জ্বালানি সংকট, নিত্যপণ্যের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, সংস্কারের দায়, রাজপথে অস্থিরতার হুমকি, ভারত সফর ও মক্কা চুক্তিতে শরিক হওয়ার ইতি-নেতি নিয়ে নানা গল্প এখন মিডিয়ায় ফুঁড়ে উঠছে। জ্যৈষ্ঠ মাসে আমের বোলের মতো। মতপ্রকাশের কালগত নির্দিষ্টতায় এটি স্বাভাবিক। এ নিয়ে চক্রান্তের তালাশও বোধকরি এই মুহূর্তে অপ্রাসঙ্গিক। যদিও রাজনীতির আকাশে কালো মেঘের আনাগোনায় অন্ধ থাকা অসংগত।
ছয় মাস পেরিয়ে যাওয়া তারেক রহমানের নির্বাচিত সরকার সম্পর্কে কৌতূহলের শেষ নেই দেশ ও বিদেশে। নতুন সরকারের দেশ-চালনা নীতি, পররাষ্ট্রীয় ঝোঁক, অর্থনীতির দিগদশা নির্ণয়, রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার গতিমুখ—সবই আলোচনায় আছে। কিন্তু বর্তমান সরকারের ইতিহাসগত তাৎপর্য, অন্তরালের রসায়ন, বৈশ্বিক রাজনীতির চালচলনে সম্পৃক্ততার ধরন, প্রধানমন্ত্রীর মন-মগজে চিন্তাপ্রবাহের প্রকৃতি—এসব নিয়ে মূল্যায়নে অনাগ্রহ এবং অপারগতা যথেষ্ট। যে পরিপার্শ্বে তারেক রহমান দেশ-কান্ডারি হয়ে উঠছেন, সেখানে প্রতিরোধের কোনো উপক্রমণিকা তৈরি হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নেও তর্ক-বিতর্ক নেই।
তারেক রহমানকে রাজনৈতিক নির্মাণে বাধার যে প্রয়াসই হোক, নির্মাণের বিন্দু বিন্দু শ্রমকে সংহত করতে শরীর-মনে নির্মাতা একেবারে জেরবার হয়ে যাবে। তারেক রহমানের মনে বাংলাদেশের যে পরিক্রমা গ্রথিত, তাতে কী নেই? ৫৪ বছরে বাংলাদেশের ভারাক্রান্ত ইতিহাসকে নিজের বলেই তিনি মেনে নিয়েছেন। শৈশবে স্বাধীনতার যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করা, রাষ্ট্রনায়ক পিতার স্বাধীনতার ঘোষণা, দেশনেত্রী মায়ের বন্দিত্ব, ৭২-৭৫-এ গণতন্ত্রের চরম বিকৃতি, রাজনীতির একদলীয়তা, ৭ নভেম্বরের জাতীয় বিপ্লব দর্শন, গণতন্ত্র ও বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের সংস্থান, বিএনপির জন্ম, বিরাশির সামরিক শাসন, খালেদা জিয়ার আপসহীন আন্দোলন ও মাতার প্রধানমন্ত্রিত্ব অবলোকন, বিরোধী নেত্রী হিসেবে বেগম জিয়ার অতুলনীয় গণতন্ত্রের সংগ্রামে নিজেকে আত্মস্থ করা, ২০০১ থেকে সরকারের বাইরে অবস্থান করে বিএনপির রাজনীতিতে ইন্টার্নশিপ, ১/১১ মঈনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের ছদ্মবেশী সামরিক শাসনে বন্দি অবস্থায় তাকে দৈহিক নির্যাতন, দীর্ঘ সময় প্রবাসে থেকে মা ও বিএনপিকে রাজনৈতিকভাবে সুসংহত করা, ব্রিটিশ গণতন্ত্রের মুগ্ধ দর্শন, দেশে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের মূল চালিকা হয়ে ওঠাÑএসব ঘটনা দীর্ঘ গল্পের একেকটি পর্ব মাত্র। রাজনৈতিক সাবালকত্বের জন্য আর কী উপাদান প্রয়োজন?
তার রাজনৈতিক জীবন এক খোলা বই। জনগণ এসবে তাদের অনুমান-মূল্যায়ন নিয়ে অবাধে খেলুক, তাতে তার কোনো আপত্তি নেই। ঘরে-বাইরে কোনো প্রতিপক্ষ যদি তারেক রহমানের রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি ও কূটনীতিকে নাবালকের পুতুল খেলারূপে গণ্য করে, তবে ভারতবিরোধী অথবা বিরোধী দলÑবিরোধী কটূ-কাটব্য থেকে নিজেকে সযত্নে দূরে রাখা, তার সরল সাহসী সত্যভাষণ (জ্বালানি সংকটে জনগণের কাছে দুঃখ প্রকাশ), প্রান্তিক মানুষদের প্রতি দরদি অঙ্গীকার, তর্কাতীত সুষম বাজেট প্রদান, নিঃস্ব ব্যাংকের গ্রাহকদের টাকা ফিরিয়ে দেওয়াÑঅনেকের বিশ্বাসের অভ্যাসকে, অবিশ্বাসের অনভ্যস্ত ভীতিকে ওলটপালট করে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তার উচ্চারণে বারবার এসেছেÑরাষ্ট্র হবে প্রকৃত স্বাধীন, এর পরিচালনায় থাকবে গণতান্ত্রিক নীতিনৈতিকতা এবং মানবিকতা, জনকল্যাণ হবে মূল ধ্যান। তারেক রহমানের গল্পকে জিয়া-খালেদার পর্বের সঙ্গে বাঁধলে অন্তত বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে ছেদহীন কোনো উদ্দেশ্য প্রতিপন্ন হয় না। বরং বিশ্বাসের ঋজুতা দৃশ্যমান। এমনকি দিনানুদৈনিকের তুচ্ছাতিতুচ্ছেও তা অন্তর্লীন হয় না। কোনো সরকারি কর্মে নিয়মের ব্যত্যয় তাকে শরমিন্দা করে। এটাই নেতার গুণ। তবে প্রোফাইলকে বিধ্বস্ত করার যন্ত্রও চালু করেছে কিছু স্তাবক ও সুবিধাবাদীরা।
এসবের পরিপ্রেক্ষিতে মক্কা চুক্তি ও ভারত নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনাই বর্তমান নিবন্ধের লক্ষ্য।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান বিশ্বে নিকৃষ্ট দুর্গন্ধসূচক ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়েছিল। তখন প্রত্যাশা জাগে এক নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ পররাষ্ট্রনীতির গতিধারা কী হবে, তার ফয়সালাও শোনা যায়। ‘নারায়ে তাকবির’ ধ্বনির পাশাপাশি বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের মূল হোতা হাসিনা-সমর্থক ভারতের বিরুদ্ধে সর্বত্র নিন্দা ধ্বনিত হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্রনীতিতে এর প্রতিফলন ঘটে।
আওয়ামী আমলে মনে পড়ে, লন্ডনের বিখ্যাত সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর ‘হ্যালো ইন্ডিয়া’ শিরোনামের এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদের জন্য ভারতকে দায়ী করেছিল। আগে থেকেই বিএনপি এবং তারেক রহমান সম্পর্কে ভারতের দৃষ্টি ছিল ত্যারচা এবং আস্থা শূন্যের কোঠায়। এক-এগারোর সরকার থেকে আওয়ামী দুঃশাসনের পতন পর্যন্ত বিশেষ করে তারেক রহমানের বিরুদ্ধে ভারত ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিশ্বব্যাপী অপপ্রচারে মেতেছিল।
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পতন আঞ্চলিকভাবে-নিঃসঙ্গ ভারতের জন্য ছিল চরম বিপর্যয়কর। ভারত হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাদের আশ্রয় দিয়েছে বটে; কিন্তু বাংলাদেশে নাশকতা সৃষ্টির প্রকল্পে এগোতে সাহস পায়নি। দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যু এবং ঐতিহাসিক নির্বাচনি বিজয়ে প্রধানমন্ত্রী পদে তারেক রহমানের অধিষ্ঠানকে ভারত ‘নির্বিকল্প বাস্তবতা’ হিসেবেই মেনে নেয়। বেগম জিয়ার জানাজা অনুষ্ঠানে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্করের আগমন এবং তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের পর, জয়শঙ্করের সুপারিশে হোক, ভারত বাংলাদেশকে অস্থিতিশীল করার জঙ্গিদশায় যায়নি। ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে যে পরিবর্তন, তাতে বাংলাদেশে নতুন ফ্রন্ট খোলার অপ্রয়োজনীয়তা ভারতের মোদি সরকার মেনে নেয়।
যদিও সীমান্তে হত্যাকাণ্ড, পুশইন, তেল-বিদ্যুতের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটানোর খুচরা কাণ্ড জারি রেখেছিল। মনমোহন সিং প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে প্রায়ই একটি সত্য কথা বলতেন, বাংলাদেশের উন্নতি না হলে ভারতের সমৃদ্ধি হবে না। কিন্তু মোদি সরকার ঘুণাক্ষরেও তা বলে না; বরং বিজেপি বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিজস্ব সংগঠন দাঁড় করানোর পাশাপাশি বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী আসাম, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গে আক্রমণাত্মক রাজনীতির নামে রাজ্য ক্ষমতা দখল করে এবং অনেক মাদরাসা সেসব রাজ্যে বন্ধ করে দেয়।
বাংলার গৌরবময় ইতিহাসের উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে, উপমহাদেশের গ্রাম-গ্রামান্তরের আল্লাহর ওলি-সুফি সাধকরা ব্যাপকভাবে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উগ্র হিন্দুদের বিরোধিতা তখন থেকেই ছিল এবং এখনো বাংলাদেশের সুশীল নাস্তিক সমাজ মাদরাসার নামও শুনতে পারে না। বিজেপির পরিকল্পনায় বাংলাদেশকে রাজনৈতিকভাবে ঘিরে ধরার অভিপ্রায় ছিল এবং আছে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির বিজয়ের পর বাংলা ভাষাভাষীদের পুশইনের অপপ্রয়াস ও সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া স্থাপনের জায়গা বরাদ্দের ঘটনাবলি তাই মনে করিয়ে দেয়।
বাংলাদেশ ও ভারতের মিডিয়া দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে সরকারের ইন্সট্রুমেন্ট হিসেবে দীর্ঘদিন ব্যবহৃত হচ্ছে। শুধু এই দুদেশের সংবিধানেই লেখা আছে, দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক ক্ষুণ্ণ হয়Ñএমন লেখালেখি করা যাবে না। কিন্তু ভারতীয় মিডিয়া তা মানে না আর বাংলাদেশের মিডিয়া মেনে চলে। মেনে চলার বড় কারণ হচ্ছে, মোটামুটি মাপে বাংলাদেশের মিডিয়ার একটি বড় অংশ মন-মগজে বিশ্বের ‘বৃহত্তম গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ভারত’ দ্বারা প্রভাবিত।
ভারতীয় সীমান্তরক্ষীরা কোনো বাংলাদেশিকে মেরে ফেললে হাসিনার আমলের মতো এখনো আমরা বলে ফেলি, মৃত বাংলাদেশি চোরাচালানি ছিল। বাংলাদেশে ভারতীয় রাষ্ট্রদূতকে মিডিয়া মুগ্ধ বিশ্বাসে যথেষ্ট প্রচার দেয়। তাকে জিজ্ঞেসই করে না যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে যখন বলা হলো, প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, সেদিনই ভারতীয় দূত নয়াদিল্লিতে উড়ে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে জরুরি বৈঠক করলেন। কিন্তু এরপর বাংলাদেশের সাংবাদিকরা আর দীনেশ ত্রিবেদীকে জিজ্ঞেসই করছে না যে, সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টির জন্য দিল্লি কী করল?
দীনেশ ত্রিবেদী কূটতৎপরতার মাধ্যমে এমন পরিবেশ সৃষ্টি করছেন, তারেক রহমানের ভারত সফরের বিষয়টি তারেক রহমানের ওপর নির্ভর করছে। উনি গেলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। আর ভারতে আশ্রয় নেওয়া শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়েও দিল্লি লা-জবাব। ভারতীয় মিডিয়া যতটা নিজস্ব জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক, বাংলাদেশি গণমাধ্যম বোধ হয় ততটা নয়। নেপাল, শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপের মিডিয়া নিজ স্বার্থানুগুণতায় আমাদেরও উপরে।
এই অবস্থার মধ্যেই এসেছে মক্কা চুক্তির প্রসঙ্গটি। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান হালে একটি সামরিক জোটভুক্ত হয়েছে। এটা শুধু সামরিক নয়, ন্যাটো ধাঁচের একটি রাজনৈতিক জোটও। ভারতের হয়তো আশঙ্কা, এই জোটে গেলে বাংলাদেশ এবং সেভেন সিস্টার্স রাজ্যগুলো নিয়ে ভারতের যে সামরিক দুর্ভাবনা, তাতে অম্ল বাড়তে পারে। বাংলাদেশ এখনো এ জোটে যোগ দেওয়ার দাওয়াত পায়নি। তবে সৌদি সরকারের উচ্চপর্যায়ের দূতের বাংলাদেশে আগমন, তারেক রহমানকে সৌদি আরব সফরের আমন্ত্রণ এবং আমাদের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বোলচালে ধারণা হয় যে, বাংলাদেশ এতে যোগ দিতে পারে।
এছাড়া তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকার এবং বর্তমান সরকারের একটি মাখামাখিও লক্ষণীয়। তদুপরি, চীনে সফল সফর সেরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার কথা বলেছেন। এসব ভারতের জন্য অস্বস্তিকর। ফ্যাসিস্ট হাসিনার আমলে মনিবের সুখানুভূতি থেকে এখনো তারা নিস্তার নেয়নি।
মক্কা জোটে যোগদানের পথে বড় যুক্তি হলো, বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত সুবিধা অর্জন করবে, জাতীয় নিরাপত্তা জোরদার হবে। বাংলাদেশ এখনো অরক্ষিত এবং বন্ধুহীন। শক্তিশালী মিত্রপক্ষ দরকার। বিপরীতে কয়েকজন মতমোড়ল (Opinion leader) আশঙ্কা করছেন, এতে শরিক হলে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ ঘরে টেনে আনা হবে। বাংলাদেশকে কোনো একসময় মধ্যপ্রাচ্যে সৈন্য পাঠাতে হবে। ভারত একে স্বাভাবিকভাবে নেবে না। রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারত একটি ফ্যাক্টর বলে মনে করে স্থানীয় একটি মহল।
বাংলাদেশে দুজন প্রেসিডেন্টের হত্যাকাণ্ডে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার হাত ছিলÑএ ধারণায় বহু মানুষ সহমত। প্রত্যেক সরকারপ্রধানকে ভয় দেখানো হয়েছে যে, ভারতকে চটানোর দরকার নেই। একটি ভারতভীতি আগাগোড়াই জারি রাখা হয়। আমরা অ্যান্টি-ইন্ডিয়ানিজমের বয়ান থেকে প্রো-বাংলাদেশিজমে সরে এসেও সুদৃষ্টিবঞ্চিত। ভারতে মুসলিম সম্প্রদায়ের ওপর পীড়ন চললেও আগের মতো বাদ জুমার বায়তুল মোকাররম থেকে মিছিল বের হতে দেখি না। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি পদের নির্বাচনে ভারত বাংলাদেশকে ভোট দিল কি নাÑসে আলোচনায়ও আমরা খামতি দিই।
তবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বোধ হয় শঙ্কার ওই কীর্তনে আগ্রহী নন। দীর্ঘদিন ভারত বাংলাদেশের গঙ্গা বাঁধ প্রকল্পের বিরোধিতা করে এসেছে। কারণ, ফারাক্কা বাঁধ দিয়ে ভারত বাংলাদেশে যে পানিশূন্যতা বজায় রাখতে চায়, গঙ্গা বাঁধ প্রকল্প তার জবাব। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় গিয়েই গঙ্গা বাঁধ প্রকল্প অনুমোদন করেছে এবং তিস্তা পরিকল্পনাও সম্মতি পেয়েছে। খুবই সাহসী প্রকল্প গঙ্গা ও তিস্তা বাঁধ।
বলা প্রয়োজন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান প্রথম তিস্তা বাঁধ বসিয়েছিলেন। সেটি ছিল নিজস্ব অর্থায়নে বাংলাদেশের প্রথম প্রকল্প। গঙ্গা ও তিস্তায় পানি কমিয়ে ভারতই বাংলাদেশকে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।
মক্কা জোটে না যাওয়া বা জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টির মাধ্যমে যোগদানের পর্ব সম্পন্নের যে কথন চলছে, তা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। এসবের বিপরীতে কতকগুলো যুক্তি উত্থাপিত হতেই পারে।
১. পবিত্র কোরআন ও হাদিসে বন্ধু বাছাই এবং মোনাফিক চেনার বর্ণিত মানদণ্ডে পররাষ্ট্রনীতি সাব্যস্ত করা যেতে পারে।
২. জুলাই বিপ্লবের চেতনা অনুযায়ী মক্কা জোটে যোগদান যথার্থ হবে। একই সঙ্গে দেখতে হবে কাতার, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ অন্যান্য মুসলিম দেশ কী মাত্রায় এতে যাচ্ছে।
৩. এ জোটের অধিভুক্ত দেশগুলোয় বিশেষ করে বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি কাজ করেন। শুধু সৌদি আরবেই ৩০ লাখ বাংলাদেশি কাজ করেন। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য হলো, যারা আমাদের জিনিস কেনে, কর্মসংস্থান দেয়, তাদের সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা হলেই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধা ঢোঁড়া সাপের মতো ফণা তোলে। আমেরিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমাদের রেমিট্যান্স আসে বেশি। আমাদের রপ্তানির সিংহভাগ যায় সেখানে। অনুদানের সহায়তা আসে বেশি। কিন্তু যারা আমাদের পণ্য সেভাবে নেয় না, কর্মসংস্থানও দেয় না, শুধু ঠিকাদারি ও ব্যবসা করে বাংলাদেশ থেকে মুনাফা নিয়ে যায়, উল্টো তাদের কথা গুনতে হয়। যেমন চীন, ভারত ও রাশিয়া। তাদের বিরুদ্ধে রাজপথে লাল নিশানের মিছিল থেকে ‘সাম্রাজ্যবাদ নিপাত যাক’ স্লোগান শোনা যায় না। পশ্চিমা দেশগুলোর নিন্দাবাদ বাংলাদেশে প্রবল। ভারত টাকা পেয়েও কোভিড টিকা দেওয়া স্থগিত করেছিল। তখন যুক্তরাষ্ট্র বিনা টাকায় বাংলাদেশকে ওই টিকা দিয়েছিল।
অন্যদিকে বাংলাদেশের সব সরকারই মুসলিম দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে আসছে। বর্তমান জাতীয় সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে মক্কা জোটে যোগদানে সম্মতি আসবেÑএটা নিশ্চিত। অধিকাংশ জনগণও সমর্থন-সায় দেবে।
৪. ওই জোটে যোগদানের বিপক্ষে একটি কথা বলা হয়, বাংলাদেশ কখনো কোনো সামরিক জোটে যায়নি। এবারও যাওয়া উচিত নয়। তারা ভুলে গেছে, ২৫ বছর মেয়াদি বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী চুক্তির কথা, যেটি আওয়ামী লীগ সরকার স্বাধীনতার শুরুতে করেছিল। ওই চুক্তিতে বাংলাদেশের ওপর ভারতের সামরিক ও রাজনৈতিক দাসত্ব মেনে নেওয়া হয়েছিল। ওটা ছিল গোলামি চুক্তি। তখন ভারসাম্য কোথায় ছিল?
স্বৈরাচারী হাসিনা ভারতকে সর্বস্ব দিয়ে ভারসাম্যের মেকি খেলা খেলে বাংলাদেশের সর্বনাশ করে গেছে। আর নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দেশদ্রোহী শেখ হাসিনা কত কী দাসত্বের গোপন চুক্তি করে গেছেÑআমরা জানি না। সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের পিছু পিছু হেঁটেছে। এখন বাংলাদেশকে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত নিতে হবে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কার সঙ্গে থাকবে আর অর্থনৈতিক সহযোগিতা কার সঙ্গে করবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক রাখাটা প্রয়োজন।
ভৌগোলিক কারণেই বাংলাদেশ ও ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চাওয়া অনুযায়ী অর্থনীতিটা রাজনীতির বাইরে থাকুক। আমরাও তাই মনে করি। কিন্তু ভারতের সরকার দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতাকে রাজনীতি-কূটনীতির বাতাবরণে রাখতে চায়। আর আমরা কেনইবা আগ বাড়িয়ে ভাবতে থাকি, অমুকের সঙ্গে মিতালিতে অমুক অভিমান করবে। তাহলে আর ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিটা কি জ্যান্ত থাকে? তবে চীন, ভারত বা অন্য কেউ এ জোটে যোগদানে আপত্তি করবে বলে মনে হয় না।
বলা হয়, বাংলাদেশের কোনো যুদ্ধে জড়ানো উচিত হবে না, কোনো সৈন্য পাঠানো ঠিক হবে না? জনশক্তি রপ্তানির মানদণ্ডে তো সৈন্য পাঠানো যায়। ইরাক-কুয়েত যুদ্ধে বাংলাদেশ কি সৈন্য পাঠায়নি? শান্তিরক্ষী বাহিনী যে বিভিন্ন দেশে মোতায়েন হচ্ছে এবং আমাদের সৈন্যদের জন্য বাড়তি আয় আসছেÑআমরা কি তা ভুলে যাই? বঙ্গোপসাগর, রোহিঙ্গা, পার্বত্য চট্টগ্রাম, মিয়ানমার, ভারতের মিজোরাম, মণিপুর নিয়ে অস্থিরতা ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ শুধু অসহায় দর্শক হয়ে থাকবেÑবাংলার ইতিহাস তা বলে না।
আমার দেশের খবর পেতে গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন

