বাংলাদেশের রাজনীতি নতুন রাজনৈতিক দলের আগমনের গুঞ্জনে মুখর। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের নজিরবিহীন ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছে। গণঅভ্যুত্থানের ছাত্র-তরুণ নেতৃত্বের উদ্যোগে আবির্ভূত রাজনৈতিক দলের ব্যাপারে দেশব্যাপী রয়েছে কৌতূহল ও প্রত্যাশা। দেশের জনগণকে ছাত্র-তরুণ নেতৃত্বের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কেমন রাষ্ট্র উপহার দেবে, কী হবে তাদের রাজনীতি, তা নিয়ে রয়েছে নানা জল্পনা-কল্পনা।
ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ার আহ্বানে জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান সংঘটিত হয়েছিল। অর্থাৎ শুধু শাসকের বদল কিংবা পতন নয়; যেসব আর্থ-সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক শর্তের কারণে জনগণের ওপর রাষ্ট্রীয় জুলুম নেমে আসে, সে ব্যবস্থা পরিবর্তনের বাসনা জুলাই ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। সামরিক স্বৈরাচার এরশাদকে হটাতে নূর হোসেন জীবন দিয়েছিলেন। আশা ছিল গণতন্ত্র মুক্তি পাবে। নব্বই-উত্তর বাংলাদেশে নির্বাচনী ব্যবস্থা কায়েম করা গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু গণতন্ত্র মুক্তি পায়নি। গণতন্ত্র মুক্তি পেলে আবু সাঈদ ও ওয়াসিমদের আবার জীবন দিতে হতো না।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে গণতন্ত্র নিয়ে আলাপের একটা প্রধান সংকট হলো নির্বাচন ও গণতন্ত্রকে একাকার করে ভাবার চিন্তাপ্রণালি। প্রতাপশালী বয়ানে নির্বাচনই গণতন্ত্র। অথচ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচন স্রেফ একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সরকার বেছে নেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। রাষ্ট্র যদি গণতান্ত্রিক না হয়; তথা আইনের শাসন, প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, মত ও বাকস্বাধীনতা, সমাবেশের অধিকার যদি না থাকে, তাহলে পাঁচ বছর অন্তর অন্তর স্রেফ নির্বাচন গণতন্ত্র নিশ্চিত করে না।
বাংলাদেশে আমরা একটা শক্ত নির্বাচনী ব্যবস্থাও দাঁড় করাতে পারিনি। ফলে নির্বাচিত সরকারের ধারাবাহিকতা ক্ষুণ্ণ করার একাধিক নজির আছে। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে নির্দিষ্ট সময় পর ক্ষমতা হস্তান্তর করতে না চাওয়ার একাধিক নজির এ দেশের রাজনৈতিক দলগুলো সৃষ্টি করেছে। ফলে ক্যু-পাল্টা ক্যু, সামরিক শাসন, গণতন্ত্রহীনতা এবং হত্যার রাজনীতি জায়গা করে নিয়েছে। এ কারণে আমরা বলেছি, এ জনগোষ্ঠীর প্রত্যেকটা বড় বড় ঐতিহাসিক মুহূর্তের পরের বন্দোবস্ত ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৪৭, ’৭১ ও ’৯০ আমাদের গৌরবের ইতিহাসের অংশ। কিন্তু ইতিহাসের এ পর্বগুলোর পরের বন্দোবস্ত সফল হয়নি। এর প্রধান কারণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকল্প সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকা।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের এক দফা—ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নয়া রাজনৈতিক বন্দোবস্ত কায়েমের ঐতিহাসিক ডাককে এ আলোকেই বুঝতে হবে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং জাতীয় নাগরিক কমিটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতার পেছনেও উল্লিখিত ঐতিহাসিক বোঝাপড়া ক্রিয়াশীল ছিল। জাতীয় নাগরিক পার্টি সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে বদ্ধপরিকর। ক্ষমতায় গিয়ে আর কোনো সরকার যেন স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে না পারে, সে লক্ষ্যে নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি। বাহাত্তরের সংবিধান গণতন্ত্র ও ইনসাফ কায়েমে ব্যর্থ হয়েছে। একদলীয় শাসন তথা বাকশালী শাসনের পথ প্রশস্ত করেছে বাহাত্তরের সংবিধান। এ কারণে এনসিপি দাবি জানিয়েছে, গণপরিষদ নির্বাচনের মাধ্যমে একটি নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করা জরুরি।
২০২৪ সালের অক্টোবরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সেকেন্ড রিপাবলিক ঘোষণার দাবি জানিয়েছিল। ছাত্র-জনতার এ দাবি ঐতিহাসিক। সংস্কার না করে তড়িঘড়ি করে শুধু একটা নির্বাচন দিয়ে দেশের আমূল পরিবর্তন সম্ভব নয়। আমরা নির্বাচন বিরোধী নই। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্রচর্চার গুরুত্বপূর্ণ একটি পদ্ধতি নির্বাচন। কিন্তু আমরা নির্বাচনবাদের বিরোধী।
নির্বাচনবাদী রাজনীতি দেশের আমূল সংস্কার চায় না; বরং পুরোনো ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখতে চায়। অন্যদিকে ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপের রাজনীতি বলছে, রাষ্ট্রকাঠামোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঘাপটি মেরে থাকা স্বৈরতান্ত্রিক উপাদান নির্মূল করে প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে হবে, নির্বাচিত গণপরিষদের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে এবং সেই সংবিধানের অধীনে সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। অথবা এমন এক নির্বাচন আয়োজন করতে হবে, যার মধ্য দিয়ে নির্বাচিতরা একইসঙ্গে গণপরিষদ ও সংসদ গঠন করবে। ইংরেজিতে একে বলা হয়, ‘mandated constituent legislature,’ তথা গণপরিষদ গঠনের এখতিয়ারপ্রাপ্ত আইনসভা। গণতান্ত্রিক বিপ্লবের এটাই ধ্রুপদী পথ।
এ আকাঙ্ক্ষা কোনো অতিবিপ্লবী রোমান্টিক কিছু নয়। পৃথিবীর সর্বত্র এভাবেই গণতন্ত্র কায়েম হয়েছে। আমাদের প্রস্তাবিত রাষ্ট্রকল্পে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধানের পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে নির্বাহী কর্তৃত্বের বাইরে আনার ভাবনা ক্রিয়াশীল রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যেন একক ক্ষমতার অধিকারী না হয়ে উঠতে পারেন, সে লক্ষ্যে তার ক্ষমতা খর্ব করার সাংবিধানিক ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। প্রত্যেক জাতিসত্তার স্বীকৃতির পাশাপাশি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বাড়তি যত্নের কথা বলা হয়েছে। নিরাপদ জনপরিসর ও অর্থনৈতিক সমতা নারীদের জন্য অত্যাবশ্যকীয় একটি ব্যাপার।
ধর্মীয় সহাবস্থান ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সমাজ নিশ্চিত করার দিকে আমাদের লক্ষ্য থাকবে। ধর্ম বনাম সংস্কৃতি— এমন অদ্ভুত বাইনারি রাজনীতিকে অকেজো করে তোলার প্রতি আমাদের মনোযোগ। ধর্ম পালনের স্বাধীনতা যেকোনো উদারনৈতিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের বুনিয়াদি বিষয়। তবে ধর্ম বা জাতি কোনো নামেই অন্যের ওপর জুলুম করা চলবে না। প্রত্যেক নাগরিকের জানমাল ও মর্যাদা হেফাজত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একটি সুসংহত রাজনৈতিক জনগোষ্ঠী হিসেবে আত্মবিকাশের ক্ষেত্রে ধর্ম, ভাষা, স্মৃতি ও ঐতিহ্যের মেলবন্ধন থাকা জরুরি।
অনেক গবেষক বলে থাকেন, ভূরাজনৈতিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রে অবস্থান করে। সবার আগে জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সীমানাগত অখণ্ডতার প্রতি আপসহীনতা আমাদের ভূরাজনৈতিক নীতি ও কৌশলের প্রধান বিষয় হবে। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে পারস্পরিক স্বার্থ ও মর্যাদার বিষয়টিকে আমরা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করব।
বাংলাদেশকে আর তলাবিহীন ঝুড়ি বলার উপায় নেই। বাংলাদেশ এখন বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর একটি। বিগত ১৫ বছর অবিশ্বাস্য লুটপাট, মেগা দুর্নীতি ও অর্থ পাচার না হলে বাংলাদেশের অর্থনীতি এশিয়ার শীর্ষে অবস্থান করত বলে আমাদের বিশ্বাস। দুর্নীতি, অর্থ পাচার বন্ধ করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের বিশেষ প্রণোদনা দেওয়া এবং পর্যটনশিল্পকে যুগোপযোগী করে গড়ে তোলা আমাদের অগ্রাধিকারে থাকবে।
‘চিকিৎসা যাবে জনগণের দোরগোড়ায়’—সর্বজনশ্রদ্ধেয় প্রয়াত ডাক্তার জাফরুল্লাহর এ নীতি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে তরুণদের রাজনৈতিক দল এনসিপি কাজ করবে। অর্থ যেন চিকিৎসাপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় সে ব্যাপারে বিশেষ মনোযোগ দেওয়া হবে। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে গবেষণা ও জ্ঞান উৎপাদনে আগ্রহ সৃষ্টি করার প্রতি আমরা বিশেষ পদক্ষেপ নেব।
সমালোচনা ও ভিন্নমত গণতন্ত্রের প্রধান সৌন্দর্য। সমালোচনার দায়ে কাউকে হয়রানি করা এবং তুলে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করে জেলে আটকে রাখার মতো গর্হিত অপরাধ যেন আর কোনো সরকার করতে না পারে, সেদিকে নজর রাখতে হবে। বলপূর্বক গুমের মতো ভয়াবহ মানবতাবিরোধী অপরাধকেও আর ফিরে আসতে দেওয়া যাবে না। আয়নাঘরগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। চব্বিশের অভ্যুত্থান বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে। আমরা আর একটি প্রাণও এভাবে ঝরে যেতে দিতে পারি না।
শেখ হাসিনা ও তার দলের বর্বরতার স্মৃতি জনমনে জাগরূক রাখতে হবে। শহীদদের প্রতি সর্বোচ্চ মর্যাদা ও আহতদের প্রতি সর্বোচ্চ দরদ অব্যাহত রাখতে হবে। তাদের আত্মত্যাগ ও যন্ত্রণাই বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রধান জ্বালানি হিসেবে কাজ করবে।
বিচার, সংস্কার ও নির্বাচন নতুন দলের প্রধান তিন এজেন্ডা। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার গোড়ায় একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে হলে সংস্কার অনিবার্য। নির্বাচন সংস্কারের ফলাফল তথা সংস্কার শেষে নির্বাচনী গণতন্ত্রে আমাদের ফিরে যেতে হবেই। কিন্তু স্রেফ নির্বাচনের জন্য এত প্রাণ ঝরেনি। জনগণের অভিপ্রায় সারা দেশের দেয়ালে দেয়ালে লিখিত রয়েছে।
সবখানে একই সুর—দেশ, সমাজ, রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানের সংস্কার করতে হবে। অবশ্যই এ সংস্কার অনন্তকাল ধরে চলবে না। কিন্তু একটা যৌক্তিক সময় এ সরকারকে দিতে হবে। নির্বাচনের জন্য অতিরিক্ত চাপাচাপি করতে গিয়ে সংস্কার প্রকল্প ভেস্তে যেন না যায়, সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। সরকারকে মনে রাখতে হবে, ব্যর্থ হওয়ার কোনো অধিকার তাদের নেই। সংস্কার শেষে একটি শক্তিশালী ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার অধীনে নির্বাচন দিয়ে নতুন সরকারকে দায়িত্বভার গ্রহণের পথ এ সরকার করে দেবে, আমরা সেই প্রত্যাশা করি। অনাগত গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রতিটি ক্ষেত্রে তরুণরা নেতৃত্ব দেবে, এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ করা চলে না।
লেখক; যুগ্ম আহবায়ক, এনসিপি
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

