যমান, বহুভাষিক এবং স্বাধীন করতে হবে। যাত্রী যেন জানেন, তার অভিযোগ কোথায় গেল, কে দেখছেন এবং কখন উত্তর পাবেন।

ইমিগ্রেশন-ডেটাবেসে ভুল হলে যাত্রীকে অপরাধী ধরে নেওয়া যাবে না। প্রতিটি অমিলের জন্য লিখিত কারণ, নির্দিষ্ট কর্মকর্তা, আনুমানিক সময় এবং আপিলের সুযোগ থাকতে হবে। ট্রলি, হুইলচেয়ার, বসার জায়গা, শিশু ও বয়স্কদের সহায়তা—এসব দয়া নয়, নাগরিক অধিকার। কর্মীদের প্রশিক্ষণে মানবিকতা, ভাষাগত সংবেদনশীলতা, সংঘাত নিরসন এবং দুর্নীতিবিরোধী নীতি বাধ্যতামূলক করতে হবে। বিমানবন্দরে ক্যামেরা থাকলেই হবে না; সেই ক্যামেরার ফুটেজ অভিযোগ তদন্তে ব্যবহারযোগ্য এবং স্বাধীন পরিদর্শনের অধীন হতে হবে।

মিডিয়ারও দায়িত্ব আছে, তবে সেই দায়িত্ব কর্তৃপক্ষের মুখপাত্র হওয়া নয়। পূর্ণ ভিডিও, প্রত্যক্ষ সাক্ষ্য, যাত্রীর নথি, লাগেজ রিপোর্ট এবং সরকারি ব্যাখ্যা মিলিয়ে সত্য উদ্‌ঘাটন করতে হবে। সামাজিক মাধ্যমের ভাইরাল ক্ষোভকে গুজব বলে উড়িয়ে দেওয়া যেমন ভুল, তেমনি যাচাইহীন উত্তেজনা ছড়ানোও ক্ষতিকর। জনগণের কণ্ঠকে তথ্যসমৃদ্ধ করলে তা জনরোষ থেকে জনজবাবদিহিতায় রূপ নেয়।

প্রবাসীর কাঁধে শুধু স্যুটকেস থাকে না; থাকে বিদায়ের সময় মায়ের কাঁপা হাতের স্পর্শ, সন্তানের শেষ আলিঙ্গন, স্ত্রীর চেপে রাখা কান্না, গ্রামের আশা এবং দেশের অর্থনীতির অদৃশ্য ভার। সেই কাঁধ বিমানবন্দরে পৌঁছালে তাকে আরো একটি বোঝা বইতে হয়—অপমানের বোঝা। লাগেজের তালা ভাঙা, ব্যাগের ভেতর হাত ঢোকানো, জিনিসপত্র গায়েব করা, অভিযোগ করলে সন্দেহের চোখে তাকানো—এসব যদি নিয়মিত ঘটে, তবে তা দুর্ভাগ্য নয়, প্রাতিষ্ঠানিক লুণ্ঠন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল অপরাধী ধরার ঘোষণা দেওয়া নয়; অপরাধের এমন পরিবেশ ভেঙে দেওয়া, যেখানে চুরি সহজ এবং ন্যায়বিচার দুর্লভ।

প্রবাসীকে সম্মান করা কোনো রাজনৈতিক দয়া, মঞ্চের করতালি কিংবা মৌসুমি অনুগ্রহ নয়; এটি তার জন্মগত নাগরিক অধিকার এবং রাষ্ট্রের ন্যূনতম নৈতিক ঋণ। এটি সংবিধান, নাগরিকত্ব এবং নৈতিক অর্থনীতির দাবি। যে অর্থে রাষ্ট্র বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গড়ে, সেই অর্থের উৎস মানুষটির প্রতি অবজ্ঞা রাষ্ট্রের আত্মবিরোধিতা। প্রবাসী লাউঞ্জ, ফুলের শুভেচ্ছা বা প্রচারমূলক ব্যানার দিয়ে এই ক্ষত ঢেকে রাখা যাবে না। দরকার নিরাপদ লাগেজ, দ্রুত সেবা, স্বচ্ছ তদন্ত, নির্ভরযোগ্য অভিযোগব্যবস্থা এবং অপরাধীর নিঃশর্ত জবাবদিহিতা।

শেষকথা, প্রবাসীরা রাষ্ট্রের দয়ার ভিখারি নন; তারা সেই নীরব নাবিক, যারা নিজের যৌবন সমুদ্রের ওপারে রেখে দেশের অর্থনীতির নৌকাকে তীরে টেনে আনেন; তারা সেই নীরব যোদ্ধা, যাদের কাঁধে দেশের অর্থনীতি উঠে দাঁড়ায়, অথচ যাদের কণ্ঠস্বর রাষ্ট্রের করিডরে বারবার প্রতিধ্বনিহীন হয়ে ফেরে। তারা পূর্ণ অধিকারসম্পন্ন নাগরিক। তাদের পাঠানো টাকায় যে ঘরে বৈদ্যুতিক বাতি জ্বলে, যে ঘরে মা ওষুধ কিনে বাঁচেন, যে ঘরে সন্তান বই খুলে বসে—সেই ঘরের দরজায় ফিরে এসে তারা কেন অপমানের অন্ধকারে দাঁড়াবেন? যে মানুষ দেশের জন্য রেমিট্যান্স পাঠান, তার লাগেজ কে কাটল, তার জিনিস কে চুরি করল, তাকে কে ধমকাল, কেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করানো হলো—এই প্রতিটি প্রশ্নের জবাব রাষ্ট্রকে দিতে হবে। বিমানবন্দরকে আর লোহার ট্রলি, ছেঁড়া ব্যাগ, হারানো মালামাল এবং অপমানের গোলকধাঁধায় পরিণত হতে দেওয়া যাবে না। রাষ্ট্রের প্রকৃত আধুনিকতা নতুন টার্মিনালের ঝকঝকে কাচে, ইস্পাতের বিমে বা আলোকসজ্জার ঝলকে নয়; তা প্রকাশ পাবে সেই মুহূর্তে, যখন ক্লান্ত প্রবাসী ব্যাগ হাতে দেশে ফিরবেন এবং প্রথমবারের মতো অনুভব করবেন—‘এই দেশ তার টাকা শুধু নেয় না, তাকে সম্মানও করে।’

লেখক: সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, লেখক ও গবেষক, ফ্রাই ইউনিভার্সিটি বার্লিন, জার্মানি

sahidkamrul25@gmail.com

Google News Icon

আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন